সাম্প্রদায়িকতা ও বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তা

সাম্প্রদায়িকতা ও বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তা
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

বঙ্গবন্ধু ছিলেন উপমহাদেশের অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ মানুষ। তার প্রথম জীবন থেকেই তিনি যে অসাধারণ মানবিক গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ইতিহাস গড়ে তুলেছিলেন তার অনেক প্রমাণই আমরা নানাজনের লেখালেখি এবং ঐতিহাসিক বিবরণে পেয়ে যাই।

এ বিষয়ে আমরা পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত লেখক অধ্যাপক ভবতোষ দত্তের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘আট দশক’-এ প্রথমেই পেয়ে যাই। ভবতোষ দত্ত তখন ছিলেন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের অধ্যাপক। অধ্যাপক তখনকার কথা প্রসঙ্গে যা লিখেছেন তার একটি অংশ উদ্ধৃত করছি :‘কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ তখন কয়জন বিখ্যাত হিন্দু অধ্যাপকও ছিলেন।

তখনকার পরিস্থিতিতে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক এমন যে ভালো ছিল তা নয় কিন্তু একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষই যে কীভাবে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে সম্প্রীতি গড়ে তুলতে পারেন তার উদাহরণ ছিলেন ইসলামিয়া কলেজের তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান।’

এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ভবতোষ দত্ত আরো লিখেছেন, ‘ছাত্ররা আমাদের অত্যন্ত সমাদরে গ্রহণ করেছিলেন। আমরা মুসলমান নই বলে যেন কোনো আঘাত না পাই তারও চেষ্টা করতেন। প্রায় সব ছাত্রই অবশ্য লীগ-পন্থি। পাকিস্তানকামী। মুসলমান শিক্ষকেরাও তাই। তবে কলেজ ইউনিয়নের নির্বাচনে দুটো দল হতো—একটি বাংলাভাষীর দল আর অন্যটি উর্দুভাষীর দল। উর্দুভাষীরা নিজেদের একটু বেশি কুলীন মনে করতেন। কিন্তু বাংলাভাষীদের সংখ্যা ছিল বেশি।

এই বাংলাভাষী দলের নেতা ছিল একটি কৃষকায় ছেলে—নাম শেখ মুজিবুর রহমান। তার নীতি শেষ পর্যন্ত অপরিবর্তিত ছিল। বঙ্গবন্ধু মুজিবুর বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিতে সফল হয়েছিলেন। ইসলামিয়ার ছাত্ররা যে আমাদের জন্য কতটা করতে পারত তার প্রমাণ পেলাম ১৯৪৬-এর রক্তাক্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়। বালিগঞ্জ থেকে ইসলামিয়া কলেজের রাস্তায় পদে পদে বিপদে। এই রাস্তা আমাদের ছাত্ররা পার করে দিত। ওল্ড বালিগঞ্জের কাছে অপেক্ষা করত আর সেখান থেকে জয়লেসলি স্ট্রীট কলেজে নিয়ে যেত। আবার সেভাবেই ফিরিয়ে দিয়ে যেত।’

প্রথম জীবনে বঙ্গবন্ধুর এই অসাধারণ অসাম্প্রদায়িক মানবপ্রীতির নীতি অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছেন। একটি উদাহরণ পেশ করছি। ১৯৭২ সালে ২৩ মার্চ তারিখের ঢাকায় এক সুধী সমাবেশে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতায় দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশে মূল ব্যাধি চিহ্নিত করে বলেন, উপমহাদেশের গত কয়েক যুগের রাজনৈতিক অস্থিরতা, দারিদ্র্য ও দুর্ভোগের মূল কারণ সাম্প্রদায়িকতা।

১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ ভাগ হওয়ার পর ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে রাষ্ট্রীয় সাম্প্রদায়িকতায় রূপ দেওয়া হয়েছে। এটা সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের ফল। আগে যা ছিল সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে হানাহানি এখন তা-ই রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে হানাহানির রূপ ধারণ করেছে। ভারতবিরোধিতা এই রাষ্ট্রীয় সাম্প্রদায়িকতার একটা ছন্দ আবরণে। কয়েক শতাব্দীর সাম্রাজ্যবাদীর চক্রান্ত এর অভিশপ্ত সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ হিসেবে স্বাধীন জাতীয়তাবাদী এবং ধর্মরিপেক্ষ বাংলাদেশের অভ্যুদয়।

আমরা যদি সব প্রতিকূলতার মধ্যে সেকুলার বাংলাদেশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারি, তাহলে এই উপমহাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা সফল হবে।

লেখক : ফোকলোর বিশেষজ্ঞ ও সভাপতি, বাংলা একাডেমি

ইত্তেফাক/জেডএইচ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত