জীবনসূর্য ডোবার আগেই পাথেয় জোগাড় করুন

জীবনসূর্য ডোবার আগেই পাথেয় জোগাড় করুন
প্রতীকী ছবি

প্রভাতের মৃদুমলয় গায়ে মেখে যে শ্রমিক শূন্য থলে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে, সে-ও জানে সূর্যাস্তের আগেই তাকে থলে ভরে নিতে হবে। আঁধার নামার আগেই ফিরে আসতে হবে আপনালয়ে। নতুবা আঁধার নেমে এলে তার পথ হারিয়ে যাবে। তাই সে পথ চলতে চলতে থেমে যায় না, কোনো জাদুকরের ভেলকিবাজি দেখবে বলে। কিন্তু আমরা? আমরা যারা অনন্তের পথযাত্রী। তাদের কি সেই খেয়াল আছে?

জীবন সূর্যাস্তের আগেই যে বাড়ি ফেরার পাথেয় জোগাতে হবে। আছে সেই খেয়াল? আমরা তো আমাদের বাড়ি কোথায়, তা-ই ভুলে গেছি। এই যে রোজ পাঁচবার জায়নামাজে দাঁড়িয়ে শেখানো ময়নার মতো বুলি আওড়িয়ে যাই, ‘ইহিদনাস সিরাতুল মুস্তাকিম।’ অর্থাৎ ‘আমাকে সহজ-সরল পথ দেখাও।’ এর মর্মার্থ কী, ভেবে দেখেছি? এর মর্মার্থ হলো, ‘হে প্রভু! আমাকে ঐ পথ দেখিয়ে দিন, যে পথে চললে আমার বাড়ি পৌঁছাতে পারব।’

আমাদের বাড়ি হলো জান্নাতে। সেখানেই কেটেছে আমাদের শৈশব (আমরা যখন রুহ ছিলাম)। সেখান থেকে আমাদের এই পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে পুণ্য অর্জনের জন্য, যে পুণ্যের বিনিময়ে আমরা আল্লাহর কাছ থেকে জান্নাত কিনে নেব। কিন্তু আফসোস! বোকা পথিক যেমন রঙিন প্রজাপতির পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে তার পথ ভুলে গেছে, তেমনি আমরাও এই পৃথিবীর মরীচিকার পেছনে ছুটতে গিয়ে বাড়ি ফেরার কথা ভুলে গেছি।

ভুলে গেছি, মৃত্যু আসার আগেই পুণ্যের থলে ভরে নিতে হবে। সেই ভুলে যাওয়ার কারণেই আমরা ইবাদত থেকে গাফেল। আর যারা ইবাদত করে, তা-ও নামমাত্র। লোকদেখানো। তাদের ইবাদতে প্রেম থাকে না। থাকে না বলেই এরা নামাজ পড়ে কপালের চামড়া কালো করে ফেললেও প্রভুর সাড়া পায় না। অথচ হাদিসে এসেছে, বান্দা যখন নামাজে সুরা ফাতিহা তিলাওয়াত করে, তখন আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি আয়াতের জবাব দেন। (মুসলিম :৯০৪, মিশকাত :৮২৩)

তাদের অন্তরে আল্লাহর প্রেম নেই বলেই তারা হজের মতো মহিমান্বিত ইবাদতেও সেলফিবাজিতে মত্ত হয়ে পড়ে। তাদের হজ প্রেমের টানে নয়, স্রেফ নিজেকে হাজি বলে পরিচিত করারা জন্য। একই অবস্থা কোরবানির মতো ইবাদতেও। কার পশু কত টাকায় কেনা, কারটায় কত কেজি গোশত হলো—এই নিয়ে থাকে নানান জল্পনাকল্পনা।

পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, ঐ সব দিগ্ভ্রান্ত লোকেরাই এখন সমাজের নেতা। সুদের টাকায় হজ করে মসজিদের সভাপতি। প্রতিবেশীর হক মেরে দানবীর। আর এক শ্রেণির আলেম হয়ে গেছেন তাদের তাবেদার। যেই আলেমরা ছিলেন দিনের রাহবার, সিরাতুল মুস্তাকিমের বাতিঘর, সেই আলেমরাই আজ দুনিয়ার মোহে পড়ে ভুলে গেছেন তাদের কাজ। স্বভাব ও নৈতিকতা। দীনের জন্য দরদ এখন কয়জন আলেমের আছে?

তাদের অনেকে আজ হক বলা ছেড়ে দিয়েছেন সামান্য চাকরি হারানোর ভয়ে। এমনও নজির আছে, জুমার খুতবা নির্ধারণ করে দেন মসজিদ কমিটির সভাপতি। আর খতিব সাহেবও তাদের সেই ভুজংভাজং দিয়ে তল পড়িয়ে দেয় খোদার বিধান। এমন আলেমদের প্রসঙ্গেই আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘এরা হচ্ছে সেই সব লোক, যারা সঠিক পথের বিনিময়ে ভুল পথ এবং ক্ষমার বিনিময়ে শাস্তি বদলে নিয়েছে। জাহান্নামের আগুন সহ্য করতে এদের কতই না ধৈর্য।’ (সুরা বাকারাহ :১৭৫)

অথচ একজন আলেম হবেন তাওহিদের ঝান্ডাবাহী। সিরাতুল মুস্তাকিমের পথপ্রদর্শক। তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে মহামূল্যবান পুরস্কার। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ইমানদার এবং যারা আলেম বা জ্ঞানপ্রাপ্ত, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দেবেন।’ (সুরা মুজাদালা :১১) তাই আসুন, জীবনসূর্যের আলো থাকতে থাকতে পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করে নিই। নতুবা আমাদের আর বাড়ি (জান্নাতে) ফেরা হবে না।

ইত্তেফাক/জেডএইচ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত