বাংলাদেশ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার : মার্কিন মন্ত্রী

দিল্লির চোখে ঢাকাকে দেখে না ওয়াশিংটন : মোমেন
বাংলাদেশ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার : মার্কিন মন্ত্রী
স্টিফেন ই বিগান (বাঁয়ে) ও ড. এ কে আব্দুল মোমেন

সফররত যুক্তরাষ্ট্রের উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন ই. বিগান বলেছেন, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার মনে করে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন এই অংশীদারিত্ব এগিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে এক যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি একথা বলেন।

মার্কিন মন্ত্রী বলেন, আমরা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার জন্য অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার মনে করে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ইন্দো-প্যাসিফিক বিজনেস ফোরামে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করবে। আমরা দ্বিপক্ষীয় ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা নিয়ে আরো আলোচনা করবো।

তিনি বলেন, ফ্লোরিডার মিয়ামিতে বাংলাদেশ কনস্যুলেট খোলার বিষয়ে অনাপত্তি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সেখানে অবস্থিত বাংলাদেশিরা উপকৃত হবেন। তিনি বলেন, কোভিডের কারণে ঢাকাস্থ মিশনের কার্যক্রমে সমস্যা হচ্ছে। আমরা মিশনের কাজ পুরোদমে শুরুর জন্য ব্যবস্থা নিচ্ছি, যাতে ছাত্ররা যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যেতে পারে।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে মার্কিন উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের একার সমস্যা নয়; বরং এই সমস্যার সমাধান এখন বৈশ্বিক অগ্রাধিকার। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আমাদের আলোচনা হয়েছে এবং একটি স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র যতদূর সম্ভব রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর বিষয়ে কাজ করবে, যাতে করে রোহিঙ্গাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়। একইসঙ্গে এ সমস্যার সমাধানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক উদ্যোগের ওপর জোর দিতে হবে। এই অঞ্চলের অন্যদেশগুলোরও মিয়ানমারের সঙ্গে কথা বলা দরকার, যাতে করে এই সমস্যার সমাধান হয়।

এ সময় পররাষ্টমন্ত্রী আব্দুল মোমেন বলেন, বাংলাদেশের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ অনেক বেড়েছে। এর কারণ হলো; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান, স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্র এবং এর ফলে আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত দৃঢ়। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বঙ্গবন্ধুর একজন খুনি আছে এবং কোনো খুনিকে যুক্তরাষ্ট্রের আশ্রয় দেওয়া উচিৎ হবে না। রাশেদ চৌধুরীর বিষয়ে আলোচনা করেছি এবং তিনি জানিয়েছেন তাদের অ্যাটর্নি জেনারেল বিষয়টি দেখছেন।

ভিসা ইস্যুটি মার্কিন মন্ত্রী নিজে তুলেছেন জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ছাত্র নিতে তাদের নীতিগত কোন সমস্যা নেই, কিন্তু কোভিডের কারণে মিশনের কার্যক্রম সীমিত হওয়ায় তারা ভিসা দিতে পারেননি। তারা পূর্ণ কার্যক্রম শুরু করলে ভিসা দেওয়া শুরু হবে। সম্ভবত তারা স্প্রিং সিমেস্টারে যেতে পারবে। ভারত বা পাকিস্তানে ভিসা দেওয়া হচ্ছে কারণ সেখানকার মিশনের কার্যক্রম ভালোভাবে চলছে, কিন্তু এখানে ৬০ শতাংশ কম কার্যক্রম হচ্ছে।

আমাদের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে, আইনের শাসন ও সুশাসন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ এবং সে দেশ দিল্লির চোখ দিয়ে ঢাকাকে দেখে না। যুক্তরাষ্ট্র দিল্লির চোখে বাংলাদেশকে দেখে এটি আমাদের মিডিয়া বলে। আসলে তারা দিল্লির চোখে দেখে না। বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। সবাই জানে আমাদের মূল্যবোধ ও নীতি আছে। আমরা দেশের স্বার্থের জন্য যা যা দরকার, তাই করবো। মন্ত্রী আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বাধীনভাবে দেখছে, দিল্লির চেহারা দিয়ে দেখে না। শুধু দিল্লির চেহারা দিয়ে দেখলে এখানে আসতেন না। এখানে তারা এসেছেন আমাদের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য। তারা বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো গভীর করতে চায়।

বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর

যুক্তরাষ্ট্রের সফররত উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন ই বিগান বৃহস্পতিবার সকালে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের কিউরেটর এন. আই. খান তাকে অভ্যর্থনা জানান। এ সময় বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল মিলার ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার শাহ আলী ফরহাদ উপস্থিত ছিলেন।

মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং আন্তর্জাতিক দর্শনার্থীদের বইয়ে লিখেন:‘বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসব পালনের প্রস্তুতি ও শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেশটির অংশীদার ও বন্ধু হিসেবে থাকতে পেরে গর্বিত। আমরা আগামী ৫০ বছরে আমরা বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে দেখতে চাই, যা বঙ্গবন্ধুকে গর্বিত করবে।

যুক্তরাষ্ট্র করোনা চিকিৎসায় অন্তত একশো অত্যাধুনিক ভেন্টিলেটর দেবে:স্বাস্থ্যমন্ত্রী

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু রাষ্ট্র। দেশের যেকোনো দুর্যোগে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে। এবার বাংলাদেশে কোভিড মোকাবেলা করতেও সার্বিকভাবে নানা খাতে সহায়তা করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে কোভিডসহ অন্যান্য চিকিত্সা সেবা দিতে নতুন ও অত্যাধুনিক অন্তত একশ’টি ভেন্টিলেটর দেবে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভ্যান্টিলেটর মেশিন ও গ্যাস এনালাইজার মেশিন হস্তান্তর সংক্রান্ত এক বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ তথ্য জানান।

বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সাথে আরো উপস্থিত ছিলেন আইসিটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশিদ আলমসহ অন্যান্য কর্মকর্তাবৃন্দ। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট স্টিফেন এডওয়ার্ড বিগান ও বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্ল মিলারসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে করোনা সংকট মোকাবেলায় উভয় দেশের বাস্তব অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং উভয় দেশে কোভিড-১৯ এর কারণে মৃত্যুবরণকারীদের আত্মার শান্তি কামনা করা হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী করোনাকালীন বাংলাদেশের নানা উদ্যোগ তুলে ধরেন এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিভাবে করোনা মোকাবেলায় দিক নির্দেশনা দিয়েছেন তার বর্ণনা দেন। প্রতিনিধিরা করোনা মোকাবেলায় বাংলাদেশের উদ্যোগসমূহের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বিচক্ষণ নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করেন।

স্টিফেন বিগান ভ্যাকসিন উৎপাদন শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন। উল্লেখ্য, অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নিকট দুইটি অতি উন্নত গ্যাস অ্যানালাইজার মেশিন হস্তান্তর করেন মার্কিন মন্ত্রী বিগান ও রাষ্ট্রদূত আর্ল মিলার।

ইত্তেফাক/ইউবি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত