দলীয় ছত্রছায়ার সন্ত্রাসী বাহিনী নির্মূলে দরকার বিশেষ আইন

নোয়াখালীর নারী নির্যাতন ঘটনায় হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশ
দলীয় ছত্রছায়ার সন্ত্রাসী বাহিনী নির্মূলে দরকার বিশেষ আইন
দলীয় ছত্রছায়ার সন্ত্রাসী বাহিনী নির্মূলে দরকার বিশেষ আইন। ছবি: প্রতীকী

দলীয় ছত্রছায়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তির নামে সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে উঠেছে। ধর্ষণ হত্যাসহ এমন কোনো অপরাধ নেই এই বাহিনী দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে না। এলাকাভিত্তিক গড়ে উঠা এ ধরনের সন্ত্রাসী বাহিনী নির্মূলে বিশেষ অর্ডিন্যান্স বা আইন প্রণয়ন করা দরকার যাতে করে অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিশেষ আদালতে অতি স্বল্প সময়ের মধ্যে বিচারকাজ সম্পন্ন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। আর এ ধরনের সন্ত্রাসী বাহিনী দ্রুত নির্মূল করা গেলে সংঘবদ্ধ অপরাধ ৭৫ শতাংশ কমে যাবে।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন ও ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা তদন্ত করে হাইকোর্টে এই সুপারিশ করেছে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি।

কমিটি বলছে, দলীয়ভাবে স্থানীয় নির্বাচন গ্রামীণ সমাজের সনাতন পঞ্চায়েত প্রথাকে বিলুপ্ত করেছে। গ্রামের মুরব্বিদের যে প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল এবং সামাজিক শৃঙ্খলায় যে ভূমিকা ছিল তা খর্ব হয়ে পড়েছে। দলগতভাবে বিভক্ত সমাজে মুরব্বিদের প্রভাব আর খাটছে না। ফলে দলীয় ছত্রছায়ায় অস্ত্র, মাদক ও অর্থ বলে এক শ্রেণির লোক গ্রামে ত্রাসের রাজত্ব বিস্তার করে সাধারণ মানুষকে বঞ্চনা ও নির্যাতনের মাধ্যমে জিম্মি করে রেখেছে। স্থানীয় সন্ত্রাসী বাহিনী গঠন করে স্বেচ্ছাচারিতার চূড়ান্ত অবস্থা সৃষ্টি করেছে।

রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত নিয়মিত বাহিনীকেও যেন তারা অবজ্ঞা করছে এবং প্রকারান্তরে সরকার বা রাষ্ট্রকে ঐ সন্ত্রাসী চক্র চ্যালেঞ্জ ছুড়ে রেখেছে যার অবসান হওয়া উচিত। তাই আমরা মনে করি, নিয়মিত বাহিনীর মাধ্যমে সারা দেশে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে এ ধরনের সন্ত্রাসী বাহিনী নির্মূল ও দ্রুত বিচারের সম্মুখীন করা এখন সময়ের দাবি।

বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মহিউদ্দিন শামীমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে চলতি সপ্তাহে এই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। প্রতিবেদনে নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনা সম্পর্কে কমিটি বলেছে, ঐ ঘটনার মাস্টারমাইন্ড হলো সন্ত্রাসী দেলওয়ার। আকস্মিক নয়, পূর্ব পরিকল্পিতভাবে সে তার অনুগত বাদল, কালাম ও অন্য সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে নিজেদের কুপ্রবৃত্তি ও লালসা চরিতার্থ করতে এ নারকীয় নির্যাতনের ঘটনা ঘটায়।

আর ঐ ঘটনার ভিডিও ধারণ ছিল মূলত ভিকটিমকে জিম্মিকরণের একটা জঘন্য প্রক্রিয়া যাতে সে স্বামীর ঘরে ফিরে যেতে না পারে। তাকে কেন্দ্র করে মাদক ক্রয়-বিক্রয়ের কার্যক্রম এবং দেলওয়ারের যৌন সঙ্গী হিসেবে তাকে জিম্মি রাখার কৌশল হিসেবে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। ঘটনাটি ন্যক্কারজনক, নৃশংস ও অমানবিক যা বাংলাদেশের জনগণের মানবিক চেতনাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত যাতে দেশে এ ধরনের ঘটনা সংঘটনে কেউ কখনো সাহস না করে।

পুলিশের চার কর্মকর্তাসহ সাতজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন:

নির্যাতনের ঘটনায় এক মাসেও ব্যবস্থা না নেওয়ায় নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ সার্কেলের এএসপি মো. শাহজাহান শেখ, বেগমগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ, এসআই হাবিবুর রহমান ও এএসআই মফিজুল ইসলাম, একলাশপুর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান ফিরোজ আলম ভূঞা, ৯ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার মোয়াজ্জেম হোসেন সোহাগ ও এলাকার চৌকিদার আলী আজগরের বিরুদ্ধে আদালত কর্তৃক যৌক্তিক ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করেছে কমিটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সার্কেল এএসপি চার বছর ধরে সেখানে কর্মরত আছেন। ঐ এলাকায় সুমন ও সম্রাট বাহিনী সম্পর্কে তিনি অবগত থাকলেও নারীকে বিবস্ত্র করার ঘটনা জানতেন না বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা গ্রহণযোগ্য নয়। এতে তিনি পেশাদারিত্ব ও দক্ষতা প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়েছেন।

বেগমগঞ্জ থানার ওসি হারুন অর রশিদ বিটভিত্তিক কর্মকর্তাদের কার্যক্রম তদারকিতে তার ভূমিকা ছিল শৈথিল্য। তিনি সোর্স, কমিউনিটি পুলিশ বা বিট কর্মকর্তা হতে ঘটনা অবহিত না হওয়ায় পদক্ষেপ নেননি। কিন্তু আমরা মনে করি তিনি রাষ্ট্রীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে তার কর্ম এলাকায় এত বড় ঘটনা ঘটার পরেও জানেন না বলে যে দাবি করেছেন তা যুক্তিসংগত নয়।

দুই এসআই ও এএসআই সম্পর্কে বলা হয়েছে, এরা একলাশপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিট কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। তারা দাবি করেছেন, ভিকটিম বা তার কোনো আত্মীয়স্বজন ঘটনা সম্পর্কে তাদের অবহিত করেননি। এত বড় সংঘটিত অপরাধের বিষয় জানে না বলে এরা দুই জন দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন না। এছাড়া প্যানেল চেয়ারম্যান, ৯ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার ও চৌকিদার ঘটনা সম্পর্কে জানে না বলে যে দাবি করেছেন তা গ্রহণযোগ্য নয়। এরা নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন।

স্বামীর অবস্থান সন্দেহজনক : ভিকটিমের স্বামী সাইফুল ইসলাম সুমনের অবস্থান সন্দেহজনক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে তদন্ত কমিটি। তাকে আইনের আওতায় এনে ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা যাচাই করা উচিত।

তদন্ত কমিটির জিজ্ঞাসাবাদে ভিকটিম জানায়, ঘটনার দিন জয়কৃষ্ণপুর গ্রামের বাড়িতে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় সুমন তার সম্মতিতে ঘরে আসে। বিদ্যুত্ সংযোগবিহীন প্রায় পরিত্যক্ত ঘরে সুমনের প্রবেশের ১০/১৫ মিনিটের মধ্যে বাদলের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা সেখানে হাজির হয়। এরপর তারা ভিকটিমকে গালিগালাজ করতে থাকে এবং দরজা-জানালা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে। সুমনকে সন্ত্রাসী কালাম অন্য ঘরে নিয়ে যায় এবং ভিকটিম নারকীয় ঘটনার শিকার হন।

ভিকটিম জানায়, আমার স্বামী আমাকে উদ্ধারে এ সময় কোনো চিত্কার করে নাই। কারো সঙ্গে মারপিটে জড়ায়নি, যাতে সে সন্ত্রাসীদের হাত থেকে নিষ্কৃতি পায়। সন্ত্রাসীরা সবাই ভিকটিমের স্বামী সুমনের পরিচিত। ঘটনা ঘটার পর হতে সুমন ভিকটিমের সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ করেনি। ঘটনা সংক্রান্ত বিষয় জানা সত্ত্বেও কাউকে কিছু জানায়নি এবং ঘটনার বিচার দাবি করে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ভিকটিমের ভাষ্যমতে, স্বামী সুমনের ঘটনা ও পরবর্তী কার্যক্রম ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত মনে হয়।

সুপারিশসূমহ : নারীর প্রতি যে কোনো ধরনের সহিংসতা রোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। পাঠ্যসূচিতে বিষয়টির অমানবিক দিক, নৈতিক অধঃপতন ও ধর্মীয় দৃষ্টিতে অমার্জনীয় অপরাধ—এ ধারণাসমূহ ব্যাপকভাবে প্রচারণার ব্যবস্থা করতে হবে। গ্রাম পুলিশিং কার্যক্রমকে গতিশীল করার লক্ষ্যে প্রতি ৫০ পরিবারের বিপরীতে এক জন চৌকিদার এবং ইউনিয়নের প্রতিটি ব্লক ডিজিটাল যোগাযোগের আওতায় নেওয়া হলে নিভৃত গ্রামে বসবাসকারীদের নিরাপত্তা বাড়বে, কমবে অপরাধ।

বিট পুলিশিং কার্যক্রম এবং কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা নামমাত্র চালু না রেখে তা জোরদার ও দায়বদ্ধতার মধ্যে নেওয়া দরকার। গ্রামে সন্ত্রাস, রাহাজানি, ধর্ষণ, মাদক সেবন ও ব্যবসা বন্ধে জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ ও রাষ্ট্রের নজরদারি আরো জোরদার করা দরকার।

গত ২ সেপ্টেম্বর একলাশপুর ইউনিয়নের জয়কৃষ্ণপুর গ্রামে এই নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। ৩২ দিন পর নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হলে তা সবার নজরে আসে। এ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে হাইকোর্ট ৫ অক্টোবর ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি করে দেয়।

কমিটির প্রধান চৌমুহনী সরকারি এস এ কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আবুল বাশার, সদস্য নোয়াখালীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ইসরাত সাদমীন ও জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের জবানবন্দি গ্রহণ ও পর্যালোচনা করে এ প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন।

ইত্তেফাক/জেডএইচ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত