ইসলামের দৃষ্টিতে

ন্যায়পরায়ণতা ও সুবিচার

ন্যায়পরায়ণতা ও সুবিচার
ন্যায়পরায়ণতা ও সুবিচার। ছবি: সংগৃহীত

মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে একে অন্যের সঙ্গে চলতে হলে ন্যায়নীতি রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। ন্যায়পরায়ণতা ও সুবিচার ছাড়া মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কোনো ক্ষেত্রেই শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা আসতে পারে না। এই মহত্ গুণের অধিকারী হলে মানুষ পারস্পরিক অধিকার সম্পর্কেও সচেতন হয়। এজন্য ইসলাম মানুষের মধ্যে ন্যায়বোধ প্রতিষ্ঠা ও অন্যায় থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে।

ন্যায়পরায়ণতা ইসলামি চরিত্রের বিশেষ একটি দিক। ন্যায়পরায়ণতার গুণ ছাড়া কোনো মানুষ প্রকৃত মানুষ হতে পারে না। যে মানুষের মধ্যে ন্যায়পরায়ণতা নেই, সে মানুষই না। আদর্শ মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে ন্যায়পরায়ণতার গুণে গুণান্বিত করতে হবে নিজেকে। মানুষকে সর্বপ্রথম ইনসাফ বা সুবিচার কায়েম করতে হবে তার ব্যক্তিজীবনে। ব্যক্তিজীবন শুদ্ধ করার পর তাকে পরিবারের অন্যান্য সদস্যের মধ্যেও ইনসাফ কায়েম করতে হবে।

এরপর তার দায়িত্ব হলো সামাজজীবনে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা। সমাজে বসবাসকারী ব্যক্তিরা পরস্পর সম্পৃক্ত হয়ে কর্মজীবন ও পেশাগত জীবন নির্বাহ করেন। তাই কারো প্রতি যেন কোনো অবিচার না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা সুরা নাহলের ৯০ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেন :‘নিশ্চয় আল্ল­াহ ন্যায়পরায়ণতা ও দয়ার নির্দেশ দেন এবং আত্মীয়স্বজনকে দান করার আদেশ করেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসংগত কাজ ও অবাধ্যতা থেকে বারণ করেন।’

মহান আল্লাহ অন্যত্র ইরশাদ ফারমান :‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায় সাক্ষ্যদানে অবিচল থাকবে এবং কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনো ন্যায়বিচার থেকে সরে যাবে না। সুবিচার করো, এটাই খোদাভীতির নিকটবর্তী, আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা যা করো অবশ্যই আল্ল­াহ তা ভালো করেই জানেন।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত-৮)

আল্লাহপাক সুরা নিসার ৫৮ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেন :‘তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচার-মীমাংসা করবে, তখন ন্যায়ভিত্তিক ফায়সালা করবে।’ সুবিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আপন-পর, ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু কোনো পার্থক্য নেই। যে-ই ক্ষতিগ্রস্ত হোক না কেন, ন্যায়ের মানদণ্ড অবশ্যই ঠিক রাখতে হবে।

আল্লাহপাক কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন :‘হে ইমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে আল্লাহর সাক্ষীস্বরূপ, যদিও তা তোমাদের নিজেদের এবং পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে হয়। কেউ যদি ধনী কিংবা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ তাদের শুভাকাঙ্ক্ষী তোমাদের চাইতে বেশি। অতএব, তোমরা বিচার করতে গিয়ে রিপুর কামনা-বাসনার অনুসরণ কোরো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বলো কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কর্ম সম্পর্কে অবগত আছেন।’ (সুরা নিসা, আয়াত-১৩৫)

বুখারির এক বর্ণনায় এসেছে, একবার ‘বনি মাখজুম’ গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত নারী চুরির অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে কুরাইশরা খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন। তার ব্যাপারে সুপারিশ করার জন্য হজরত উসামা ইবনে জাইদ (রা)-কে তারা নবিজির কাছে পাঠান। তিনি ছিলেন রসুলুল্লাহ (স)-এর অতিপ্রিয়। তিনি বিষয়টি রসুলুল্লাহ (স)-কে জানালে নবিজি বললেন, ‘হে উসামা! তুমি কি আল্লাহর সীমার ব্যাপারে সুপারিশ করছ? উসামা বললেন, হে আল্লাহর রসুল! ভুল হয়ে গেছে, আমাকে ক্ষমা করুন।

এরপর নবিজি একটি ভাষণ দেন এবং আল্লাহর প্রশংসা বর্ণনা করে বলেন, ‘হে লোকসকল, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহের লোকেরা এ কারণেই ধ্বংস হয়েছে। যখন তাদের মধ্যে কোনো বড়লোক চুরি করত, তাকে ছেড়ে দেওয়া হতো এবং যখন কোনো দুর্বল লোক চুরি করত, তার ওপর দণ্ডবিধি কার্যকর করা হতো। কসম সেই সত্তার, যার হাতে আমার জীবন। যদি আমার কন্যা ফাতিমাও এ অপরাধ করত, তবু আমি তার হাত কেটে দিতাম।’

ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুতি একটি জাতিকে ধ্বংস করে দেয়। ন্যায়বিচার ছাড়া কখনোই সভ্য সমাজ ও উন্নত রাষ্ট্র গড়ার কল্পনাও করা যায় না। তাই ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সর্বক্ষেত্রে আমাদের ন্যায়পরায়ণতা ও সুবিচার কায়েম করতে হবে। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমিন!

লেখক :মুহাদ্দিস, গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসা, গোপালগঞ্জ এবং খতিব :উত্তর শাহজাহানপুর আমতলা জামে মসজিদ, ঢাকা

ইত্তেফাক/জেডএইচ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত