তালাবদ্ধ কনটেইনার মালামাল হাওয়া

বন্দরের সেই চোরাই কাপড় ঢাকার ইসলামপুর ও চট্টগ্রামের টেরিবাজারে
তালাবদ্ধ কনটেইনার মালামাল হাওয়া
ছবি: সংগৃহীত

মোংলা ও চট্টগ্রাম বন্দরের সংরক্ষিত এলাকায় অহরহ আমদানিকৃত পণ্য খালাস হওয়ার আগেই চুরির ঘটনা ঘটছে। পরে তা চলে যাচ্ছে খোলাবাজারে। কড়া নিরাপত্তার মধ্যেই পণ্য চুরির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন, অনেকে দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছেন। আর চোরাকারবারিরা কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যাচ্ছেন।

গোয়েন্দারা এসব ঘটনার পেছনে শক্তিশালী সিন্ডিকেট জড়িত থাকার তথ্য উদ্ঘাটন করেছেন। বন্দরের একশ্রেণির কর্মকর্তা ও সিঅ্যান্ডএফের এজেন্ট ঐ সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। চোরের শক্তিশালী সিন্ডিকেট আমদানিকৃত পণ্যের কনটেইনারের তালা বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে খুলে পণ্যগুলো সরিয়ে ফেলে এবং তালাটি পূর্বের মতো লক করে রাখে। বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় থাকে না। পরে বৈধ ব্যবসায়ী কনটেইনার খুলতে গিয়ে দেখেন কোনো মালামাল নেই। প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া এসব ঘটনার প্রতিকার চেয়ে কোনো লাভ হয় না। উলটো কীভাবে এলসি খুলেছে এমন নানা প্রশ্নসহ বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয় বৈধ ব্যবসায়ীদের। সেই চোরাই কাপড় চট্টগ্রামের টেরিবাজার থেকে ঢাকার ইসলামপুরে আসে।

ঢাকার কোতোয়ালি থানায় একটি মামলার সূত্র ধরে মোংলা বন্দর থেকে আমদানিকৃত কাপড় চুরি করে খোলাবাজারে যাওয়ার ঘটনায় পাঁচ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমদানিকৃত পণ্য খালাস হওয়ার আগেই মোংলা বন্দরে থাকা কন্টেইনারের তালা খুলে কাপড় চুরি করে অবৈধভাবে সেগুলো ঢাকার ইসলামপুরসহ বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে আসছিল চোরাই সিন্ডিকেটের সদস্যরা।

এই চক্রের গ্রেফতারকৃত সদস্যরা হলেন—ইসলামপুরের দুই কাপড় ব্যবসায়ী শামসুল আরেফিন, মনির হোসেন, চট্টগ্রামের টেরিবাজারের কাপড় ব্যবসায়ী আবুল কাশেম, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অরুণ এবং মোংলা বেন্দরের লেবার সরদার সাগর। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. রাজীব আল মাসুদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে গোয়েন্দা পুলিশের লালবাগ বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মো. সাইফুর রহমান আজাদের নেতৃত্বে একটি টিম অভিযান চালিয়ে ইসলামপুরের আইটিসি টাওয়ারের আফরোজা টেক্সটাইলের একটি ভাড়া চোরাই গোডাউন থেকে ৯২ হাজার ৬৭২ গজ থান কাপড়সহ শামসুল আরেফিন ও মনির হোসেনকে গ্রেফতার করে।

গ্রেফতারকৃতরা জিজ্ঞাসাবাদে বলেন, চট্টগ্রামের মেসার্স কে জি এন এন্টারপ্রাইজের মালিক আবুল কাশেমের কাছ থেকে তারা ক্রয় করেছেন। গ্রেফতারকৃতদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৮ নভেম্বর অভিযান চালিয়ে চট্টগ্রামের টেরিবাজার থেকে কাপড় ব্যবসায়ী আবুল কাশেমকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে কাশেম গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের জানান যে, নিলামকারী ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঐ পণ্য কিনেছেন।

গোয়েন্দা সদস্যরা সরেজমিনে গিয়ে কাশেমের ঐ প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্ব পাননি। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কাশেমকে দুই দিনের রিমান্ডে আনে গোয়েন্দা পুলিশ। চোরাই সিন্ডিকেটের মালের পাইকারী ক্রেতা কাশেম। জিজ্ঞাসাবাদে কাশেম জানান, এসব কাপড় নিলামে নয়, মোংলা বন্দরের কন্টেইনারের তালা ভেঙে চুরির পর সেগুলো ক্রয় করা হতো। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মোংলা বন্দরের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অরুণকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। এরপর অরুণের দেওয়া তথ্যানুযায়ী বন্দরের লেবারদের সরদার সাগরকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে লেবার সরদার সাগর সিন্ডিকেটের সঙ্গে মোংলা বন্দরের বেশ কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর নাম উল্লেখ করেছেন।

চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়াল এডমিরাল আবুল কালাম আজাদ বলেন, তিনি যোগদান করার পর দুটি চুরির ঘটনা ঘটেছিল। এরমধ্যে একটি তিনি ধরে ফেলেছিলেন। আরেকটি ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। তবে বিষয়টি জানার পরই তিনি অটোমেশন পদ্ধতি চালু করেন। অটোমেশন পদ্ধতিটি হলো, যত চালান আসবে অনলাইনে দিতে হবে। খালাস হওয়া পর্যন্ত তার মনিটরিং করা হবে। এ পদ্ধতি চালু করার পর থেকে চুরির কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে তিনি জানান। এদিকে মোংলা বন্দরের চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মাহবুবুল আলম বলেন, কোতোয়ালি থানায় একটি মামলার সূত্র ধরে আমদানিকৃত পণ্য খালাসের আগে চুরির ঘটনার শক্তিশালী সিন্ডিকেট শনাক্ত করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সবাইকে গ্রেফতার করা হবে। পুলিশ কর্মকর্তা মো. রাজীব আল মাসুদ বলেন, গত ১০ সেপ্টেম্বর একজন ভিকটিমের অভিযোগের মাধ্যমে জানা যায়, তিনি চীন থেকে কাপড় আমদানি করেছেন। সেই মালামালগুলো (কাপড়) পোর্ট থেকে বের হওয়ার আগেই বাজারে বিক্রি হচ্ছে। তিনি নিজেও তার মালামালের স্যাম্পলের সাথে মিলিয়ে বাজার থেকে কিছু মাল ক্রয় করেছেন।

তিনি আরো জানান, মোংলা পোর্টের মাধ্যমে তিনি ৩ লাখ ৩০ হাজার গজ কাপড় আমদানি করেছিলেন। এমন ঘটনার প্রেক্ষিতে রাজধানীর কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা রুজু হয়। রাজীব আল মাসুদ বলেন, আমদানিকৃত কন্টেইনারের ভেতরে কী কী মাল থাকে সেটা জানে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা। তারা তাদের সিন্ডিকেটের অন্যান্য সহযোগীদের সঙ্গে একত্রে মিলে মাল খালাসের জন্য দুটি পরিবহনের পরিবর্তে চারটি পরিবহন পোর্টের ভেতরে প্রবেশ করায়। যে মালামালগুলো কাস্টমস থেকে ক্লিয়ারেন্স পেয়েছে সেগুলো দুটি গাড়িতে ওঠায়। একই মালের অন্য কন্টেইনার যেগুলো কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স পায় নাই এমন কনটেইনারের ভেতর থেকে তালা খুলে মাল বাকি দুই গাড়িতে করে সরিয়ে নেয়। এরপর এই চোরাই মালামাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চলে যেত বিভিন্ন জেলার চোরাই বাজারে। এভাবেই চক্রটি মালামাল পাচার করত। মামলাটির তদন্ত অব্যাহত আছে।

গ্রেফতারকৃতরা জিজ্ঞাসাবাদে বলেন, চোরা কারবারির জন্য মোংলা বন্দরই তাদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। আর এ কাজ করে অনেক কুলিও কোটিপতি হয়েছেন। এলসি খুলে বৈধ পথে ব্যবসা করে আসা একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক বলেন, আমদানিকৃত পণ্য বন্দর থেকে খালাস হওয়ার আগে চুরি দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসছে। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। প্রতিকার চাইলে গেলে উলটো হয়রানির শিকার হতে হয় বলে তিনি জানান।

ইত্তেফাক/এসআই

Nogod
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত