আমনের ভালো দামেও ক্ষতি পোষাতে পারছেন না কৃষক

বন্যায় ১ লাখ ৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত :কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর
আমনের ভালো দামেও ক্ষতি পোষাতে পারছেন না কৃষক
ছত্রাক আক্রান্ত খেতে কৃষক নামজুম। ছবিটি সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের—ইত্তেফাক

আমনের ভালো দাম পেলেও মুখ ভার করে গালে হাত দিয়ে ধানের বস্তার ওপরই বসে আছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব কৃষক পরান আলী। তখন মধ্যদুপুর। বেলা আড়াইটার মতো বাজে। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ভবানীপুর হাটে গত রবিবার তিনি চার বস্তা ধান নিয়ে এসেছিলেন। সবমিলিয়ে প্রায় ১০ মণ। হাটে প্রচুর ক্রেতা। ক্রেতারা দামও বলছেন ভালো। ধানভেদে মণপ্রতি ১ হাজার ৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত। অথচ গত বছরই এই ধান সর্বোচ্চ ৯০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। আর এবার মৌসুমের একেবারে শুরুতেই গতবারের চেয়ে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা মণে বেশি মিলছে। তাহলে মন খারাপ কেন পরান আলীর?

পরান আলী ইত্তেফাককে জানান, ধানের দাম তো ভালো, কিন্তু এবার আবাদ যে ভালো হয়নি। প্রতি বছর যেখানে বিঘাপ্রতি ১৪ থেকে ১৫ মণ ধান হয়, এবার সেখানে পাঁচ থেকে ছয় মণ ধান পেয়েছেন। কোনো কোনো জমিতে আরো কম হয়েছে। তাহলে ধানের দাম বেড়ে লাভ কি হলো? রায়গঞ্জের সারদা গ্রামের এই কৃষক বলেন, ‘নিজের অল্প কিছু জমির সঙ্গে বর্গা জমি মিলিয়ে প্রায় ২০ বিঘা জমিতে এবার আমনের আবাদ করেছিলাম। কিন্তু আবাদ ভালো না হওয়ায় বর্গা জমির মহাজনের ভাগের ধান দিব কীভাবে?’

কৃষক ইব্রাহীম পড়েছেন আরো সংকটে। তার নিজের কোনো জমি নেই। যে পাঁচ বিঘা জমিতে আমনের আবাদ করেছেন, তার পুরোটাই মহাজনের কাছ থেকে বর্গা নেওয়া। তার আবাদ আরো খারাপ হয়েছে। ফলে তিনি মহাজনকে কিছুই দিতে পারবেন না। এ অবস্থায় মহাজন তার কাছ থেকে জমি ছাড়িয়ে নিলে একদম পথে বসে যাবেন তিনি।

এদিকে হাট শুরু হওয়ার আগে এই এলাকার তরুণ উদ্যোগী কৃষক নাজমুল জমির পর জমিতে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত আবাদের অবস্থা দেখালেন। জানালেন, এ বছর অতিবৃষ্টি ও শেষ সময়ে দমকা বাতাসে জমির থোড় ও কাঁচা-আধাপাকা ধান মাটিতে পড়ে যায়। এছাড়া ধানে এক ধরনের ছত্রাকের আক্রমণ হয়েছে। ধানে চিটা হয়ে গেছে। এটা এমন এক ছত্রাক যে, ওষুধ দিয়েও কাজ হয়নি। তরুণ এই কৃষক আক্ষেপের সুরে বলেন, জমিতে যে কী হয়েছে, কীটনাশক দিয়েও আগের মতো ভালো ফলন পাওয়া যায় না। তিনি নিজেই বলেন, নকল কীটনাশকে বাজার ভরে গেছে। নকল জিনিস ব্যবহার করলে কি আর ফলন ভালো পাওয়া যাবে?

হাটে আসা কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ অঞ্চলের বেশির ভাগ কৃষকই দরিদ্র। তাদের নিজের কোনো জমি নেই। তারা অন্যের জমি বর্গা নিয়ে ঋণ করে চাষ করে ফসল উত্পাদন করেন। পরে ফসল ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তা বিক্রি করে দেনা শোধ করেন। কিন্তু আবাদ ভালো না হওয়ায় তারা বিপাকে পড়েছেন।

শেরপুর (বগুড়া) সংবাদদাতা আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া জানান, ধানের ভালো দাম পেলেও আবাদ ভালো না হওয়ায় পুরোপুরি খুশি হতে পারেননি কৃষকরা। শেরপুর উপজেলার শাহবন্দেগী ইউনিয়নের শেরুয়া গ্রামের কৃষক হবিবর রহমান জানান, তিনি দুই বিঘা জমিতে বিনা-৭ জাতের ধান লাগিয়েছিলেন। বৃষ্টি ও ঝড়ের কারণে দুই বিঘা জমি থেকে মাত্র ২৪ মণ ধান পেয়েছেন। আবহাওয়া ভালো থাকলে তিনি ঐ দুই বিঘা জমি থেকে প্রায় ৩৫ মণ ধান পেতেন বলে জানান।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ বছর দেশে পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে চার দফা বন্যায় ৩৫টি জেলার আমনের ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে একদিকে যেমন আমনের আবাদ কম হয়েছে, অন্যদিকে ফলনও ভালো হয়নি। ফলে এবার মৌসুমের শুরু থেকেই ধানের দাম বেশি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত রোপা আমন ৩৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ ও বোনা আমন ২২ দশমিক ৮৩ শতাংশ কাটা হয়েছে। কিন্তু ফলন ভালো না হওয়ায় কৃষকের মন খারাপ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবার রোপা ও বোনা আমন মিলিয়ে ৫৯ লাখ ১ হাজার ৮১৫ হেক্টর জমিতে ১ কোটি ৫৫ লাখ ৯০ হাজার ৮৭৪ টন ধান উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বন্যার কারণে ৫৪ হাজার ৪৩০ হেক্টর জমির রোপা আমন ও ৫০ হাজার ৯৫৮ হেক্টর জমির বোনা আমন সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, করোনা মহামারির এ সময়ে আমনের আবাদ ভালো না হওয়ায় দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। ফলে এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

এ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, বন্যাসহ নানা কারণে আমনের উত্পাদন ভালো না হওয়ায় ধানের দাম খুব বেশি। যেটি নিয়ে খুব চিন্তার মধ্যে রয়েছি। তিনি বলেন, এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে যে কোনো মূল্যে আমাদের আগামী মৌসুমে বোরো ধানের উত্পাদন বাড়াতে হবে। অন্তত ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরোর উত্পাদন বাড়াতে হবে বলে জানান তিনি। ড. রাজ্জাক বলেন, চাষযোগ্য কোনো জমি যাতে খালি না থাকে সে ব্যাপারে কৃষকদের উত্সাহ দিতে হবে। আমরা কৃষকদের যে বোরো ধানের উন্নত বীজ সরবরাহ করছি, সার, সেচসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ এবং বন্যার ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় যে প্রণোদনা দিচ্ছি তা সুষ্ঠুভাবে বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে। তা হলেই এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে।

ইত্তেফাক/এসআই

Nogod
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত