আল কোরআনের নিদর্শন

মানব ভ্রূণের বিকাশ

মানব ভ্রূণের বিকাশ
মানব ভ্রূণের বিকাশ। ছবি: সংগৃহীত

কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার সূচনালগ্নে অবতীর্ণ হয় সুরা আলাকের পাঁচটি আয়াত। কবিতার ছন্দে নাজিলকৃত সুরা আলাকের প্রথম দুটি আয়াতে মানব সৃষ্টি সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইকরা বিসমি রব্বিকাল্লাজি খালাক, খালাকাল ইনসানা মিন আলাক। ‘পড়ুন, আপনার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্তপিণ্ড থেকে’ [সুরা :৯৬ আলাক ১-২]। অর্থাত্, কোরআন শুরু হয়েছে মানুষ সৃষ্টির আলোচনা নিয়ে। এছাড়া বিভিন্ন সুরায় মানব সৃষ্টি বা মানব ভ্রূণের বিকাশ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

(১) শুত্রু থেকে মানব সৃষ্টি :মানবসন্তান সৃষ্টির মূল উপাদান শুক্র। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা কোরআন শরিফে ইরশাদ করেছেন, ‘এক শুক্রকীট থেকে তিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন’, সুসামঞ্জস্য করেছেন। [সুরা :৮০ আবাসা :১৯] ‘তোমাদের কি আমি সৃষ্টি করিনি এক তুচ্ছ জলীয় পদার্থ (শুক্র) থেকে?’ [সুরা :৭৭ মুরসালাত-২০] ‘তিনি মানবকে এক ফোঁটা বীর্য থেকে সৃষ্টি করেছেন।’ [সুরা :১৬ নাহল :৪] ‘আর তিনিই সৃষ্টি করেছেন জোড়া নর ও নারী শুক্রবিন্দু থেকে, যখন তা গর্ভে নিক্ষিপ্ত হয়।’ [সুরা :৫৩ নাজম :৪৫-৪৬] ‘সুতরাং মানুষ ভেবে দেখুক কী থেকে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সবেগে স্খলিত পানি (শুক্র) থেকে।’ [সুরা :৮৬ তারিক :৫-৬]

(২) শুক্রের অবস্থান :মানুষ সৃষ্টির প্রধান উপদান শুক্র পুরুষের মেরুদণ্ড ও পাঁজরের হাড়ের মাঝখান থেকে নির্গত হয়। এ প্রসঙ্গে সর্বশেষ আসমানি গ্রন্থ আল কোরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘মানুষ এটুকুই লক্ষ করুক না যে, তাকে কী দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। সৃষ্টি করা হয়েছে সবেগে স্খলিত পানি দ্বারা, যা মেরুদণ্ড ও পাঁজরের হাড়ের মাঝখান থেকে নির্গত হয়।’ [সুরা :৮৬ ত্বারিক :৫-৭]

(৪) জরায়ুতে শুক্রের অবস্থান :মানব ভ্রূণের প্রধান উপাদান নিষিক্ত শুক্র মাতৃগর্ভের ত্রিবিধ অন্ধকারে থাকে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমাদের সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মাতৃগর্ভে পর্যায়ক্রমে একের পর এক ত্রিবিধ অন্ধকারে।’ [সুরা :৩৯ জুমার :৬] ত্রিবিধ অন্ধকারের ব্যাখ্যায় কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরবিদ্যা ও কোষ বিভাগের প্রফেসর, প্রসিদ্ধ ভ্রূণবিজ্ঞানী এবং ‘মানবদেহের প্রবৃদ্ধি’ গ্রন্থের লেখক কেইথ এল মুর বলেছেন, কোরআনে যে ত্রিবিধ অন্ধকারের কথা বলা হয়েছে, সেই তিনটি অন্ধকার হলো :১. মায়ের পেট, ২ রেহেম বা জরায়ু, ৩. গর্ভফুল (Placenta)

(৪) জমাটবদ্ধ রক্ত থেকে মানব ভ্রূণের বিকাশ :নারীর ডিম্বাণুর বহিরাবরণে প্রচুর সিয়ালাইল লুইস এক্সসিকোয়েস নামের চিনির অণুর আঠালো শিকল শুক্রাণুকে যুক্ত করে পরস্পর মিলিত হয়। আর এই শুক্রাণু দেখতে ঠিক মাথা মোটা ঝুলে থাকা জোঁকের মতো। জোঁক যেমন মানুুষের রক্ত চুষে খায়, শুক্রাণু ঠিক তেমনি ডিম্বাণুর মধ্যে প্রবেশ করে মায়ের রক্তে থাকা প্রোটিন চুষে বেড়ে ওঠে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআন শরিফে ইরশাদ করেছেন, ‘তিনিই সেই মহান সত্তা, যিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে, পরে শুক্র থেকে, তারপর জোঁকের ন্যায় জমাটবাঁধা লেগে থাকা রক্ত থেকে।’ ‘তারপর তোমাদের শিশুরূপে বের করেন।’ [গাফির :৬৭] ভ্রূণ বিকাশের একটি পর্যায়ে ভ্রূণকে জোঁকের মতো দেখায়। তারপর তা গোশতের আকৃতি ধারণ করে এবং পর্যায়ক্রমে তা মানুষের আকৃতি লাভ করে।

(৫) জরায়ুতে ভ্রূণের বিবর্তন :আল্লাহতায়ালা কোরআন মজিদে ইরশাদ করেছেন, ‘আর আমি নিঃসন্দেহে মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটির নির্যাস থেকে। অতঃপর তাকে আমি স্থাপন করি শুক্ররূপে এক সুরক্ষিত স্থানে। তারপর আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি গোশতপিণ্ডে, এরপর গোশতপিণ্ড থেকে হাড় সৃষ্টি করি, পরে হাড়কে আমি গোশত দিয়ে ঢেকে দিই, তারপর তাকে গড়ে তুলি এক নতুন সৃষ্টিরূপে। অতএব, কতই না কল্যাণময় আল্লাহ, যিনি কারিগরদের মধ্যে সর্বোত্তম।’ [সুরা :২৩ মুমিনুন :১২-১৪]

(৬) শুক্রের গর্ভে অবস্থানের সময় :গর্ভে সন্তান গঠনের চক্র সাধারণত দীর্ঘ ২৮০ দিন যাবত্ চলতে থাকে, যা ৪০ দিন অন্তর সুনির্দিষ্ট সাতটি স্তরে বিভক্ত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা আল কোরআনে বর্ণনা করেছেন, ‘এক নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত অতঃপর আমরা একে গঠন করেছি পরিমিতভাবে, আমি কত সুনিপুণ স্রষ্টা।’ [সুরা :৭৭ মুরসালাত :২২-২৩] সর্বশেষ রাসুল হজরত মোহাম্মদ (স.) মাতৃগর্ভে মনবশিশু জন্মের স্তর সম্পর্কে বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টির উপাদান আপন মাতৃগর্ভে বীর্যের আকারে ৪০ দিন, জমাটবাঁধা রক্তে পরিণত হয়ে ৪০ দিন, গোশত আকারে ৪০ দিন। এরপর আল্লাহ একজন ফেরেশতাকে পাঠান এবং চারটি বিষয়ে আদেশ দেন যে, তার (শিশুর) আমল, রিজিক, আয়ুকাল ও ভালো না মন্দ সব লিপিবদ্ধ করতে। অতঃপর তার মধ্যে রুহ ফুঁকে দেওয়া হয়।’ [বুখারি, হাদিস নং-২৯৬৮]

(৭) রুহ সঞ্চার :আল্লাহ তায়ালা ভ্রূণে রুহ প্রদান করেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ কোরআন শরিফে ইরশাদ করেছেন, ‘অতঃপর তিনি তাকে রুহ ফুঁকিয়া দেন আর তোমাদের দান করেন কর্ণ, চক্ষু ও অন্তঃকরণ। কিন্তু তোমরা খুব কমই শোকর কর।’ [সুরা :৩২ সাজদাহ :৯]

লেখক : প্রভাষক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, টিঅ্যান্ডটি কলেজ, মতিঝিল, ঢাকা

ইত্তেফাক/জেডএইচ

Nogod
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত