জয়িতাদের জয়ী হওয়ার গল্প

জয়িতাদের জয়ী হওয়ার গল্প
খুলনা বিভাগের অর্থনৈতিকভাবে সফল ঝিনাইদহের লাভলী ইয়াসমিন। ছবি: সংগৃহীত

এ বছর বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পাঁচ নারীকে পুরস্কৃত করেছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়। খুলনা বিভাগের এই পাঁচ নারী অসামান্য শ্রম ও প্রতিভায় সমাজে শ্রেষ্ঠত্বের জায়গা করে নিয়েছেন। সেই জয়ী হওয়া নারীদের গল্পগুলো যেন অন্যদের প্রেরণা হয়ে দেখা দেয় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

ঝিনাইদহের উত্তরকাষ্ট সাগরা গ্রামের মেয়ে লাভলী ইয়াসমিন। অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী হিসেবে তার গল্পটা এখন ঝিনাইদহের ঘরে ঘরে। লাভলী ইয়াসমীন ছিলেন গ্রামের এক জন সাধারণ গৃহবধূ। ২০০১ সালে হঠাৎ স্বামীর চাকরি চলে যাওয়ায় স্কুল পড়ুয়া সন্তান নিয়ে একেবারে দৈন্যদশায় পড়েন তিনি। এ পরিস্থিতিতে বসে থাকেননি তিনি। নিজের কর্মদক্ষতা ও বুদ্ধি খাটিয়ে মাছ চাষ শুরু করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে মহিলা বিষয়ক অফিস এবং এরপর যুব উন্নয়ন অফিস থেকে ঋণ পান। পরবর্তীতে মৎস্য অফিস থেকে পান ১ লাখ টাকা ঋণ।

আরও পড়ুন: জয়িতা পদক পেলেন ঈশ্বরদীর ৫ নারী

শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারীর নাম ড. শেখ মুসলিমা মুন। নড়াইলের কালিয়া উপজেলার রামনগর এলাকার বাসিন্দা তিনি। অতি স্বল্পআয়ের সরকারি চাকরিজীবী মায়ের সংসারে ড. মুসলিমা মুনের পড়াশোনা করতে হয়েছে অতি কষ্টে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পিতাকে হারান তিনি। মায়ের স্বল্পআয়ের অর্থে চার ভাইবোনকে অত্যন্ত কষ্ট করে লেখাপড়া করতে হয়েছে। বিয়ের পরও লেখাপড়া চালিয়ে গেছেন তিনি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হতে ডিভিএম (ডক্টর অব ভেটেরিনারি মেডিসিন) ডিগ্রি অর্জন করেন। সংসার ও সন্তান লালন-পালনের পাশাপাশি তিনি ১৯তম বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে প্রাণিসম্পদ ক্যাডারে যোগদান করেন।

২০০৭ সালে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় হতে বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের প্রেক্ষাপটে প্রাণিসম্পদ উত্পাদন ব্যবস্থাপনায় লিঙ্গীয় সম্পর্ক ও নারী ক্ষমতায়ন বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, ঢাকায় অতিরিক্ত পরিচালক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

আরও পড়ুন: হাজীগঞ্জে ৫ জয়িতা পেলেন বেগম রোকেয়া সম্মাননা

সফল জননী রাবেয়া বেগম (৬১)। খুলনার পাইকগাছা উপজেলার শিবসা ব্রিজ রোড, বাতিখালীর বাসিন্দা তিনি। রাবেয়া বেগমের স্বামী ছিলেন বেসরকারি কলেজের শিক্ষক। সংসারে আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ থাকায় সন্তানদের লেখাপড়া এবং সংসার চালাতে হিমশিম খেতেন। তাই তিনি বাড়িতে হাঁস-মুরগি পালন শুরু ও বাড়ির আঙ্গিনায় সবজি চাষ শুরু করেন। এরপর বাড়িতে একটি ছোট পুকুরে মাছ চাষ করেন। এতে সংসারের সবজি, মাছ, মাংস, ডিমের চাহিদা পূরণ করে স্বল্প পরিসরে বিক্রয় করে সংসারের কিছু বাড়তি আয় হতে শুরু করে। সারা দিনের কাজ সেরে সন্তানদের সঙ্গে জেগে তাদের পড়াশোনায় সঙ্গ দিয়েছেন। এভাবেই তিনি সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তার চার সন্তানকে।

নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করেছেন সানজিদা রহমান আদরী। নড়াইল সদরের সীমাখালী গ্রামের বাসিন্দা তিনি। আদরীর বাবা ছিলেন এক জন দরিদ্র মুদি দোকানদার। অভাবের সংসারে ফুটফুটে চেহারার সানজিদার লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়াটা যেন সমাজের কিছু বখাটের চক্ষুশূল হয়। ২০০১ সালে কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে তার শরীরে অ্যাসিড ছুঁড়ে মারে বখাটেরা। শরীরের বামপাশের ঘাড় থেকে কোমর পর্যন্ত পুড়ে যায়। টানা প্রায় ছয় মাস চিকিত্সার পর বাড়ি ফিরে আসেন। মামলা করলেও জীবননাশের হুমকির মধ্যে মামলা তুলে নিতে বাধ্য হয় সানজিদা। ধীরে ধীরে নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করেন।

ব্র্যাকের সামাজিক কর্মসূচির আওতায় গঠিত ‘পল্লী সমাজ’ এর প্রেরণায় বিভীষিকাময় সব স্মৃতিকে পেছনে ফেলে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে নতুন করে পরিকল্পনা করেন। আবার কলেজে ভর্তি হন, ২০১৪ সালে সফলতার সঙ্গে স্নাতক পাশ করেন। বর্তমানে তিনি নড়াইল পৌরসভার টিকাদান কর্মসূচিতে নড়াইল সদর হাসপাতালে কর্মরত আছেন। সব বাধা ডিঙ্গিয়ে সানজিদা এখন স্বনির্ভর। কোথাও অ্যাসিডে পোড়ার খবর পেলেই তিনি ছুটে যান তার কাছে।

সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন অঞ্জনা বালা বিশ্বাস। খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলা, রূপরামপুর গ্রামের বাসিন্দা তিনি। অঞ্জনা বালা বিশ্বাস ১৯৪৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বামী-সন্তানসহ রাজাকাররা তাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। অকথ্য শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন তিনি। কোনোভাবে সেখান থেকে ছাড়া পেলে শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করা। অঞ্জনা বালার সিভিল ডিফেন্স প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ দেওয়া ছিল বিধায় আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা করতেন।

ইত্তেফাক/জেডএইচ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x