দেয়ালে পিঠ ঠেকেছে মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তদের 

দেয়ালে পিঠ ঠেকেছে মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তদের 
ছবি: সংগৃহীত

দেশজুড়ে করোনা সংক্রমণ দ্রুত বাড়ায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এক সপ্তাহের লকডাউন চলছে। এ লকডাউনের মধ্যে সাধারণ শ্রমজীবীরা কর্মহীন হয়ে পড়ে। সারাদেশে কর্মক্ষেত্র স্বাভাবিক করতে শ্রমজীবীদের পক্ষ থেকে দফায় দফায় বিক্ষোভ করা হয়। তাদের চাপের মুখে সরকার স্বাস্থ্যবিধি মেনে নির্দিষ্ট সময় কিছু কর্মক্ষেত্র খোলা রাখার নির্দেশ দেয়। এসব মানুষের মনে কিছুটা আশার আলো সঞ্চয় হয়েছিলো। তবে, আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে আবারও সারাদেশব্যাপী এক সপ্তাহ সর্বাত্মক লকডাউন ঘোষণা করেছে সরকার। সর্বাত্মক লকডাউনে জরুরি সেবা ছাড়া অন্য সবকিছু বন্ধ রাখারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জীবিকা নিয়ে ফের শংকায় পড়েছে বিভিন্ন শ্রেণির শ্রমজীবী মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষজন।

এদিকে, অর্থনীতি গবেষকরা সরকারকে পরামর্শ দিয়ে বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি কর্মহীন মানুষের জন্য দেশব্যাপী খাদ্যকর্মসূচি বাড়ানোসহ পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার।

ব্যবসায় হারিয়ে গত দুই বছর ধরে রাজধানীতে রাইড শেয়ারিং করেন ইমরান রহমান (৪০)। স্বাস্থ্যবিধি মানাতে রাইড শেয়ারিং বন্ধ থাকলেও আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর আড়ালে মাঝেমধ্যে গাড়ি নিয়ে বের হতেন তিনি। ট্রাফিক পুলিশের অনেক দৌড়ঝাপ খেয়েও চেষ্টা করতেন দিনে শেষে বাচ্চাদের জন্য কিছু নিয়ে যাওয়ার।

তিনি বলেন, ‘এখন অলিগলি দিয়ে গাড়ি নিয়ে নামতে পারছি হয়তো মাঝেমধ্যে পুলিশের দৌড়ানি খাচ্ছি। তারপরও রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বের হচ্ছি। মানুষ কিছুটা চলাচল করছে। শুনলাম ১৪ তারিখ থেকে নাকি সব কিছু বন্ধ থাকবে। তাহলে তো এভাবে আর গাড়ি নিয়ে সড়কে নামতে পারবো না। আমার সংসারে স্ত্রীসহ দুই মেয়ে আছে। বৃদ্ধা মা-বাবাকেও টাকা পাঠাতে হয়। মোটরসাইকেলটাও কিস্তিতে নেওয়া। কিস্তির টাকাও পরিশোধ করা হয়নি।মাস শেষে টাকা পরিশোধ করতে হয়। আমার একমাত্র উপার্জন বর্তমান এ রাইড শেয়ারিং।’ সামনের দিনগুলো কীভাবে চলবো বলে মাথা নিচু করে ফেলেন।

চলতি লকডাউনে শুরুতেই শপিংমল বন্ধ হওয়ায় রাজধানীর একটি শুলশানে একটি বিপনীবিতানের কর্মচারী রফিকুল ইসলাম (৩১) চলে গিয়েছিলেন কিশোরগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে। শুক্রবার শপিংমল খুলে দেওয়ার কথা শুনে দ্রুত ঢাকায় এসে কাজে যোগদান করেন। নতুনভাবে লকডাউন হচ্ছে কথা শুনে দুর্চিন্তায় পড়েছেন তিনিও। কাজ করে মাস শেষে যা আসে নিজেও চলেন। পরিবারকেও টাকা পাঠাতে হয়। তিনি বলেন, ‘টাকা খরচ করে বাড়ি গেলাম আবার তাড়াহুড়ো করে ঢাকায় ফিরে আসলাম। আমার চাকরি বন্ধ থাকলে আমার সামনের দিনগুলো কঠিন হয়ে যাবে। পরিবারও না খেয়ে থাকতে হবে। দোকান বন্ধ থাকলে মালিক আমাদেরকে বেতন কোথায় থেকে দেবে!’

তাদের মতো এমন আরও অর্ধ শতাধিক কর্ম হারানো কর্মজীবী মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তাদের জীবন-জীবিকার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানা গেছে। অনেকেই ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে গ্রামে যেতেও বাধ্য হয়েছেন। আবার কেউ কেউ নানাভাবে কাজ করে টিকে থাকার চেষ্টা করছে।

অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডি’র পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম (গবেষণা) দৈনিক ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘আগামী দিনের যেকোনো পদক্ষেপ নির্ভর করবে কোভিড আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমে আসছে কি না। এইটাই হবে মূল বিষয়। সুতরাং সেটা করার ক্ষেত্রে যে ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে যে ব্যবস্থাটি করা যাবে সরকার হয়তো সেভাবেই বিবেচনা করবেন। এখন এক্ষেত্রে যদি দেখা যায়, স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকানপাট চলছে এবং সাধারণ মানুষ সীমিত পরিসরে সেখানে আয় করার সুযোগ পাচ্ছে এবং তার সঙ্গে সঙ্গে কোভিড আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে না, কমছে। তাহলে হয়তো সরকার সীমিত পরিসরে লকডাউনের ভেতরে সে বিষয়টাকে গুরুত্ব দিতে পারে। এক্ষেত্রে যে বিষয়টি দাঁড়াবে আগের অভিজ্ঞতায় থেকে দেখা যায়, ঢিলাঢালাভাবে করলে খুব একটা ফল পাওয়া যায় না। ফলে সীমিতভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য সুযোগ দিলেও মানুষ যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বাধ্য হয় প্রয়োজনে ল ইনফোর্স এজেন্সি এবং আর্মিকে ব্যবহার করা যেতে পারে। যারা স্বাস্থ্যবিধি মানবে না, মাস্ক ব্যবহার করবে না এবং প্রতিটি জায়গায় যেটি মানার দরকার সেটি মানছে না তাহলে তাদেরকে সেখানে অর্থদণ্ড অথবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেসমস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা দেওয়া। সে ধরনের ম্যাজেট্রেটি এবং সে ধরনের পাওয়ার ব্যবহার করতে দিতে হবে, যেন সীমিতভাবে কর্মকাণ্ড চলতে পারে।’

কোভিড এর জন্য যারা কর্মহীন হয়ে পড়েছে তাদের উদ্দেশ্যে এ অর্থনৈতিক গবেষক আরও বলেন, ‘দেশব্যাপী যে সরকারের খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি রয়েছে সেটির আওতা বাড়াতে হবে, একইসঙ্গে সরকারে যে দেশব্যাপী ফুড প্রোগ্রাম রয়েছে, সাবসিডারি প্রাইজে সেটার আওতাও বাড়াতে হবে। এ কর্মসূচিগুলো যেন শুধু গ্রাম অঞ্চলে সীমাবদ্ধ না থাকে শহর অঞ্চলেও সব সাধারণ মানুষ পায়। যেমন- বস্তিবাসী, নিম্ন আয়ের মানুষ যেসব এলাকায় রয়েছে সেখানে গুরুত্ব দিয়ে এ সমস্ত কার্যক্রম বেশি চালানোর দরকার বলে মনেকরি।’

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x