কৈশোর দেখার পথ রুদ্ধ করছে করোনা

কৈশোর দেখার পথ রুদ্ধ করছে করোনা
করোনাকালে শিশুরা। ছবি: সংগৃহীত

করোনা মহামারির কারণে এক বছর ধরেই একপ্রকার বাড়িতে বসে রয়েছে মনিরা সুলতানা। এ বছর ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে মনিরা। অথচ এই বয়সেই তাকে বিয়ে দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে তার পরিবার। দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা মনিরাকে বিয়ে দিয়ে বোঝা কমাতে চায় তার বাবা-মা। শুধু মনিরা নয়, তার মতো সারাদেশে আরো অনেক কিশোরী করোনা কালে বাল্য বিয়ের শিকার হচ্ছে। মনিরার মতো মেয়েদের কৈশোর দেখার পথটাই রুদ্ধ করে দিয়েছে করোনা!

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে বাল্যবিবাহ হার ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ হলেও ভোলা জেলায় এই হার ৬০ দশমিক ৪ শতাংশ; যা উদ্বেগজনক। মহামারি কোভিড ১৯-এর কারণে স্কুল থেকে ঝরে পড়ার জন্য বাল্য বিয়ে তরান্বিত হয়েছে। আর বাল্যবিয়ের কারণে বেড়েছে নারী নির্যাতনও।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজেএফ) জরিপের তথ্য বলছে, দেশে করোনার প্রকোপে বাল্যবিয়ের হার স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেড়েছে। ২০২০ সালের জুন মাসে ৪৬২টি কন্যাশিশু বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। যদিও এই সময়ে ২০৭টি বাল্যবিয়ে ঠেকানো গেছে। অথচ ঐ বছরের মে মাসে বাল্যবিয়ে হয়েছিল ১৭০টি। বন্ধ করা সম্ভব হয়েছিল ২৩৩টি বাল্যবিয়ে। সেভ দ্য চিলড্রেনের গ্লোবাল গার্ল হুড প্রতিবেদন বলছে, করোনার কারণে ২০২০ সালে কমপক্ষে আরো ৫ লাখ মেয়েকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হতে পারে। ২০২৫ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ের শিকার হতে পারে আরো অতিরিক্ত ২৫ লাখ মেয়ে।

করোনাকালে বেড়েছে বাল্যবিবাহ, প্রতীকী ছবি (সংগৃহীত)।

গত ২৫ বছরের মধ্যে এবারই বাল্যবিয়ের হার সবচেয়ে বেশি। ২০২৫ সালে বাল্যবিয়ের সংখ্যা বেড়ে মোট ৬ কোটি ১০ লাখ হতে পারে বলে সংস্থাটি আশঙ্কা করছে। এ বছর আগের তুলনায় আরো ১০ লাখ বেশি কিশোরী গর্ভবতী হওয়ার ঝুঁঁকিতে রয়েছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, করোনা মহামারির কারণে আগামী এক দশকে আরো ১ কোটি ৩০ লাখ শিশু বাল্যবিয়ের শিকার হবে। ইউনিসেফের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে প্রতিদিন হাজার হাজার শিশু করোনার বলি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কন্যাশিশুর নিরাপত্তার অভাব, অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতার অভাব, কন্যা সন্তানকে গুরুত্ব না দেওয়া বাল্যবিয়ে বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ভিশনের শিশু ও তরুণদের অংশগ্রহণে ‘চিলড্রেন ভয়েসেস ইন দ্য টাইম অব কোভিড-১৯’ শিরোনামে এক জরিপে দেখা গেছে, করোনার প্রভাবে ৯১ শতাংশ শিশু মানসিক চাপে রয়েছে। শিশুরা এই পরিস্থিতিতে মানসিক চাপ ও উত্কণ্ঠার মধ্যে রয়েছে। মহামারির সময়ে জীবনে ছন্দপতনের জন্য সরাসরি তিনটি কারণকে উল্লেখ করেছে শিশুরা। কারণগুলো হলো-শিক্ষা কার্যক্রম ব্যহত হওয়া, সামাজিক দূরত্বের কারণে মানসিক বেদনা এবং পরিবারে দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়া।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম জানান, করোনা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সবার ব্যস্ততার সুযোগে বাবা-মা কন্যা শিশুকে বিয়ে দিচ্ছেন। এটা মূলত অভাব এবং সামাজিক নিরাপত্তার কারণে। ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের পরিচালক (অ্যাডভোকেসি) চন্দন জেড গোমেজ বলেন, প্রত্যেক পরিবারে আয় কমেছে। পারিবারিক খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এসেছে। আগে তিন বেলা খাবার খেলে এখন দুই বেলায় তা নেমে এসেছে। পরিবারে নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা বেড়েছে। অনেক পরিবার কন্যা শিশুটিকে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। প্রকোপটা যেহেতু চলমান সেক্ষেত্রে আমাদের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x