উৎপাদনশীলতায় পিছিয়ে থাকায় ঝুঁকিতে কর্মসংস্থান

মহান মে দিবস আজ
উৎপাদনশীলতায় পিছিয়ে থাকায় ঝুঁকিতে কর্মসংস্থান
কেরানীগঞ্জের কালীগঞ্জ শিপইয়ার্ডে কার্গো জাহাজ সংস্কারে ব্যস্ত এক শ্রমিক। গতকালের ছবি —ইত্তেফাক

বিশ্বব্যাপী শ্রমিকের দক্ষতার ওপর ভর করে অন্যান্য দেশ যখন তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ। নতুন করে করোনা ভাইরাসের পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যে বাজার ও উৎপাদন ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আসছে। অন্যদিকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব শুরু হওয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ছে। এ পরিস্থিতির আলোকে ও চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে যারা দ্রুত নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারবে, তারাই তীব্র প্রতিযোগিতার এ বাজারে টিকে থাকবে। এ অবস্থায় কেবল সস্তা শ্রমের বুলি দিয়ে আর দীর্ঘ সময় বাজারে টিকে থাকা সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশে শ্রমিকের দক্ষতা কিংবা নিম্ন উৎপাদনশীলতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনেক আলোচনা হলেও এক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি নেই। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য বলছে, বাংলাদেশে শ্রম শক্তির উৎপাদনশীলতা না এগিয়ে বরং গত দুই দশকে পিছিয়েছে। ২০০০-২০০৯ সালে দেশের শ্রমশক্তির উত্পাদনশীলতা ছিল ৫ শতাংশের মতো। আর ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালে তা ৪ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। অন্যদিকে গত বছর থেকে শুরু হওয়া করোনা অতিমারির পরিস্থিতিতে সার্বিকভাবে শ্রমিকের দক্ষতা তথা উৎপাদনশীলতা আরও কমেছে।

বাংলাদেশের রপ্তানির ৮৪ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই খাতের শ্রমিকের উৎপাদনশীলতার দিকে তাকালে মোটামুটি একটি চিত্র পাওয়া যাবে। পোশাক খাতে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশের তালিকায় রয়েছে চীন, ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান। এসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশের শ্রমিকের দক্ষতা সবার নিচে। চীনে যেখানে এক জন গার্মেন্টস শ্রমিকের উত্পাদনশীলতা ৬৫ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশের এক জন শ্রমিকের ৪০ শতাংশ। ভারতে এই হার ৪৫ শতাংশ, পাকিস্তানে ৪৫ শতাংশ, ভিয়েতনামে ৫৫ শতাংশ আর ইন্দোনেশিয়ায় ৫৮ শতাংশ।

শ্রমিকের দক্ষতার ঘাটতি নিয়ে মালিকপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে কথা বলে আসছেন। এমনকি সস্তা শ্রমের সুবিধা থাকা সত্ত্বেও শ্রমিকের দক্ষতার ঘাটতির কারণে এ সুবিধা পুরোপুরি নিতে পারছে না তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য খাত। তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, উত্পাদনশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রযুক্তি ও মেশিনে আমরা অনেক বিনিয়োগ করেছি। কিন্তু বহু আলোচনার পরও শ্রমিকের দক্ষতা সে হারে বাড়েনি। বর্তমানে করোনা পরিস্থিতির কারণে পণ্যের চাহিদা, বাজার ও উৎপাদনের গতিধারা পরিবর্তন হচ্ছে। অন্যদিকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কারণে প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়াতে হবে। কিন্তু এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শ্রমিকরা দক্ষতা তথা উত্পাদনশীলতা না বাড়াতে পারলে আমরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাব। ফলে সার্বিকভাবে বাজারে টিকে থাকতে পারব না।

প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের শ্রমিকদের পিছিয়ে থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন শ্রমিক প্রতিনিধিরাও। সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার ইত্তেফাককে বলেন, অন্য দেশগুলোতে শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য যে ধরনের উদ্যোগ রয়েছে, বাংলাদেশে তা নেই। এখানে শ্রমিকরা কাজ করতে করতে যা শিখে, তাই। ফলে অনেক সময় নতুন প্রযুক্তি ও নতুন মেশিনের সঙ্গে তারা সহজে খাপ খাওয়াতে পারে না। অবশ্য দেশে শ্রমিকের দক্ষতায় পিছিয়ে থাকার পেছনে অপেক্ষাকৃত কম মজুরিকে দায়ী করে তিনি বলেন, কম মজুরি দিয়ে কীভাবে আপনি দক্ষ শ্রমিক পাবেন?

তবে অর্থনীতিবিদরা উত্পাদনশীলতা তথা শ্রমিকের দক্ষতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। সামষ্টিক অর্থনীতিবিদ ও আইটি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ইত্তেফাককে বলেন, বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলো শ্রমিকের উৎপাদনশীলতার ওপর ভর করে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের শ্রমিক সে তুলনায় দক্ষতায় অনেক পিছিয়ে। এ ক্ষেত্রে উন্নতি করতে না পারলে ভবিষ্যতে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শিল্প টিকে থাকা কঠিন হবে। শিল্প টিকতে না পারলে কর্মসংস্থানও টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।

এমন বাস্তবতায় আজ বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে মহান মে দিবস। দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম ও আট ঘণ্টা বিনোদন এবং শ্রমের ন্যায্য মজুরির দাবিতে ১৮৮৬ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে ধর্মঘটের ডাক দেন শ্রমিকরা। এক পর্যায়ে পুলিশের গুলিতে অনেক শ্রমিক হতাহত হন। আন্দোলনের পুরোভাগে থাকা সাত শ্রমিক নেতাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। ১৮৯০ সালে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক প্যারিস কংগ্রেসে বিশ্বব্যাপী মে মাসের ১ তারিখ ‘মে দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। সেই থেকে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী মে মাসের এক তারিখে শ্রমিকদের প্রতি সম্মান জানাতে মে দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে করোনা পরিস্থিতিতে লকডাউনের কারণে গতবারের মতো এবারও মে দিবসের সব ধরনের কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে। যদিও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন সীমিত আকারে কিছু কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে।

দিবসটি উপলক্ষ্যে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে সরকারের পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকদেরও শ্রমজীবী মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ সংরক্ষণ ও সার্বিক জীবনমান উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। মে দিবসের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে পারস্পরিক সুসম্পর্ক বজায় রেখে শ্রমিক ও মালিকের উৎপাদন বৃদ্ধিতে নিবেদিত হতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে শ্রমিকের উন্নয়নে তার সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন। তিনি মুজিববর্ষে মহান মে দিবসের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে করোনা মহামারির মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দেশের অগ্রযাত্রায় নিজ নিজ অবস্থান থেকে সবাইকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

মে দিবসে জেপির শুভেচ্ছা

মহান মে দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশসহ বিশ্বের শ্রমিকদের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়েছেন জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম। তারা বলেন, মহান মে দিবসের প্রধান শিক্ষা হলো মেহনতি মানুষের দৃঢ় ঐক্য গড়ে তোলা এবং ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জোর সংগ্রামের শপথ করা।

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x