অবৈধ মাদক ও আগ্নেয়াস্ত্রের অর্থ যাচ্ছে বিটকয়েনে

১ কোটি ৭ লাখ টাকায় অডি গাড়ি ক্রয় # ২০ লাখ টাকার গাড়ি ২ লাখ টাকায় বিক্রি
অবৈধ মাদক ও আগ্নেয়াস্ত্রের অর্থ যাচ্ছে বিটকয়েনে
বিটকয়েন। ছবি: সংগৃহীত

২০ লাখ টাকার গাড়ি ২ লাখ টাকায় বিক্রি হয় বিটকয়েনের মাধ্যমে। আবার ১ লাখ টাকার মোবাইল ফোন মাত্র ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। ক্রেতা ক্রেডিট কার্ড বা অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করলেও প্রতারক চক্রটি মূল্যবান জিনিসটি ফেক আইডির ভার্চুয়াল ওয়ালেট দিয়ে বিদেশ থেকে কিনে আনে। বিদেশী বিক্রেতা জিনিসটি বিটকয়েনের মাধ্যমে লেনদেন করে।

এখানে ক্রেতা সনাক্ত করার কোনো উপায় থাকে না। বাংলাদেশ থেকে ফেক আইডি দিয়ে জিনিসটি কেনার পর ওই সাইটটি তারা বন্ধ করে দেয়। এরপর ওই জিনিসটি বাংলাদেশে তারা সস্তায় বিক্রি করে দিয়ে মার্কেট থেকে টাকা তুলে নেয়। এভাবেই বাড্ডার বেসিক বিজ মাকের্টিং নামক অনলাইন দিয়ে গত ৭ বছরে কোটি কোটি টাকার প্রতারণা করেছে। দেশে বিটকয়েন অবৈধ বলে, তারা গোপনে এ ব্যবসা চালিয়ে যেতো। বেসিক বিজ মার্কেটিংয়ের অনলাইনে বিটকয়েনের মাধ্যমে অবৈধ মাদক ও আগ্নেয়াস্ত্রের চালানের অর্থও পরিশোধ করা হয়েছে। এ ধরনের আরো দুইটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। বিটকয়েনের প্রতারণায় অনেক ব্যবসায়ি সর্বশান্ত হয়েছেন।

রাজধানীর বাড্ডা থেকে বেসিক বিজ মাকের্টিং নামক অনলাইনের ডিজিটাল মুদ্রা বিটকয়েনের ব্যবসা করার অভিযোগে সুমনসহ গ্রেফতার ১২ জনকে গতকাল পুলিশ ৩ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে। বাড্ডা থানার ওসি পারভেজ ইসলাম বলেন, গ্রেফতারকৃত ১২ জনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

বিশ্বের সর্বপ্রথম মুক্ত সোর্সের ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রার নাম বিট কয়েন। যাতে লেনদেন করতে প্রয়োজন হয় না কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার। ২০০৯ সালে সাতোশি নাকামোতা নামের ছদ্মনামি কোন এক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী শুরু করে বিট কয়েনের প্রচলন। যদিও পরে এই নামে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব মেলেনি এখন পর্যন্ত। পিয়ার টু পিয়ার মানে গ্রাহকের সাথে গ্রাহকের সরাসরি যোগাযোগে অনলাইনে লেনদেন হয় বিট কয়েন।

বর্তমানে একেকটি বিট কয়েনের মূল্য বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৪৯ লাখ ১১ হাজার টাকা। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপানসহ বিশ্বের মোট ৬৯টি দেশে সরকারি স্বীকৃতি নিয়ে চলছে এই ব্যবসা। প্রতিবেশি ভারতও আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নিয়েছে এ লেনদেনকে। তবে বাংলাদেশ ২০১৪ সালে অবৈধ ঘোষণা করে বিট কয়েন লেনদেনকে। নিষিদ্ধ করা তালিকায় আছে বাংলাদেশ, আলজেরিয়া, বলিভিয়া, ইকুয়েডর, নেপাল ও মেসেডোনিয়া। ২০১৯ সালের এপ্রিলে বগুড়া থেকে বিট কয়েন ব্যবহার করে জুয়া খেলার অভিযোগে ৩ জন গ্রেপ্তার হয়। চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি গাজীপুর থেকে রায়হান নামে এক গার্মেন্টস শ্রমিককে ১ কোটি ৭ লাখ টাকার একটি অডি গাড়িসহ গ্রেফতার করে। রায়হান বিটকয়েনের ব্যবসা করে কোটি টাকার মালিক হয়ে যান। বিটকয়েন দিয়ে তিনি অডি গাড়িটি কিনেছিলেন।

র‌্যাবের লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, বেসিক বিজ মার্কেটিং নামক অনলাইন আউট সোর্সিং ব্যবসার আড়ালে অবৈধ বিট কয়েন ও অনলাইন বিভিন্ন প্রতারণার ফাঁদ তৈরি করে দীর্ঘদিন যাবত ব্যবসা করে আসছে চক্রটি। এই ব্যবসার মূলহোতা ইসমাইল হোসেন সুমন। ২০১৩ সালে একটি ছোট অফিস দিয়ে শুরু করলেও এখন বাড্ডায় ৩টি ফ্লোরে ৩২ জন কর্মচারী নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলো সে। প্রতিষ্ঠানটি ৩টি শিফটে ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকতো। এই ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল অর্থের মালিক বনে গেছে সুমন।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সুমন জানিয়েছে, ঢাকায় তার ২টি ফ্লাট, প্লট, সুপার শপের ব্যবসা রয়েছে। তার একাধিক ভার্চুয়াল ওয়ালেট রয়েছে। যেখানে বিট কয়েনের মাধ্যমে অর্জিত লক্ষাধিক ডলার মজুদ রয়েছে। সে আরো জানিয়েছে, বিগত বছরে তিনি বিট কয়েনের মাধ্যমে অবৈধভাবে ১২-১৫ লক্ষ ডলার লেনদেন করেছে। পাশাপাশি সে বিভিন্ন দেশি-বিদেশী ই-মার্কেটিং সাইটে আকর্ষণীয় মূল্যে বিজ্ঞাপন দিতো।

বিদেশের ভার্চুয়াল ওয়ালেট থেকে তারা দামি পণ্য বিট কয়েন দিয়ে কিনে নেয়। এরপর পণ্য ডেলিভারি হওয়ার আগে আগাম কিছু অর্থ পরিশোধ করে। পণ্যটি ডেলিভারি হওয়ার পর তারা তাদের ভুয়া ভার্চুয়াল ওয়ালেটটি বন্ধ করে দেয়। এভাবে তারা কোটি টাকার পণ্য কিনে দেশে তারা খুব কম দামে দ্রুত বিক্রি করে দেয়। অবৈধ মাদক ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে। এই চক্রের লেনদেনর টাকাও তারা বিটকয়েনে পরিশোধ করে। তারা জুয়াড়িদের কাছে বিটকয়েন বিক্রি করতো।

ইত্তেফাক/এসআই

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x