আনন্দের ঈদ, কষ্টের যাত্রা

পথে পথে ভোগান্তি তবুও ছুটছে মানুষ
আনন্দের ঈদ, কষ্টের যাত্রা
ট্রাকে ঝুঁকি নিয়ে অনেকে ফিরছেন গ্রামে। রাজধানীর গাবতলীর আমিনবাজার থেকে তোলা। ছবি: আব্দুল গনি

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে এবারের ঈদে গ্রামের বাড়িতে যেতে মানুষকে নিরুত্সাহিত করতে বন্ধ রাখা হয়েছে দূরপাল্লার পরিবহন। কিন্তু ঈদে ঘরমুখী মানুষের ঢল ঠেকানো যায়নি। তবে যানবাহনের স্বল্পতার সঙ্গে গতকাল ভোরের বৃষ্টি ভোগান্তি বাড়িয়েছে কয়েক গুণ।

গতকাল ভোর থেকে রাস্তায় রাস্তায় ছিল সাধারণ মানুষের জটলা। দূরপাল্লার গণপরিবহন বন্ধ থাকায় ভেঙে ভেঙে গন্তব্যে ছুটছেন তারা। প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, কাভার্ড ভ্যান ভাড়া করে যে যার মতো ছুটছেন বাড়ির পথে। যানবাহনের চাহিদা বেশি থাকায় ভাড়াও গুনতে হচ্ছে কয়েক গুণ বেশি।

ট্রাকে ত্রিপলের নিচে লুকিয়ে যাত্রা: খোঁজ নিয়ে যানা যায়, ট্রাকে অভিনব কায়দায় বহন করা হয়েছে যাত্রী। দৃশ্যটা এমন—পুরো ট্রাক ত্রিপল দিয়ে ঢাকা। বাইরে থেকে দেখে মনে হবে ভেতরে রয়েছে পণ্য। আসলে ছিল মানুষ। ট্রাকের সামনের দিক থেকে একজন একজন করে যাত্রী তুলে তাদের নিয়ে ঢোকানো হচ্ছিল ত্রিপলের ভেতরে। এভাবে গাবতলী থেকে পাটুরিয়া ফেরিঘাট পর্যন্ত যাত্রীভেদে দরকষাকষি করে ভাড়া নেওয়া হয়েছে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা।

ট্রাকে ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরছে মানুষ। ছবি: আব্দুল গনি

গাবতলী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় কর্তব্যরত বিভিন্ন ট্রাফিক পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জানিয়েছেন, পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পারাপার নিষেধ। এ কারণে বেশ কয়েকটি পিকআপ ভ্যান ও ট্রাক জব্দ করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে ৪১ হাজার যান পারাপার: ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে রেকর্ডসংখ্যক যানবাহন পারাপার হয়েছে। গত সোমবার ভোর ৬টা থেকে গতকাল মঙ্গলবার ভোর ৬টা পর্যন্ত এই সেতু দিয়ে মোট ৪১ হাজার ৬২৫টি যানবাহন পারাপার হয়। এর মধ্যে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যাই ছিল সর্বাধিক। এতে টোল আদায় করা হয়েছে ৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। স্বাভাবিক সময়ে এই সেতু দিয়ে ১১ থেকে ১২ হাজার যানবাহন চলাচল করে। বর্তমানে প্রায় চার গুণ যানবাহন পারাপার হচ্ছে। সেতু কর্তৃপক্ষের সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

এদিকে দূরপাল্লার বাস বন্ধ থাকায় যাত্রীরা পড়েছে চরম বিপাকে। মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে যাত্রীরা গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছে। দীর্ঘ সময়েও গাড়ি না পেয়ে অনেকে হেঁটেই গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। এ ব্যাপারে এলেঙ্গা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইয়াসির আরাফাত জানিয়েছেন, মহাসড়কে দূরপাল্লার বাস না চললেও ট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহনের চাপ রয়েছে। তবে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। কোথাও যানবাহন আটকে নেই।

নিষেধ অমান্য করে বঙ্গবন্ধু সেতু পার হয়েছে ৫০০ দূরপাল্লার বাস

বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে পার হচ্ছে যানবাহন। ছবি: ইত্তেফাক

গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গে যাতায়াতের প্রবেশদ্বার ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা মোড় ও চন্দ্রা-নবীনগর মহাসড়কের বাড়ইপাড়া এলাকার নন্দন পার্কের সামনে বসেছে পুলিশের চেকপোস্ট। চেকপোস্টে যাত্রীদের নামিয়ে গাড়ি ঢাকামুখে ফেরালেও ফিরছে না মানুষ। যাত্রীরা পায়ে হেঁটে কিছু দূর গিয়ে আবারও গাড়িতে ওঠার চেষ্টা করছে। গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানার ওসি মো. মনোয়ার হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, শিল্প কারখানা অধ্যুষিত চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ঈদে অন্য বছরগুলোয় যানজট থাকলেও এবার তা নেই। তবে গাড়ির সংকটে সেখানে এবার সৃষ্টি হয়েছে জনজট।

পাটুরিয়া ঘাটে ফেরি দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ছে যাত্রীরা

মানিকগঞ্জ (শিবালয়) প্রতিনিধি জানান, পাটুরিয়া নৌঘাটে সকাল থেকেই ছিল যাত্রীর চাপ। সবগুলো পন্টুন থেকে ফেরি পারাপার বন্ধ থাকলেও একটি ঘাট থেকে শুধু জরুরি সেবার জন্য ফেরি পারাপার করা হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিসির ভারপ্রাপ্ত ডিজিএম জিল্লুর রহমান জানান, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীদের চাপ বাড়তে থাকে। পাশাপাশি বিভিন্ন কায়দায় কিছু প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাস ঘাটে ঢুকে পড়ায় সেগুলো পারাপার করা হয়েছে। এছাড়া লাশবাহী গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি পরিবহনগুলোর সঙ্গে যাত্রী পারাপারে বর্তমানে সাত-আটটি ফেরি সচল রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত ডিজিএম জিল্লুর রহমান।

এদিকে করোনার প্রকোপ ঠেকাতে দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার ঘরমুখী যাত্রীদের থামাতে নামানো হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। মানিকগঞ্জ জেলার তিনটি গুরত্বপূর্ণ জায়গায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। স্থানগুলো হচ্ছে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে মানিকগঞ্জের প্রবেশপথ বারোবাড়িয়া, শিবালয়ের টেপরা এবং হেমায়েতপুর-সিংগাইর আঞ্চলিক সড়কের ধল্লা এলাকা।

শিমুলিয়ায় সব ফেরি চালু

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাটে শেষ সময়ে ঈদে ঘরমুখী মানুষের ঢল যেন থামছেই না। সব বাধা উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ ফেরিঘাটে যাচ্ছে। বাঁধভাঙা স্রোতের মতো লোকজন ফেরিতে ওঠার চেষ্টা করছে। মাদারীপুরের বাংলাবাজার থেকে আসা কোনো ফেরি শিমুলিয়ার ঘাটে ভিড়তেই আগে ওঠার প্রতিযোগিতায় হুমড়ি খেয়ে পড়ছে তারা। তবে সকাল থেকে বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করে সব ফেরি দিয়ে যাত্রী ও যানবাহন পারাপার করছে ঘাট কর্তৃপক্ষ। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কিছুটা কমেছে।

শিমুলিয়ায় ফেরিঘাটে ঘরমুখো মানুষের উপচেপড়া ভিড়

শিমুলিয়া ফেরিঘাটে ঘরমুখী মানুষের উপচেপড়া ভিড়। ছবি: আব্দুল গনি

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের শিমুলিয়া ঘাট ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) সাফায়েত আহমেদ বলেন, সকাল থেকে বহরে থাকা সব ফেরি দিয়ে যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে। এতে ঘাটের যানবাহন ও যাত্রীদের চাপ অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।

চেকপোস্ট বসিয়েও মানুষের স্রোত ঠেকানো যাচ্ছে না

সাভার থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, সাভারে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সংযোগ পয়েন্টগুলোতে চেকপোস্ট বসিয়ে ঈদ উপলক্ষ্যে ঘরমুখো মানুষের স্রোত ঠেকাতে পারছেন না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। রাজধানীর গাবতলী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে সুনসান নীরবতা থাকলেও পায়ে হেঁটে আমিনবাজার সেতু পার হয়ে লোকাল বাস কিংবা অটোতে চেপে গ্রামের বাড়ির পথ ধরেছে অসংখ্য মানুষ। যে যেভাবে পারছে মরিয়া হয়ে ছুটছে গ্রামের পথে। সাভারের ট্রাফিক ইনচার্জ (টিআই) আব্দুস সালাম বলেন, মানুষকে সচেতন করতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে চেকেপোস্ট বসিয়েও কার্যকর কোনো ফল মিলছে না।

রাতে চলছে দূরপাল্লার বাস

ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) সংবাদদাতা জানান, সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে উপজেলা দিয়ে রাতের আঁধারে চলছে দূরপাল্লার বাস। অন্যদিকে দিনের বেলায় চলছে যাত্রীবাহী মাইক্রোবাস ও প্রাইভেট কার। তারা যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করছে অতিরিক্ত ভাড়া।

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x