কেনো বজ্রপাতে এতো মৃত্যু?

ভৌগোলিক কারণেই এখানে বজ্রপাত বেশি বছরে গড়ে মারা যাচ্ছে ২১৬ জন
কেনো বজ্রপাতে এতো মৃত্যু?
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে প্রতি বছরই বজ্রপাতে অনেক মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। প্রায় প্রতিদিনই বজ্রপাতে একাধিক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। গত মধ্য এপ্রিল থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বজ্রপাতে দেড়শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আর মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত ৪ মাসে বজ পাতে ১৭৭ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে বলে গতকাল শুক্রবার রাজধানীর পল্টনে সেভ দ্য সোসাইটি থান্ডারস্টার্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরামের নিজস্ব কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

চার মাসে বজ্রপাতে ১৭৭ জনের মৃত্যু

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ার যে দেশগুলোয় বজ্রপাতের প্রবণতা বেশি, তার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশও। কিন্তু এর কারণ কী? বাংলাদেশে বজ্রপাত নিয়ে যারা গবেষণা করছেন তাদের মতে, বাংলাদেশে বজ্রপাতের মূল কারণ দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান। বাংলাদেশের একদিকে বঙ্গোপসাগর, এরপরই ভারত মহাসাগর। সেখান থেকে গরম আর আর্দ্র বাতাস আসছে। আবার উত্তরে রয়েছে পাহাড়ি এলাকা, কিছু দূরেই হিমালয় রয়েছে, যেখান থেকে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে। এই দুই বাতাসের সংমিশ্রণ বজ্রপাতের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুবরণ করেছেন ২ হাজার ১৬৪ জন মানুষ। গড়ে প্রতি বছর ২১৬ জনের বেশি মানুষ প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে মৃত্যুবরণ করেছেন।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল এই অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবেই বেশি বজ্রপাত হয়। কেননা, এই অঞ্চলে বজ্রমেঘের সৃষ্টিই হয় বেশি। বজ্রমেঘ বেশি তৈরি হওয়ার কারণও প্রাকৃতিক। পৃথিবীর আদিকাল থেকেই বজ্রপাত ছিল। তবে মৃত্যুর হার সম্প্রতি বেড়েছে বলেই মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা। দেশে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত। তবে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায়, যারা ঘরের বাইরে থাকেন। এক্ষেত্রে কৃষকদের মৃত্যুর সংখ্যা-ই বেশি।

সাপাহারে ২ ভাইয়ের ওপর বজ্রপাত, একজনের মৃত্যু

আবহাওয়াবিদ আফতাব উদ্দিন বলেন, বজ্রপাত তিন ধরনের। এক ধরনের বজ্রপাত এক মেঘ থেকে আরেক মেঘে হয়। অন্য ধরনের বজ্রপাত এক মেঘের এক স্থান থেকে আরেক স্থানে হয়। আর অন্যটি হয় মেঘ থেকে ভূমিতে। এসব কারণেই মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। কারো ওপর বজ্রপাত হলে, সেটা থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো উপায় নেই। তবে বজ্রপাত যাতে এড়িয়ে চলা যায় সে ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড স্থাপন মৃত্যু কমানোর ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো এভাবে সফলতা পেয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃতিকে বৈরী করে তোলার পাশাপাশি মোবাইল ফোনের ব্যবহারসহ জীবনযাত্রার পরিবর্তন এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। তাদের মতে, নদী শুকিয়ে যাওয়া, জলাভূমি ভরাট হওয়া আর গাছ ধ্বংস হওয়ায় দেশে অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা এক থেকে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে। বিশেষ করে বর্ষা আসার আগের মে মাসে তাপমাত্রা বেশি হারে বাড়ছে। এতে এই সময়ে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। আর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর থেকে ভেসে আসা আর্দ্র বায়ু আর উত্তরে হিমালয় থেকে আসা শুষ্ক বায়ুর মিলনে বজ্রঝড় সৃষ্টি হচ্ছে। বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একসময় দেশের বেশির ভাগ গ্রাম এলাকায় বড় গাছ থাকত। তাল, নারিকেল, বটসহ নানা ধরনের বড় গাছ বজ্রপাতের আঘাত নিজের শরীরে নিয়ে নিত। ফলে মানুষের আঘাত পাওয়ার আশঙ্কা কমতো।

বজ্রপাত থেকে বাঁচতে কী করবেন

বজ্রপাত নিয়ে যারা গবেষণা করছেন তাদের মতে, দেশের বেশির ভাগ মানুষের কাছে এখন মোবাইল ফোন আছে। দেশের অধিকাংশ এলাকায় মোবাইল ফোন ও বৈদ্যুতিক টাওয়ার রয়েছে। দেশের কৃষিতেও যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। তা ছাড়া, সন্ধ্যার পরে মানুষের ঘরের বাইরে অবস্থান বাড়ছে। আর বেশির ভাগ বজ্রপাতই হয় সন্ধ্যার দিকে। আকাশে সৃষ্টি হওয়া বজ্র মাটিতে কোনো ধাতব বস্তু পেলে তার দিকে আকর্ষিত হচ্ছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আতিকুল হক বলেছেন, হাওর এলাকায় বজ্রপাত প্রতিরোধক দণ্ড (লাইটনিং অ্যারেস্টার) স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আগে যে ১৩ লাখ তালগাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেটার কী অবস্থা? জবাবে তিনি বলেন, ওটা নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়নি। বেশির ভাগ গাছ রাস্তার দুই পাশে লাগানো হয়েছে। কিন্তু বজ্রপাতে মৃত্যু বেশি হচ্ছে খোলা মাঠে।

আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করে সিনিয়র আবহাওয়াবিদ ড. আবদুল মান্নান বলেন, দেশে বজ্রপাতের হটস্পট হচ্ছে মধ্যাঞ্চল। তিনি বলেন, তথ্য পর্যালোচনা করে আমরা পেয়েছি, নেত্রকোনা, নরসিংদী, কুমিল্লাসহ দেশের এ মধ্যাঞ্চল বজ্রপাতের হটস্পট।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে আগাম সতর্কতা সিস্টেম। এতে মানুষ ঘরের বাইরে কম বের হলে স্বাভাবিক ভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। এ ব্যবস্থা ভারতে কাজে লাগিয়ে ইতিবাচক পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, সরকারিভাবে যদি মাঠে বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন করা যায়, সেটা অনেক বড় ভূমিকা রাখবে। সবকিছুর মূলে মানুষকে সচেতন হতে হবে।

উষ্ণতায় বেড়েছে বজ্রপাত এক দিনেই নিহত ১২

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে ভেনিজুয়েলা এবং ব্রাজিলে। কিন্তু সেখানকার তুলনায় বাংলাদেশে মৃত্যুর ঘটনা অনেক বেশি। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে খোলা জায়গায় মানুষজন কাজ করার কারণে সেখানে হতাহতের ঘটনা বেশি ঘটছে। ফিনল্যান্ডের বজ্রপাতবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ভাইসালার হিসাবে, দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর ৭০ শতাংশ ঘটনা ঘটে কৃষিকাজ করার সময়। এ ছাড়া বাড়ি ফেরার পথে সাড়ে ১৪ শতাংশ এবং গোসল করা ও মাছ ধরার সময় ১৩ শতাংশ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

বজ্রপাত নিয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডার অ্যাওয়ারনেস ফোরামের গবেষণা সেলের নির্বাহী প্রধান আব্দুল আলীম বলেন, গণমাধ্যমের তথ্য পর্যালোচনা করে আমরা দেখেছি- গত ৬ জুন এক দিনেই অন্তত ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে বজ্রপাতে। বরাবরের মতো কৃষকের সংখ্যাই বেশি, তারপর জেলে এবং ছাদে-মাঠে খেলারত শিশু। অসচেতনতার কারণেই মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে।

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x