উত্তরাঞ্চলের হাসপাতালে ডাক্তারের তীব্র সংকট

সরকার ৪৭০টি পদের অনুমোদন দিলেও পদায়ন হচ্ছে না  উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে এ বিলম্ব: অভিযোগ ডাক্তারদের
উত্তরাঞ্চলের হাসপাতালে ডাক্তারের তীব্র সংকট
ছবি: আব্দুল গনি (ফাইল ছবি)

দেশের উত্তরাঞ্চলে হাসপাতালে তীব্র ডাক্তার সংকট দেখা দিয়েছে। আগে থেকে চিকিৎসক সংকট ছিল। করোনা সামাল দিতে গিয়ে এই সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জরুরি ভিত্তিতে ৪৭০ জন এনেসথেসিওলজিস্ট পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল।

বয়সও শিথিল করা হয়েছিল। কিন্তু দেড় মাসেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। উত্তরাঞ্চলের মধ্যে শুধু রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর ও বগুড়ায় আইসিইউ আছে। চাহিদার তুলনায় এই চারটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউয়ের সংখ্যা খুবই সীমিত। সুচিকিৎসার অভাবে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে অনেক করোনা রোগী মারা যাচ্ছেন। করোনা সংক্রমণ এখন সব জেলাতেই ছড়িয়ে পড়ছে।

এরমধ্যে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট (ডেলটা) ধরা পড়ছে। করোনা পরবর্তী ব্ল্যাক ফাঙ্গাসেও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সামনে ভয়ংকর পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন।

ছবি: আব্দুল গনি

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, করোনা রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে প্রায় ২০০ ডাক্তার মারা গেছেন। তারপরও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন ডাক্তাররা। এখন জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসক সংকট দ্রুত সমাধান হওয়া জরুরি। প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দেওয়ার পরও কেন ৪৭০ জন এনেসথেসিওলজিস্ট পদে পদায়ন দেওয়া হয়নি? ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্যে কি বিলম্বিত করা হচ্ছে? এটা কি রোগী মারার ব্যবস্থাপনা? এই সিস্টেম থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কারণ কত রোগী সুচিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে—তার হিসাব নেই। চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা না বাড়ালে করোনার মৃত্যুর হার আরো বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি অন্যান্য মন্ত্রণালয়ও সম্পৃক্ত। সবগুলোরই একই অবস্থায়। কেনাকাটার ফাইল বিদ্যুতের গতিতে কাজ হয়। কারণ সেখান থেকে টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু চিকিৎসাসেবা প্রদানের মতো ইমার্জেন্সি কাজগুলো বিলম্বিত হয় বলে কয়েক জন ডাক্তার জানান। এদিকে নতুন করে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধির ধারায় দৈনিক রোগী শনাক্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে।

২৪ ঘণ্টায় দেশে আরো ৩ হাজার ৩১৯ জনের মধ্যে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। যা গত ৫৩ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ। ঢাকা নগরীসহ জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বাধিক ৫৫০ জন কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর পরে বেশি শনাক্ত হয়েছে রাজশাহী (৩৫৩ জন), যশোর (২৪৯), নোয়াখালী (১৯১ জন), খুলনা (১৬৬ জন), চট্টগ্রাম (১৫৮ জন)।

ছবি: আব্দুল গনি

খুলনা ও রাজশাহী বিভাগের জেলাগুলোতে রোগী শনাক্তের হার বেশি। গত এক দিনে সর্বাধিক ১৫ জন করে ৩০ জন মারা গেছে এই দুই বিভাগে। গত এক দিনে করোনায় মারা গেছেন ৫০ জন। গত এক দিনে নতুন আক্রান্তদের নিয়ে দেশে মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে ৮ লাখ ৩৩ হাজার ২৯১ জন হয়েছে। আর মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৩ হাজার ২২২ জন। বাংলাদেশে গত মার্চের শেষ থেকে সংক্রমণ ও মৃত্যুর গতি বেড়ে যায়।

কঠোর বিধি-নিষেধের মধ্যে মে মাসে তা কিছুটা কমলেও সীমান্ত অঞ্চলে করোনা ভাইরাসের ডেলটা ধরনের সংক্রমণ ঘটার পরিপ্রেক্ষিতে রোগীর সংখ্যা আবার বাড়ছে। ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার ১৪ দশমিক ২৭ শতাংশ, এ পর্যন্ত মোট শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ৪০ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৯২ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম বলেন, ঈদের এক/দুই সপ্তাহ পরে সংক্রমণ বাড়বে—এটা আমরা আগেই সতর্ক করেছিলাম। এখন সব জায়গায় বাড়ছে। আরো বাড়বে। টিকার সংকট আছে। টিকার বিকল্প হিসেবে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকায় সবার দায়িত্বশীল পরিচয় দিতে হবে।

রামেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটে আরও ১৩ জনের মৃত্যু

বাংলাদেশ সোসাইটি অব এনেসথেসিওলজিস্টের সভাপতি অধ্যাপক ডা. দেবব্রত বণিক বলেন, দেশের উত্তরাঞ্চলে করোনার যে পরিস্থিতি তা সামাল দেওয়ার জন্য অক্সিজেন ও হাইফ্লো নেজাল ক্যানেলা পাঠানো হয়েছে। কিন্তু উত্তরাঞ্চলের হাসপাতালে জনবল সংকট রয়েছে। আইসিইউ সাপোর্টও সীমিত। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্রুত ৪৭০ এনেসথেসিওলজিস্ট নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এটা তিন দিনে বাস্তবায়ন হওয়ার কথা। কিন্তু দেড় মাসেও বাস্তবায়ন হয়নি। এই ব্যবস্থাপনা মানুষের উপকারের জন্য, নাকি ক্ষতি করার জন্য? ইমার্জেন্সি সার্ভিসের কাজ দ্রুত করতে হবে। আর ইচ্ছা থাকলেও দ্রুত নিয়োগ দেওয়ার সম্ভব।

মুগদা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, করোনা সংক্রমণ চারদিকে বাড়ছে। সংক্রমণ ঠেকাতে টিকার কোনো বিকল্প নেই। লকডাউন ও মাস্ক পরিয়ে মানুষকে কতদিন রাখা যায়? জরুরি ভিত্তিতে টিকা ম্যানেজ করতে হবে।

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x