বহুরূপী বন্যা

বহুরূপী বন্যা
ফাইল ছবি

বর্ষা আসে, সঙ্গে আসে বন্যা। দুর্ভোগের আশঙ্কায় বুক কাঁপে মানুষের। প্রতিবছরের মতো এ বছরও ধেয়ে এসেছে বন্যা। ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে ফসলের খেত, খামার। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল, বৃষ্টির পানির তোড়ে ডুবে গেছে শহর, গ্রাম। বাংলাদেশের মানুষের এ যেন এক চিরদিনের ললাটলিখন। এর থেকে যেন নিস্তার নেই।

বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে কন্ট্রোল রুম চালু

প্রায় প্রতি বছর আষাঢ় মাসেই দেশে বন্যার প্রাদুর্ভাব শুরু হয়ে যায়। প্রথমেই বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চল ডুবে যেতে দেখা যায়। সেই পানি যেখান দিয়েই নেমে যায় সেখানেই তীব্র ভাঙন আর প্লাবন দেখা যায়। এরপর দেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বন্যা দেখা যায়। সেই পানি যতই দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয় সেসব এলাকা ভাসিয়ে নিয়ে যায়। শুধু বর্ষাকালেই নয়, আশ্বিন-কার্তিকেও বন্যা হয় এদেশে। ২০১৯ সালে তো ৬০ বছরের রেকর্ড ভেঙে অক্টোবরেও বন্যা হয়েছিল।

পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষায় ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশে বন্যা হয়। কারণ, নদীবাহিত পলি জমে জমেই এই বদ্বীপের জন্ম। বাংলাদেশের জন্ম। বন্যায় এই পলি সমতলে ছড়িয়ে মাটির উর্বরতা বাড়ায়। তাই, বাংলাদেশের জন্য বন্যা একই সঙ্গে অভিশাপ ও আশীর্বাদ। তবে এটা ঠিক, মানুষের পরিবেশবিধ্বংসী নানামুখী কার্যক্রমের কারণে বন্যার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও ক্রমশ বাড়ছে।

এ প্রসঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভুঁইয়া ইত্তেফাককে বলেন, বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশে বন্যা হবে, এটা স্বাভাবিক। তবে, কখনো কখনো সেই বন্যা অস্বাভাবিক আচরণ করে। এ বছর এখন পর্যন্ত বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। তবে গত বছর বন্যা স্বাভাবিকের চাইতে কিছুটা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছিল। ১৯৯৮ সালের বন্যার পর ২০২০ সালের বন্যাই দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছিল। ১৯৮৭ ও ৮৮ সালেও বড় বন্যা হয়েছিল।

আরিফুজ্জামান ভুইয়া আরো বলেন, এ বছর মৌসুমি বায়ুর কারণে যে বৃষ্টিপাত হয় সেটা সারা দেশেই বিরাজমান। ফলে মেঘনা অববাহিকা থেকে উত্তরাঞ্চল সবখানেই বৃষ্টি হচ্ছে। তবে, বন্যার আশঙ্কা এখনই পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি সমতল কমছে। গঙ্গা নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে পদ্মা নদীর পানি সমতল এখন পর্যন্ত স্থিতিশীল রয়েছে। অন্যদিকে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মেঘনা অববাহিকায় কুশিয়ারা ছাড়া সব নদীর পানিই কমছে।

উজানের ঢলে ২৩ জেলায় বন্যার পদধ্বনি

প্রকৃতিগতভাবেই বাংলাদেশ ভাটির দেশ। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া পানির উত্পত্তিস্থল হচ্ছে ভারত, নেপাল ও চীন। এসব দেশ থেকে প্রবাহিত পানি বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে গিয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়ে। উজানের দেশগুলো থেকে বয়ে আসা পানির প্রধান নির্গমন পথ হচ্ছে জিএমবি বেসিনস। অর্থাত্ গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকা। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর বার্ষিক সম্মিলিত বন্যার প্রবাহ একটিই নির্গমন পথ অর্থাত্ লোয়ার মেঘনা দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়ে। এ কারণে লোয়ার মেঘনার ঢাল ও নিষ্ক্রমণক্ষমতা কমতে থাকে। নদীর পানির স্তরের এই উচ্চতার প্রতিকূল প্রভাব সারা দেশেই পড়ে। কারণ বন্যার পানি নিষ্ক্রমণের অবস্থা ও ক্ষমতা দুটোই এর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এতে ছোট ছোট নদীর প্রবাহ কমে যায়।

প্রতি বছর বাংলাদেশের প্রায় ২৬ হাজার বর্গকিমি অঞ্চল অর্থাত্ ১৮ শতাংশ ভূখণ্ড বন্যাকবলিত হয়। ব্যাপকভাবে বন্যা হলে সমগ্র দেশের ৫৫ শতাংশের বেশি ভূখণ্ড বন্যার প্রকোপে পড়ে। প্রতি বছর গড়ে বাংলাদেশে তিনটি প্রধান নদীপথে মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আর্দ্র মৌসুমে ৮ লাখ ৪৪ হাজার মিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি প্রবাহিত হয়। বার্ষিক মোট প্রবাহের এটি ৯৫ শতাংশ। তুলনায় একই সময় দেশের অভ্যন্তরে ১ লাখ ৮৭ হাজার মিলিয়ন কিউবিক মিটার নদীপ্রবাহ সৃষ্টি হয় বৃষ্টিজনিত কারণে।

বন্যাকে সঙ্গী করেই চলছে বাংলাদেশ

বাংলাদেশে বন্যার সংজ্ঞা স্বতন্ত্র। বর্ষাকালে যখন নদী, খাল, বিল, হাওর ও নিচু এলাকা ছড়িয়ে সমস্ত জনপদ পানিতে ভেসে যায় এবং ফসল, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, সম্পত্তির ক্ষতি করে, তখন তাকে বন্যা বলে।

বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বন্যার সঙ্গে ফসলের একটা সম্পর্ক রয়েছে। দেশের উত্তর পশ্চিম অঞ্চলে একটি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদের ডান দিকের প্লাবনভূমিগুলোকে রক্ষা করছে। উত্তর পূর্বাঞ্চলের প্লাবনভূমিসমূহকে তিনটি অঞ্চলে ভাগ করা যায়। ব্রহ্মপুত্র ও পদ্মার বাম প্লাবনভূমি; মধুপুর গড় দ্বারা ব্রহ্মপুত্র নদী থেকে বিচ্ছিন্ন পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদী উপত্যকা ও মেঘনা নদী অববাহিকা। মেঘনা অববাহিকা মহা-সিলেট-অবনমন (Great Sylhet Depression) দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত যেখানে সুরমা ও কুশিয়ারা নদী মিলিত হয়ে মেঘনা নাম নিয়েছে। মেঘনা নদীর পানির উচ্চমাত্রা বন্যার মৌসুমে ভাটিতে পদ্মানদীর পানির মাত্রা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। বর্ষাকালের শুরুতেই মেঘনা নদী দ্রুত বন্যার পানিতে ভরে ওঠে এবং বর্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা পানিতে টইটম্বু্বর থাকে। সরাসরি সাগরে পানি চালান দিয়ে থাকে বলে এই অববাহিকায় পানি নিষ্ক্রমণের হার কম।

১৪ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতির আশঙ্কা

বাংলাদেশে চার রকমের বন্যা হয়। মৌসুমি বৃষ্টির কারণে, বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি উপচে উঠে প্লাবন, উজান দেশ থেকে ঢলের পানি ও জলোচ্ছ্বাস। এখন ভাটির দেশ হওয়ার কারণে বাংলাদেশে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পলি জমে নদীতল উঁচু হওয়া, উন্নয়ন প্রকল্প ও সড়ক-সেতু ইত্যাদির কারণে পানি নিষ্কাশন পথগুলো সংকুচিত হওয়া এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের ব্যর্থতা। দেশে বন্যা নিয়ন্ত্রণে নির্মিত হয়েছে অসংখ্য বাঁধ। এসবে বন্যা না কমে বরং বেড়েছে। এ খাতে ব্যয় হওয়া বিপুল পরিমাণ ঋণের টাকা প্রতিবছরের বানের জলে ভেসে গেছে বললে খুব একটা ভুল বলা হয় না। এই বন্যার প্রকোপ কমিয়ে যদি এই পানির প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় তবে তা করতে হবে উজানে।

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x