সাত জেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি

নামছে পানি, বাড়ছে ভাঙন

নামছে পানি, বাড়ছে ভাঙন
ছবি: সংগৃহীত

একমাত্র পদ্মা ছাড়া দেশের প্রধান নদ-নদীর পানি নামতে শুরু করেছে। কমছে পানির স্ফীতি। গতকাল নতুন করে আর কোনো জেলা প্লাবিত হয়নি। পানি কমতে থাকায় দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে উন্নতি হচ্ছে বন্যা পরিস্থিতির।

তবে বাড়িঘর থেকে বন্যার পানি না নামায় দুর্ভোগে রয়েছেন বন্যা কবলিতরা। খাবার সংকটের পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির অভাব প্রকট হয়েছে। নামতে থাকা পানির টানে নদী তীরবর্তী এলাকায় বেড়েছে ভাঙন। অনেক জায়গায় মানুষের বাড়ি-ঘর, স্কুল-কলেজ, জমি-জিরাত, স্থাপনা-সব নদী গর্ভে বিলিন হচ্ছে। বন্যা কবলিত জেলার মধ্যে সিরাজগঞ্জ, পাবনা, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ি, ফরিদপুর, মুন্সীগঞ্জ ও শরীয়তপুর জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

১৩ জেলায় বন্যার আরও অবনতি

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আতিকুল হক জানিয়েছেন, দেশের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। স্বল্পমেয়াদী এ বন্যা মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য পেতে সময় লাগবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী চলমান বন্যায় কয়েক লাখ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভাঙনে বিলীন হয়েছে বহু বসতভিটা, ফসলি জমি ও রাস্তাঘাট। গতকাল মঙ্গলবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভুইয়া জানান, ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপত্সীমার নিচে নেমে এসেছে। কমছে যমুনার পানিও। দেশের প্রধান প্রধান নদ-নদীতে পানি কমার প্রবণতা আগামীকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অব্যবাহত থাকবে। ফলে আজ বুধবারের মধ্যে সিরাজগঞ্জ, পাবনা, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, মুন্সীগঞ্জ এবং শরীয়তপুরের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত থাকবে। তবে তিস্তার পানি ফের বাড়ছে। এ নদীর পানি ডালিয়া পয়েন্টে আজ বুধবারের মধ্যে বিপত্সীমার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।

মো. আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া আরো জানান, বর্তমানে ১০টি নদ-নদীর পানি ১৬টি জায়গায় বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যমুনার পানি কাজীপুরে বিপত্সীমার ১১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, সিরাজগঞ্জে ৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, মথুরায় ১২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে ও আরিচায় ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আত্রাইয়ের পানি বাঘাবাড়ীতে বিপত্সীমার ৪৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, ধলেশ্বরীর পানি এলাসিনে ৫৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, লক্ষ্যার পানি নারায়ণগঞ্জে ৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, তুরাগের পানি কালিয়াকৈরে ২১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, কালিগঙ্গার পানি তারাঘাটে ৩২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে ও ধলেশ্বরীর পানি জাগিরে ২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।এছাড়া পদ্মার পানি গোয়ালন্দে বিপত্সীমার ৬১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, ভাগ্যকূলে ২৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, মাওয়ায় ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে ও সুরেশ্বরে ৬৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গড়াই নদীর পানি কামারখালীতে প্রবাহিত হচ্ছে ১০ বিপত্সীমার সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এবং মেঘনার পানি চাঁদপুরে প্রবাহিত হচ্ছে বিপত্সীমার ৩৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে।

১৩ জেলায় বন্যার আরও অবনতি

এদিকে, সাগরে লঘুচাপের প্রভাবে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়ছে। মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণ হচ্ছে দেশের অভ্যন্তরে। বৃষ্টিপাত বেড়েছে দেশের সীমান্তবর্তী ভারতীয় অঞ্চলগুলোতেও। ফলে পাহাড়ি ঢলে ফের পানি বেড়ে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। পাহাড়ি ঢলে ফেনীর মুহুরী ও কহুয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৩টি স্থানের ভাঙন অংশ দিয়ে গতকালও পানি প্রবেশ করায় সেখানে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। এতে ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলার ৭টি গ্রাম পানিতে তলিয়ে আছে। গাজীপুরে তুরাগ ও বংশী নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় কালিয়াকৈর উপজেলার অনেক এলাকায় ফসলি জমি, পাকা ও কাঁচা রাস্তা ডুবে গেছে। ফরিদপুরে পদ্মার নদীর পানি এখনো বিপত্সীমার ওপরে বইছে। বাড়িঘরে পানিতে তলিয়ে থাকায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে চর দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন বানভাসিরা। বাড়ছে পানিবাহিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা।

শরীয়তপুরের নড়িয়া ও জাজিরার নদীতীরবর্তী এলাকা থেকে বন্যার পানি না নামায় গৃহপালিত পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন অনেক পরিবার। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে পানিবন্দি মানুষের দিন কাটছে সীমাহীন দুর্ভোগে। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে মানিকগঞ্জে পদ্মা তীরবর্তী হরিরামপুর উপজেলার তিনটি ইউনিয়নে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে বিলীন হয়ে গেছে শতাধিক ঘরবাড়ি। কুড়িগ্রামে ঘরবাড়ি থেকে বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও কর্মহীন থাকায় খাদ্য সংকটে পড়েছেন বানভাসিরা। চরাঞ্চলের চারণভূমি নষ্ট হওয়ায় দেখা দিয়েছে গো-খাদ্যের সংকট। যমুনার পানি কমলেও সিরাজগঞ্জে এখনো তলিয়ে আছে হাজার হাজার বসতভিটা। বাঁধে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষজন। দেখা দিয়েছে পানিবাহিত রোগ। টাঙ্গাইলের সাতটি উপজেলার প্রায় দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। যমুনা ও ধলেশ্বরীর তীরবর্তী এলাকায় আবারো দেখা দিয়েছে ভাঙন। সরকারের পক্ষ থেকে ত্রাণ দেয়া হলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ অধিকাংশ বানভাসীদের। গাইবান্ধার সদর, সাঘাটা, সুন্দরগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও ফুলছড়ি উপজেলায় শুরু হয়েছে নদী ভাঙন।

বন্যাকবলিত ৫ শতাধিক স্কুল ১২ সেপ্টেম্বর খুলবে না :মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের সুত্র মতে চলমান বন্যায় দেশের ১০ জেলায় পাঁচ শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান থেকে পানি নেমে গেলেও সেগুলো এখনো পাঠদানের উপযোগী হয়নি। তা ছাড়া বেশ কয়েকটি বিদ্যালয় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর স্কুল-কলেজগুলো ১২ সেপ্টেম্বর খোলার প্রস্তুতি চলছে। তবে বন্যা কবলিত এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলছে না বলে জানা গেছে। জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক বলেন, যেসব বিদ্যালয় বন্যাকবলিত সেসব বিদ্যালয় খুলে দিয়ে শ্রেণি পাঠদান করার প্রয়োজন নেই। তারা পরে শ্রেণি পাঠদান শুরু করবে। অনেক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সে বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, বন্যাকবলিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হবে। ওই নির্দেশনা অনুযায়ী, তারা সরাসরি বিদ্যালয়ে ক্লাস পরিচালনা করবেন না। তবে অনলাইনে ক্লাস পরিচালনা করতে হবে।

ইত্তেফাক/আরকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x