পরিসংখ্যান ব্যুরোর দারিদ্র্যের মানচিত্রের তথ্য

উপজেলা পর্যায়ে বৈষম্য সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রাম বিভাগে

কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুরের ৮০ শতাংশ মানুষই দরিদ্র
উপজেলা পর্যায়ে বৈষম্য সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রাম বিভাগে
ছবি: সংগৃহীত

দেশে দরিদ্রপ্রবণ অঞ্চলগুলোর মধ্যে তুলনামূলক বেশি দরিদ্র মানুষের হার কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুরে। এই উপজেলায় ৭৯ দশমিক ৮ ভাগ মানুষ দরিদ্রসীমার নিচে বাস করছে। এর পরেই সবচেয়ে বেশি ৭৭ দশমিক ৮ শতাংশ দরিদ্র মানুষ রয়েছে বান্দরবানের থানচিতে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দারিদ্র্যের মানচিত্রে এই তথ্য উঠে এসেছে। উপজেলা ভিত্তিক দারিদ্র্যের হার বিশ্লেষণ করে এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দারিদ্র্য হার গ্রুপে অবস্থানকারী উপজেলার সংখ্যায় বৈষম্য সবচেয়ে বেশি দেখা যায় চট্টগ্রাম বিভাগে। এই বিভাগে যেমন অতি নিম্ন দারিদ্র্য হারের উপজেলা রয়েছে তেমনি অতি উচ্চ দরিদ্রপ্রবণ অঞ্চলও রয়েছে।

বিশেষকরে পাহাড়ি অঞ্চলে দরিদ্র হার অনেক বেশি হওয়ায় আঞ্চলিক বৈষম্যও বেশি চট্টগ্রাম বিভাগে। তবে বিভাগ ভিত্তিক সবচেয়ে বেশি দরিদ্র মানুষের বাস রংপুরে। এই বিভাগের ৪৭ ভাগ মানুষ দরিদ্র এবং বিভাগের অর্ধেকের বেশি অঞ্চলের মানুষ উচ্চ দরিদ্র রেখায় অবস্থান করছে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) সহায়তা বাংলাদেশের দারিদ্র্য মানচিত্র ২০১৬ তৈরি করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। এর ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা সেন্সাস উইং এর উপ-পরিচালক মো. আলমগীর হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, দেশে সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত হয়। এর চূড়ান্ত ফলাফল ২০১৯ সালে প্রকাশ করা হয়।

এর পর দারিদ্র্যের মানচিত্র প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২০ সালের শেষে দারিদ্র্যের মানচিত্র তৈরি হলেও দেশে করোনার পরিস্থিতির কারণে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি এই রিপোর্ট চূড়ান্ত করা হয়েছে। শিঘ্রই আনুষ্ঠানিভাবে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে বলে জানান তিনি।

উল্লেখ্য, বিবিএস ২০১০ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, তখন দেশের সার্বিক দারিদ্র্যের হার ছিল সাড়ে ৩১ শতাংশ। ২০১৬ সালের জরিপে তা কমে আসে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশে। সর্বশেষ ২০১৯ সালের বিবিএস এর ধারণাগত জরিপের তথ্যানুযায়ী দেশের দারিদ্র্যের হার ২০ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা করোনার প্রভাবে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করলেও সরকারিভাবে কোনো জরিপের তথ্য আর প্রকাশ করা হয়নি।

দেশের সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য দিয়ে জেলা ভিত্তিক দারিদ্র্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হলেও এবার দারিদ্র্যের মানচিত্রে উপজেলা, থানা ভিত্তিক দারিদ্র্যের তথ্য উঠে এসেছে। দেশের আঞ্চলিক বৈষম্য কোথায় কতটা প্রকট সে চিত্র উঠে এসেছে।

দারিদ্র্যের মানচিত্রে গ্রুপ ভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এতে ১২ শতাংশের নিচে হলে অতি নিম্ন দারিদ্র্য হার, ১২ থেকে ২০ শতাংশ হলে নিম্ন দারিদ্র্য, ২০ থেকে ২৯ দশমিক ৩৬ হলে মধ্য দারিদ্র্য, এর ওপরে ৩৯ দশমিক ৬৬ পর্যন্ত উচ্চ দারিদ্র্য অঞ্চল এবং ৩৯ দশমিক ৬৬ শতাংশে ওপরে অবস্থান করছে এমন অঞ্চলকে অতি উচ্চ দারিদ্র্র অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এতে দেখা যায়, অতি নিম্ন দারিদ্র্য হার গ্রুপে বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগের কোনো উপজেলা নেই। রংপুর বিভাগে অতি নিম্ন দারিদ্র্য হার গ্রুপে অবস্থানকারী উপজেলা শুধু একটি। অন্যদিকে সিলেট বিভাগে অতি উচ্চ দারিদ্র্য হার গ্রুপে অবস্থানকারী উপজেলা রয়েছে মাত্র একটি। যদিও ঢাকা বিভাগে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ৭৭টি উপজেলা/মেট্রো থানা রয়েছে অতি নিম্ন দারিদ্র্য হার গ্রুপে। একই সঙ্গে ঢাকা বিভাগে ১২টি উপজেলা রয়েছে অতি উচ্চ দারিদ্র্য হার গ্রুপে।

একটি দেশের অভ্যন্তরে স্থানিক বিন্যাসের ভিত্তিতে দারিদ্র্য ও বৈষম্যের বিশদ অবস্থা প্রাক্কলনের পদ্ধতিকে দারিদ্র্য মানচিত্র বলে। এতে উপজেলার মতো ছোট ছোট নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকাসমূহের কল্যাণ সূচকসমূহ প্রাক্কলনের লক্ষ্যে খানার আয়-ব্যয় জরিপ হতে ব্যক্তি ও খানার উপাত্ত এবং আদমশুমারি ও গৃহগণনার উপাত্ত একত্রিত করে ফলাফল প্রাক্কলন করা হয়ে থাকে। বিবিএস সূত্রে জানা যায়, স্মল এরিয়া এস্টিমেশন পদ্ধতিতে দারিদ্র্য হার প্রাক্কলনের জন্য এলবার্স, লেনজু অ্যান্ড লেনজু (ইএলএল) পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।

তবে এ প্রতিবেদনের কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। দারিদ্র্য মানচিত্রে খানার আয়-ব্যয় জরিপ ২০১৬ এবং আদমশুমারি ২০১১-এর ইউনিট পর্যায়ের উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছে। শুমারি ও জরিপের সময়ের ব্যবধান ছিলো পাঁচ বছর। ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বাংলাদেশে যথেষ্ট অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটেছে। সেই সঙ্গে ভোগের ধরনও পরিবর্তন হয়েছে। পরিবারের আকার ছোট হয়ে এসেছে। খাদ্য বহির্ভূত ব্যয় খাদ্য ব্যয়কে ছাড়িয়ে গেছে। তাছাড়া পূর্বের তুলনায় বৈষম্য বেড়েছে।

বিভাগ ভিত্তিক দারিদ্র্যপ্রবণ উপজেলা ও থানা বিশ্লেষণ করে দেখা ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে কম দরিদ্র গুলশান থানায় (০.৪ শতাংশ), সবচেয়ে বেশি দরিদ্র কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে (৬১.২ শতাংশ)। বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে কম ভোলার দৌলতখানে (১২.২ শতাংশ), সবচেয়ে বেশি পটুয়াখালীর দশমিনায় (৫২.৮ শতাংশ)। চট্টগ্রাম বিভাগে সবচেয়ে কম চট্টগ্রাম বন্দর থানায় (১.৫ শতাংশ), সবচেয়ে বেশি বান্দরবানের থানচিতে (৭৭.৮ শতাংশ)। খুলনা বিভাগে সবচেয়ে কম চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় (৭.৯ শতাংশ) এবং সবচেয়ে বেশি মাগুরার মোহাম্মদপুরে (৬২.৪ শতাংশ)।

ময়মনসিংহ বিভাগে সবচেয়ে কম দরিদ্র ভালুকায় (১৫.৫ শতাংশ) সবচেয়ে বেশি জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে (৬৩.২ শতাংশ)। রাজশাহী বিভাগে সবচেয়ে কম দরিদ্র বোয়ালিয়া থানায় (৯.০ শতাংশ) এবং সবচেয়ে বেশি নওগাঁর পোরশাতে (৪৮.৭ শতাংশ)। রংপুর বিভাগে সবচেয়ে কম দরিদ্র পঞ্চগড়ের অটোয়ারীতে (৯.৩ শতাংশ) সবচেয়ে বেশি কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুরে (৭৯.৮ শতাংশ)। সিলেট বিভাগের সবচেয়ে কম দরিদ্র বিশ্বনাথে (১০.৪ শতাংশ) সবচেয়ে বেশি দরিদ্র মানুষের অবস্থান সুনামগঞ্জের শাল্লায় (৬০.৯ শতাংশ)।

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x