ঢাকা সোমবার, ২৭ মে ২০১৯, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬
৩২ °সে


আনুষ্ঠানিকতা বাড়লেও কমেছে আন্তরিকতার ছোঁয়া

বদলে গেছে বিয়ের রীতি

বদলে গেছে বিয়ের রীতি
ফাইল ছবি

যার বিয়ে তার ধুম নাই, পাড়া-পড়শির ঘুম নাই— প্রবাদটা কিন্তু এমনি এমনি হয়নি। সত্যিই এমন একটা সময় ছিল, বাংলার গ্রামে গ্রামে কোন বাড়িতে বিয়ে লাগলে পাড়া-পড়শির ঘুম থাকত না। বিয়ের আনন্দ-আয়োজনে অংশীদার হতো পুরো গ্রামের বাসিন্দারা। আবার এমনও দেখা যেত কোন বাড়িতে বিয়ে বা বিয়ের খরচ বাঁচানোর জন্য পাড়ার সব বাড়ি থেকে একজন করে আসার কথা বলা হতো। কিন্তু মেয়েদের মধ্যে দাওয়াতের বালাই ছিল না। কনের কাছে মেয়েরা আসত দল বেঁধে। কনেকে সাজিয়েগুছিয়ে তৈরি করতেন তারা। আর বাড়ির ছেলেমেয়েরা লাল-সবুজ-হলুদ রঙিন কাগজের পতাকা কেটে গেট সাজাত। চিকন দড়ির গায়ে সেসব রঙিন কাগজ তিন কোনা করে কেটে পুরো বাড়ি ঘিরে দিয়ে তারা জানান দিত, এখানে আনন্দযজ্ঞ চলছে। বাড়ির সামনে কলাগাছ দিয়ে বানানো হতো বিয়ের গেইট। গায়ে হলুদের সময় মেয়ের গায়ে হলুদ লাগিয়ে পাড়ার সব মেয়েদের উঠোনে পানি ঢেলে গড়াগড়ি খাওয়ার সেসব রঙিন দিন কোথায় হারাল! একটা সময় বাড়ির ছেলে ও তাদের বন্ধুরাই খাবার পরিবেশনের ‘সাকিদারি’ করতেন। এখন সেসব নেই। কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের খাবারের চল হয়েছে এখন। এখন ‘ইন্সট্যান্ট’ এর যুগ। তা কফি বানানোই হোক কিংবা বিয়ে।

মুসলমানদের ‘কবুল’ বলা কিংবা হিন্দু সম্প্রদায়ের ছাদনা তলায় সাত পাকে বাঁধা পরার মুহূর্তের জন্য কত না প্রস্তুতি। কত না স্বপ্ন জড়িয়ে থাকে। সেই দুটি ছেলেমেয়ের সারা জীবন একসঙ্গে চলার এই স্বপ্নময় মুহূর্তকে ঘিরে আচার অনুষ্ঠানের শেষ নেই। দীর্ঘ দিনের সেইসব আয়োজন এখন একবিংশ শতাব্দীর ‘কম্পিউটারাইজড জীবন’ এ এসে বদলে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে শত শত বছরের সব আচার, রীতি ও আয়োজন।

এই উপমহাদেশে দুটি ছেলে মেয়ের বিয়ের পাকা কথার সময় থেকেই শুরু হয়ে যায় আনন্দ আয়োজন। প্রথমে এনগেজমেন্ট, এরপর গায়ে হলুদ তারপর বিয়ে। সবশেষে বৌভাত দিয়ে শেষ হয় বিয়ের অনুষ্ঠান। এসবের ফাঁকে আরো কত শত আচার যে রয়েছে তার শেষ নেই। যেমন বর যখন আসে তখন গেট ধরার রেওয়াজ রয়েছে। রয়েছে বিয়ের পরে মুখ দেখানোর রেওয়াজ। এত দিনের আনন্দের পর মেয়েকে বিদায় দেওয়ার সময় মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজনের কান্না দুঃখের আবহ তৈরি করে। এই যাত্রা আনন্দের যাত্রা, একইসঙ্গে অপরিচিত পরিবেশে একটি মেয়ের অনিশ্চিত ভবিষ্যত্ যাত্রাও তো।

বদলে গেছে বিয়ের আয়োজনের ধরন

বদল এসেছে সবকিছুতেই। এলাকার ঘটকের পরিবর্তে ইন্টারনেটে ‘ম্যাট্রিমনিয়াল সাইট’ এ বিয়ের পাত্র-পাত্রী খোঁজা, টুপির বদলে বরের জন্য বাহারি পাগড়ি কেনা, কনের শাড়ির জন্য ডিজাইনারকে ডাকা- এসব কিছুরই বদল হয়েছে। বদলে গেছে বিয়ের প্যান্ডেল বানানোর প্রচলন। থানা শহর তো বটেই গ্রামে গ্রামেও ছড়িয়ে গেছে কমিউনিটি সেন্টার।

সাধারণ পরিবারগুলোতে বিয়ের আয়োজন এখন যৌথ উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। এর পেছনে মূল কারণটা কিন্তু টাকা। বিয়ের খরচ এতটাই বেড়ে গেছে যে, সাধারণ পরিবারগুলোতে সে খরচ একা মেটানো সম্ভব হয় না। সে জন্যই গায়ে হলুদ হয়; কিন্তু মেয়ের বাড়িতে গিয়ে বিয়ে আর ছেলের বাড়িতে বৌভাত আয়োজন এখন একটাই অনুষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। সকালে বিয়েটা পড়িয়ে দিয়ে রাতে কোনো কমিউনিটি সেন্টারে ‘গেট টুগেদার’। ছেলেমেয়ে দু’পক্ষের আত্মীয়-স্বজন আসে। দুপক্ষ বিলটা ভাগাভাগি করে নেয়। কারো উপরেই আর চাপ পড়ে না। এখন বেশিরভাগ পরিবারগুলোতে এভাবেই বিয়ের আয়োজনের চল।

যারা একেবারেই নিম্ন আয়ের মানুষ তাদের জীবনেও বিয়ে আসে রঙিন স্বপ্ন নিয়ে। সেই বিয়েতে এত আয়োজন থাকে না। থাকে না গায়ে হলুদ বিয়ে বৌভাতের আয়োজন। সবকিছুই কম খরচে সেরে ফেলা। কমিউনিটি সেন্টার দূর থাক, অল্প কজন নিয়ে গিয়ে বিয়ে সেরে বৌ নিয়ে বাসায় ফিরতে হয়। মেয়ের বাড়ি থেকে হাতে গোনা কজন মানুষই আসেন। পাড়া-প্রতিবেশি আত্মীয়-স্বজন ডেকে খাওয়ানোর ক্ষমতা থাকে না। কিন্তু ভালোবাসায় কমতি থাকে না। আয় যেমনই হোক বাঙালির সংসার সাজানোর প্রতি টান প্রচণ্ড। অর্থের ঘাটতি তাতে বাঁধ সাধে খুব কমই।

কথায় আছে ‘যত গুড় তত মিষ্টি’। বিয়ের আয়োজনেও তাই। যাদের সামর্থ্য রয়েছে তাদের বিয়ের আয়োজনটাও হয় বর্ণময়। ছেলে মেয়ের বিয়ের পাঞ্জাবি কেমন হবে, হলুদে মেয়ের সাজ, হলুদে আসা মেয়েদের অনুষ্ঠানের থিম রঙের সঙ্গে মিলিয়ে শাড়ি দেওয়ার চল হয়েছে এখন। হলুদের স্টেজ, হলুদে গানের রিহার্সাল তো শুরু হয়ে যায় এক মাস আগে থেকেই। গায়ে হলুদের পরে ডিজে পার্টির চল হয়েছে এখন। হলুদের পরেই আসে বিয়ে। ছেলের পাঞ্জাবি, শেরওয়ানির ডিজাইন, পাগড়ি আসবে কোথা থেকে রাজস্থান নাকি পাঞ্জাব থেকে এ নিয়েও চুলচেরা আলোচনা চলে। মেয়ের পোশাক কি হবে ল্যাহেঙ্গা নাকি শাড়ি। নাকি বিয়েতে শাড়ি আর বৌভাতে ল্যাহেঙ্গা পরবে—এ নিয়েও তর্ক কম হয় না। ম্যাচিং গয়না খোঁজা চলে আরো কিছুদিন। এসবের পাশাপাশি রয়েছে বিয়ের কার্ড। বিয়ের কার্ড যেন বর-কনের পরিবারের রুচির ছাপ নিয়ে আত্মীয়দের সামনে হাজির হয়। তাই কার্ডটি হওয়া চাই স্পেশাল। এরপর রয়েছে বিয়ের দিন খাবারের মেন্যু আর ছেলে পক্ষের বৌভাতের অনুষ্ঠানের খাবার নির্বাচন। এসব তো গেল কিন্তু বিয়ে তো হবে একদিন। কিন্তু সেই স্মৃতিকে ধরে রাখতে হবে জন্ম জন্মান্তরের জন্য। সেজন্য চাই বিয়ের এলবাম। ওয়েডিং ডায়েরি করবার জন্য এখন বিশেষ ফটোগ্রাফাররাও তৈরি হয়ে রয়েছে। শুধু আপনার ডাক দেবার অপেক্ষা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে বিয়ের আচার অনুষ্ঠানের ধরণ। প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। আধুনিকতার স্পর্শে বিয়ে হয়ে উঠেছে বর্ণিল। কিন্তু এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই, বিয়ে মানে আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশির যে আনন্দ আয়োজন- সেই আনন্দটা যেন অনেকটা ফিকে হয়ে গেছে। তার চাইতে আনুষ্ঠানিকতা যেন বড় উঠেছে।

বদলে গেছে বিয়ের খাবারের মেন্যু

বিয়ের খাবারের লোভ সামাল দেওয়া মুশকিল। দেখা গেল ডাক্তার তেল ঝালের খাবার খেতে নিষেধ করেছে তারপরও বয়স্ক মানুষ ‘এই একদিন খাই’ বলে বসে পড়েন খাবারের টেবিলে। আগের দিনে হিন্দু বিয়েবাড়িতে মেঝেতে বসিয়ে কলাপাতায় খেতে দেওয়া হত। একদিকে থাকত লবণ আর লেবু। কলাপাতার বাইরে পানির জন্য মাটির গ্লাস আর দই ও ক্ষীর দেওয়ার বাটি। ভোজনপর্ব শুরু হত গরম লুচি, বেগুন পটল ভাজা, এরপরে আসত কুমড়ার ছক্কা, শীতকালে বাধাকপির তরকারি, ডাল, ধোঁকা, আলুর দম, মাছের কালিয়া, চাটনি, পাঁপড় ভাজা, মিষ্টি। মিষ্টিও ছিল নানা রকমফের। অবস্থাপন্ন বাড়িতে যুক্ত হত পোলাও, মাংস। মেয়েদের খাওয়ানো হত আলাদা স্থানে। সেখানে পরিবেশনও করত মেয়েরা। আর এ সময় বাড়ির কর্তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতেন সবার পাতে খাবার ঠিকমত পড়েছে কিনা। সবাই খেয়ে শান্তি পেয়েছেন কি না। আর মুসলমানদের বিয়েতে পোলাও, মাংসর চল। সঙ্গে সবজি, মিষ্টি দই। আর এখন কাচ্চি বিরিয়ানির ‘জমানা’ চলছে। সঙ্গে রোস্ট, টিকিয়া কাবাব, বোরহানি এবং দই ও মিষ্টি।

বিয়ে: সামাজিক বন্ধন

বিয়ে সমাজের প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান। এ প্রথাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে প্রধানত ধর্ম। বিয়ে নিয়ে জারি করা হয়েছে রীতিনীতি ও ধর্মীয় অনুশাসন। বৈদিক যুগ থেকেই বিয়ে নারী-জীবনের প্রধান প্রাপ্তি ও পরম সার্থকতা বলে বিবেচিত। ইসলাম ধর্মে বিবাহ একটি আইনগত, সামাজিক এবং ধর্মীয় বিধান। ইসলামে বিবাহ বলতে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে সামাজিকভাবে স্বীকৃত ও ধর্মীয়ভাবে নির্ধারিত একটি চুক্তি বোঝায়।

ইত্তেফাক/আরকেজি

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২৭ মে, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন