ঢাকা বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ১১ বৈশাখ ১৪২৬
২৭ °সে

সুষ্ঠু নির্বাচনে বড় বাধা প্রশাসন

সুষ্ঠু নির্বাচনে বড় বাধা প্রশাসন
ফাইল ছবি

অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে প্রশাসনই এখন সবচেয়ে বড় বাধা। এমনটিই মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষক, নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, পরিস্থিতি এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে- ক্ষমতাসীনেরা ও নির্বাচন কমিশন (ইসি) সুষ্ঠু নির্বাচন চাইলেও প্রশাসন নিরপেক্ষ না হওয়ায় সেটি সম্ভব হচ্ছে না। কারণ ভোটকেন্দ্রের সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষা ও অবাধ ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ প্রশাসনের। প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকলে ভোটকেন্দ্র দখল, জালভোট প্রদান, আগের রাতে ব্যালটে সিল মারা, কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্টকে কেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়া ও কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার মত ঘটনা ঘটতো না। প্রশাসন নিরপেক্ষ নয় বলেই সুষ্ঠু ভোট না হওয়ার শঙ্কা থেকে ভোটাররা কেন্দ্রবিমুখ হয়ে পড়ছেন। যার কারণে পুরো নির্বাচনব্যবস্থাই প্রশ্নবিব্ধ হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এব্যাপারে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ গতকাল বৃহস্পতিবার ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘এই পরিস্থিতির কেউ তো কোনো দায় নিচ্ছে না। এখন যেটা হচ্ছে, বিশেষ করে চলমান উপজেলা নির্বাচনের কথা যদি বলি এটা কোনো ভোট না। মূল দুই প্রার্থীর প্রধান কাজই যেন পুলিশকে কে কার পক্ষে নিতে পারবেন-সেই প্রতিযোগিতা করা। প্রশাসনকে যে যেভাবে ম্যানেজ করতে পারছে ফল সেদিকেই যাচ্ছে। এখন আমাদের চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছু করার নেই। ভোটের কোনো নিয়ম-কানুন বলতে কিছু আছে বলে আর মনে হয় না। এনিয়ে কারও মাথাব্যথা আছে বলেও মনে হচ্ছে না। যেতে-যেতে অধপতনের কোন পর্যায়ে যেতে পারে সেটাই এখন দেখার বিষয়।’

দেশের পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন চলছে। দ্বিতীয় ধাপে সোমবার ১১৬টি উপজেলায় ভোট হয়েছে। প্রথম ধাপের মতো দ্বিতীয় ধাপেও ভোট কেন্দ্রে বল প্রয়োগ, ভোটকেন্দ্র দখল, জালভোট, কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া, আগের রাতে ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভর্তি, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্টকে কেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়া ও কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়াসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ করেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের কেউ কেউ। এমন অভিযোগে বিভিন্ন উপজেলায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীসহ অনেকে ভোট বর্জনও করেছেন।

প্রশাসন নিরপেক্ষ আচরণ না করায় ভোট সুষ্ঠু না হওয়ার শঙ্কা থেকে দ্বিতীয় ধাপের উপজেলা নির্বাচনেও ভোটাররা ছিলেন কেন্দ্রবিমুখ। বিভিন্ন উপজেলায় কোনো কোনো কেন্দ্রে দিনের প্রথমার্ধ্ব ছিল প্রায় ভোটারশূন্য। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় সূত্রের তথ্যমতে, দ্বিতীয় ধাপের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোটের হার প্রথম ধাপের চাইতে আরও কমেছে। প্রথম ধাপে ভোট পড়েছিল ৪৩ দশমিক ৩২ শতাংশ। আর দ্বিতীয় ধাপে ভোট পড়েছে ৪১ দশমিক ২৫ শতাংশ। ভোটের এই হার শুধু চেয়ারম্যান পদের বিপরীতে পড়া ভোটের হিসাব ধরে করা হয়েছে। অথচ এর আগে চতুর্থ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রথম পর্বে ৬২ দশমিক ৪৪ শতাংশ, দ্বিতীয় ধাপে ৬৩ দশমিক ৩১ শতাংশ, তৃতীয় পর্বে ৬৩ দশমিক ৫২ শতাংশ, চতুর্থ পর্বে ৫৬ দশমিক ১২ শতাংশ, পঞ্চম ধাপে ৬০ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং ষষ্ঠ ধাপে ৫৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ ভোট পড়েছিল।

এবার কুমিল্লার আট উপজেলায় নির্বাচন হবে চতুর্থ ধাপে আগামী ৩১ মার্চ। শনিবার কুমিল্লার আটটি উপজেলা পরিষদের প্রার্থীদের নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। সভায় কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক ও বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুস সালাম অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী নির্বাচনে বিশেষ বাহিনী দিয়ে এলাকায় ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করছেন, প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেও কোনো কাজ হচ্ছে না।। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও একটি উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে বিদ্রোহী প্রার্থী তাজুল ইসলাম বলেন, এক সপ্তাহ আগে থেকেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী পোস্টার লাগিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। লুটেরচর ইউনিয়নে তিনি পোস্টার লাগাতে দিচ্ছেন না। এই নির্বাচনে রাতের অন্ধকারে ব্যালটে সিল মারা হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, বারবার অভিযোগ করলেও প্রশাসন কোনো সহযোগিতা করছে না।

সোমবার অনুষ্ঠিত মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী, বর্তমান চেয়ারম্যান আছকির খান ভোট বর্জন করেন। তার পক্ষে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মিলন বখত দুপুরের দিকে রিটার্নিং অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগে বলেছেন, ‘বিভিন্ন কেন্দ্রে বল প্রয়োগ করা হয়েছে, জালভোট দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন নিরব ভূমিকা পালন করেছে।’ কুমিল্লার আবদুস সালাম ও তাজুল ইসলাম কিংবা মৌলভীবাজারের আছকির খানের মতো এখন পর্যন্ত দুই ধাপে সম্পন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অনেক স্থানেই প্রতিদ্বন্দ্বীদের কেউ কেউ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। নানা অনিয়মের বিষয়ে মৌখিক বা লিখিত অভিযোগ করার পরেও প্রশাসনের অসহযোগিতার বিষয়টি সামনে তুলে এনেছেন তারা।

আরো পড়ুন: ‘পথচারী নিয়ম মানলেও জীবন যায় চালকের হাতে জেব্রা ক্রসিংয়ে’

উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী কয়েকজন প্রার্থী জানান- সাংগঠনিক বিশেষ করে আর্থিকভাবে প্রভাবশালী প্রার্থীরা ভোটের আগেই প্রশাসনকে ম্যানেজ করে কেন্দ্র দখল, জালভোট প্রদান, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্টদের ঢুকতে না দেওয়া ও বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটিয়েছেন। তাদের দাবি, ক্ষমতাসীনদের কিংবা নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে এরকম কোনো নির্দেশনা না থাকলেও স্থানীয় প্রশাসন পছন্দের প্রার্থীর পক্ষ নিয়েছেন, নিচ্ছেন। প্রশাসনের সহযোগিতায় অনিয়মের ঘটনা ঘটলেও দিনশেষে এর দায় বর্তাচ্ছে ক্ষমতাসীনদের ওপর।

ইত্তেফাক/আরকেজি

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২৪ এপ্রিল, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন