ঢাকা সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯, ৫ কার্তিক ১৪২৬
২৬ °সে


নাগরিক সেজে ভোটার হচ্ছেন রোহিঙ্গারা

নাগরিক সেজে ভোটার হচ্ছেন রোহিঙ্গারা
বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্রসহ আটক রোহিঙ্গারা। ছবি: দৈনিক ইত্তেফাক

নানা কৌশলে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে রোহিঙ্গারা। একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিদের যোগসাজশে ভোটার হচ্ছে তারা। রোহিঙ্গাদের ভোটার করতে চট্টগ্রাম অঞ্চলের শক্তিশালী সিন্ডিকেট জড়িত রয়েছে বলে তথ্য পেয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বেপরোয়া সিন্ডিকেটটি রোহিঙ্গাদের আত্মীয় পরিচয়ে স্থানীয়রা শনাক্ত করছেন। জমা দিচ্ছেন স্থানীয় চেয়ারম্যানের নাগরিকত্ব সার্টিফিকেট। জনপ্রতিনিধিরা তাদের প্রকৃত নাগরিকের স্বীকৃতি দেওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে ভোটার কার্যক্রম সংশ্লিষ্টদের। ভোটারের তথ্য সংবলিত চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কার্যালয় থেকে বেশ কয়েকটি ল্যাপটপ খোয়া যাওয়ার ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যে এ ধরনের ৪৬ জন রোহিঙ্গা ভোটারকে শনাক্ত করেছে ইসি। এমতাবস্থায় ছড়িয়ে পড়া রোহিঙ্গারা যাতে ভোটার হালনাগাদ কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত না হতে পারে, সে জন্য চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার, বিশেষ কমিটিসহ সারা দেশের আঞ্চলিক, জেলা ও উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসে সতর্কতা জারি করে চিঠি পাঠিয়েছে ইসি। উদ্বিগ্ন ইসি জরুরি বৈঠক করে সংশ্লিষ্টদের পাঠানো চিঠিতে রোহিঙ্গারা যেন ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হতে না পারে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক দৃষ্টি রাখার নির্দেশ দিয়েছে।

রোহিঙ্গাদের ভোটার করা বা জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত আছে বলে মনে করেন না নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম। সুর্নিদিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ অভিযোগ পেলে নির্বাচন কমিশন আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে চট্টগ্রামের ডবলমুরিং উপজেলা নির্বাচন অফিসের পিয়ন জয়নাল আবেদিনকে রোহিঙ্গাদের ভোটার করার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে কমিশন।

সারা দেশে সতর্কতা জারি-সংক্রান্ত ইসি সচিব মো. আলমগীর স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়েছে, সারা দেশে নির্বাচন কমিশন ঘোষিত ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম ২০ নভেম্বর শেষ হবে। নিবন্ধন কার্যক্রমে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকাসমূহে রোহিঙ্গারা যাতে ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হতে না পারে, সে বিষয়ে ইসি সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছে। হালনাগাদ কার্যক্রম সফল করতে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি জেলার ৩২টি উপজেলাকে ‘বিশেষ এলাকা’ ঘোষণা করা হয়েছে। এসব এলাকায় উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে ১৫ সদস্যবিশিষ্ট বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবু রোহিঙ্গারা বিভিন্ন কৌশলে ভোটার হওয়ার জন্য নানা রকম অপচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তাদের এই অপচেষ্টা নিবৃত্ত করার জন্য কমিশন সবার সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেছে। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারকে এ ব্যাপারে চিঠি পাঠান ইসি সচিব।

অনুরূপভাবে ইসির উপসচিব মো. আব্দুল হালিম খান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বিশেষ কমিটির উদ্দেশে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়ার বিষয়ে কারো কোনো রকম সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে এবং তদন্তে তা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও আইনানুগ ফৌজদারি মামলা করা হবে। এছাড়া রোহিঙ্গাদের ভোটার করার বিষয়ে যদি কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ তাদের সহযোগিতা অথবা মিথ্যা তথ্য প্রদান অথবা মিথ্যা কাগজপত্র সরবরাহ করেন, সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও ফৌজদারি মামলা করা হবে।

প্রসঙ্গত, ২০০৯ সাল থেকে রোহিঙ্গা বসবাসকারী এলাকাগুলোকে বিশেষ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে, বিশেষ ফরম ও কমিটির মাধ্যমে ভোটার করে আসছে ইসি। বিশেষ কমিটি অনুমোদন না করলে ঐ সব এলাকায় কাউকে ভোটার করা হয় না। তার পরেও প্রতিবারই রোহিঙ্গাদের ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তাদের ভোটার করতে মূলত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাই সহযোগিতা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগে প্রথম হালনাগাদে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন উপজেলার ৫০ হাজার রোহিঙ্গা ভোটারকে শনাক্ত করা হয়। পরবর্তীকালে উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণের পর ৪২ হাজার রোহিঙ্গা ভোটারের নিবন্ধন বাতিল করা হয়। ২০১২ সালেও কয়েকটি এলাকায় রোহিঙ্গা ও অবৈধ নাগরিকের অভিযোগে ১৭ হাজার রোহিঙ্গাকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয় কমিশন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এখন ইসির ঘোষিত ৩২টি বিশেষ উপজেলার বাইরে গিয়ে ভোটার হচ্ছে রোহিঙ্গারা। এ ক্ষেত্রে তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কেননা, এ ক্ষেত্রে রোহিঙ্গারা প্রকৃত বাংলাদেশি পরিচয় দিয়ে ভোটার হচ্ছে। প্রকৃত নাগরিকের মতো স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান থেকে নাগরিক সনদ ও জন্ম সনদ সংগ্রহ করছে তারা। এই জন্ম সনদ দিয়ে পাসপোর্টও তৈরি করছে রোহিঙ্গারা। যদিও বাংলাদেশে অবস্থিত ১১ লাখ ২২ হাজার রোহিঙ্গার ফিঙ্গার প্রিন্ট সংবলিত ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। ডাটাবেজের বাইরে অনিবন্ধিত ছড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের শনাক্ত করা কষ্টসাধ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক (অপারেশন) আবদুল বাতেন ইত্তেফাককে বলেন, ‘রোহিঙ্গারা যাতে ভোটার হতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। আমরা এখন রোহিঙ্গা শনাক্ত করতে দুটি ডাটাবেজ ব্যবহার করছি। প্রথমত, নতুন করে যারাই ভোটার হচ্ছে, তারা রোহিঙ্গা কি না, তা শনাক্ত করতে ১১ লাখ ২২ হাজার নিবন্ধিত রোহিঙ্গার ডাটা চেক করা হচ্ছে। সেখানে রোহিঙ্গা হিসাবে নো ম্যাচিং এলে পরবর্তীতে ইসির সাড়ে ১০ কোটি ডাটাবেজ চেক করে নো ম্যাচিং এলেই কেবল ভোটার হিসেবে কেন্দ্রীয় সার্ভারে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

এদিকে ভোটার তালিকায় যে ৪৬ জন রোহিঙ্গাকে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সার্ভারে ব্লক করেছে ইসি। ভোটার তালিকায় রোহিঙ্গা ঠেকাতে তাত্ক্ষণিকভাবে ৫১৮টি থানা ও উপজেলা অফিসের সার্ভারের পাসওয়ার্ড ও কোড নম্বর পরিবর্তন করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন করে আরো রোহিঙ্গাদের নাম ঢুকতে পারে এমন আশঙ্কায় ৩ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সার্ভারে নতুন ভোটারদের তথ্য আপলোড করার কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়।

সম্প্রতি রোহিঙ্গা নারী লাকি আটকের পর রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়ার তথ্য বেরিয়ে আসে। চট্টগ্রামের একটি থানা নির্বাচন অফিসের তদন্তে এক এলাকার ফরমে অন্তত ১৪টি থানায় রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ঐ ঘটনায় ইসির একজন উপসচিবের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। নিয়মবহির্ভূতভাবে একই এলাকার একটি ভোটার বইয়ের ৭৪টি নিবন্ধন ফরমের মাধ্যমে অন্তত ৬ জেলার ১৪টি থানা নির্বাচন অফিস থেকে রোহিঙ্গাদের ভোটার করা হয়েছে। একই নম্বরে একাধিক ব্যক্তি ভোটার হয়েছে। যেসব থানায় এসব ফরম ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি, ডবলমুরিং, পাঁচলাইশ, চান্দগাঁও, পাহাড়তলী, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ ও রাঙ্গুনিয়া। নোয়াখালীর সেনবাগ, কক্সবাজার সদর ও টেকনাফ, রাঙ্গামাটির লংগদু, বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি ও লক্ষ্মীপুরের কমলনগর।

ইসির অতিরিক্ত সচিব মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘চট্টগ্রামের ডবলমুরি উপজেলা নির্বাচন অফিসের একজন পিয়ন জয়নাল আবেদিন রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির অপচেষ্টায় জড়িত ছিলেন বলে প্রাথমিক তদন্তে এসেছে। তার বিরুদ্ধে আমরা ফৌজদারি মামলা দেওয়া এবং বিভাগীয় মামলার ব্যবস্থা নিচ্ছি। অন্য কেউ জড়িত আছে কি না, সেটাও আমরা দেখছি। ভোটার করতে পারেনি, আইডি দিতে পারেনি, এটেম্প নিয়েছে, সে জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো মতেই যাতে আইডি কার্ড না পায়, সে জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছি। তারা ভোটার হতে পারবে না।’

ইত্তেফাক/এএম

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২১ অক্টোবর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন