আমাদের ভাষাজ্ঞান!

আমাদের ভাষাজ্ঞান!
গ্রাফিক্স: ইত্তেফাক

রেলওয়ে পুলিশ এক কিশোর-অপরাধীকে জিগ্যেস করলেন : তুমি ট্রেনে মহিলাদের কামড়ে দিয়েছ কেন?

কিশোরের জবাব : আমি দেখলাম লেখা রয়েছে : ‘মহিলাদের কামড়া’। তাই কামড়ে দিয়েছি! আসলে ‘কামরা’ লিখতে লেখা হয়েছে ‘কামড়া’। কামরা আর কামড়া—দুইয়ের পার্থক্য শুধু ‘র’ আর ‘ড়’য়ে। কিন্তু দেখুন এই সামান্য একটা ‘র’-এর ভুলে কি মারাত্মক ঘটনাই না ঘটতে পারে!

পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক ড. পবিত্র সরকার বলেছেন, ‘ভাষা সব মানুষের সম্পত্তি, কিন্তু ‘ভাষাজ্ঞান’ সব মানুষের সম্পত্তি নয়। আমরা হয়তো অনর্গল কথা বলি, আধিপত্যের আসনে থাকলে দরকারের চেয়ে বেশি বলি, কিন্তু ভাষা বলতে ঠিক কী বোঝায় তা আমরা অনেকেই জানি না।’ স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, বিষয়টি আমিও ঠিক জানি না। আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষই জানে না।

প্রতিদিন খবরের কাগজ, গল্প-উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধের বই পড়তে পড়তে হোঁচট খাই। রেডিওর সংবাদ, ঘোষণা, টিভি চ্যানেলে বাংলা শব্দের বানান ও সঞ্চালকদের কথা শুনে আঁতকে উঠি। অতীতে ভাবতাম, দিনকে দিন ভুল কমে যাবে। সংশ্লিষ্টরা অভিজ্ঞ হবে, পেশাদারত্ব গড়ে উঠবে। একসময় ভুলের কণ্টকশয্যা ছেড়ে সবাই নির্ভুল পথে যাত্রা শুরু করবে! কিন্তু হায়, তা আর হলো কই! দুঃখ লাগে, যখন দেখি, বেশির ভাগেরই ভাষা এবং বানানজ্ঞান খুবই নিম্ন মানের। বই পড়া আর মাস্ক পরা আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষের কাছে কেবলই ‘পড়া’। করোনা পরীক্ষার কিট আর নর্দমার কীট একাকার হয়ে যায় ‘কীট’ বানানে! তার পরও দেখি কারো মধ্যে বিকার নেই, অনুশোচনা নেই। এমনকি শুদ্ধ করে লিখবার কোনো তাগিদও নেই!

এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে একটি গল্প। গল্পটা বরেণ্য সাংবাদিক সন্তোষ গুপ্তের মুখে শুনেছিলাম। গল্পটা বিখ্যাত ইংরেজি পত্রিকা দৈনিক অবজারভারের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক আব্দুস সালাম সম্পর্কে। যিনি খুব ভালো ইংরেজি জানতেন এবং ভাষার ব্যবহার ও বানানের ব্যাপারে খুব খুঁতখুঁতে ছিলেন।

একদিন সালাম সাহেব এক কনিষ্ঠ সহকর্মীকে বলেছিলেন, বানানের ব্যাপারে তুমি এত অসতর্ক কেন? কত দিন না বলেছি, যখনই কোনো বানান সম্ব্বন্ধে তোমার সন্দেহ হবে, সঙ্গে সঙ্গে ডিকশনারি দেখে সঠিক বানানটি জেনে নেবে।

সেই সহকর্মীটি নাকি মাথা নিচু করে বলেছিলেন, ঐ সন্দেহই তো হয় না, স্যার!

বানানের ব্যাপারে আমাদের প্রায় সকলেরই একই সমস্যা। কোনো সন্দেহই হয় না! হলেও ডিকশনারি দেখার ধৈর্য থাকে না। কম্পিউটার-ল্যাপটপ ইংরেজির ক্ষেত্রে সুবিধা করে দিয়েছে। কম্পিউটার-ল্যাপটপই বানান ভুল ধরে এবং শুদ্ধ করে দেয়। বাংলার ক্ষেত্রে এমন ‘মেড ইজি’ নেই। একটু কষ্ট করে শিখতে হয়, ডিকশনারি দেখতে হয়। তা না হলে ক্রমাগত ভুল হয়ে যায়। মানে-মতলবও পালটে যায়।

কয়েকটা উদাহরণ দেওয়া যাক। অনেকে অভিযোগ করেন, সে আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেনি। এখানে ‘ব্যবহার’ কথাটা হওয়া উচিত ‘আচরণ’। বিহেভিয়ার তো তা-ই হয়। আমি ডিএসএলআর ক্যামেরাটা ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারি না। এখানে ‘ইউজ’। কিন্তু আমরা ‘ব্যবহার’ কথাটা যত্রতত্র ব্যবহার করি।

একবার একটি খ্যাতনামা দৈনিকের বড় শিরোনাম ছিল—‘সংসদ অধিবেশনে সাত সাংসদ সোচ্চার’। আসলে ওটা হওয়া উচিত ‘সরব’। সোচ্চার মানে নিজে উচ্চারিত। গন্ডগোল বা হইচই করাটা সোচ্চার নয়। পত্রপত্রিকায় ক্রিকেট ফুটবল ম্যাচ নিয়ে লেখা হয়, আজ অমুকের সঙ্গে তমুকের ‘মরণবাঁচন লড়াই’, কেন? এটা হতে যাবে কেন? মরার জন্য কেউ লড়ে?

আমাদের গণমাধ্যমে প্রায়ই ‘ভোর রাতে’ শব্দটি প্রয়োগ করা হয়। দৈনিক পত্রিকায়ও এটা শিরোনাম হয়। প্রায়ই লেখা বা বলা হয় ‘এ জাতীয়’। হওয়া উচিত ‘এ ধরনের’ বা এ রকম। হিন্দু বা মুসলিম জাতি বা স্ত্রী জাতি অবশ্য ভিন্ন কথা। ন্যাশনাল-ই জাতিগত বা জাতীয়। যেমন, জাতীয় ক্রিকেট দল, জাতীয় আয়, জাতীয় পশু, জাতীয় সংগীত।

ক্রিকেটের খবরে প্রায়ই লেখা হয়, শূন্য রানে আউট হন। শূন্য রান-টা কী? ডাক মানে ০। শূন্য রান কেন? বোলিং করা, ব্যাটিং করা, পাশাপাশি দুটো ক্রিয়াপদ কেন? SH থাকলে উচ্চারণ হয় ‘শ’। তাহলে, ASHES তো অ্যাশেজ হওয়া উচিত। কিন্তু লেখা হচ্ছে অ্যাসেজ। টেনিসে সেট ও গেইম নিয়ে নিয়মিত ভুল হয়। একসময় তো নিয়মিত ‘শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ’, ‘ইহলোক ত্যাগ’, ‘পরলোক গমন’ ‘চিরবিদায়’ লেখা হতো; এখন এগুলো কিছুটা কমেছে। শুধু কি তাই? আমাদের দেশে সর্বজনীন এখনো ‘সার্বজনীন’ হয়ে আছে। সেটা মানবাধিকার সনদের ক্ষেত্রে যেমন আছে, দুর্গোত্সবেও আছে!

একসময় কোনো কোনো বাসের গেটে লেখা থাকত ‘বাস না থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন’। Till Stop-এর এ কেমন তর্জমা! তা হলে তো বাস থামবে না। ঠিক হতো ‘বাস থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন’। ‘প্রধান অতিথি না আসা পর্যন্ত সভা হবে না’, এটা তো ভুল। হওয়া উচিত ‘প্রধান অতিথি এলেই সভা হবে’। প্রায় লেখা হয় ‘ফলশ্রুতি’। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, ‘ফলশ্রুতি’ মানে ‘কর্মফল শ্রবণ’। কিংবা সেতুমন্ত্রী ‘পায়ে হেঁটে’ নির্মাণকাজ পরিদর্শন করেন। উনি কি হাতেও হাঁটেন? অথবা খবর পেয়ে প্রধানমন্ত্রী ছুটে যান? হ্যাঁ, আমাদের প্রধানমন্ত্রী অনেক ফিট, তাই বলে উনি দৌড়ে যান? লেখা হয়ে থাকে, পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয়। মুঠো তো হাতেই। হাতের মুঠো কেন লেখা হবে? কোয়েশ্চেন-এর মানে প্রশ্ন। পার্বত্য সমস্যা, তিস্তা সমস্যা হোক। ‘তিস্তা প্রশ্নে’, ‘পার্বত্য প্রশ্নে’ কেন হবে? মাঝে মাঝে মনে হয়, দুর্ঘটনাস্থল না লিখে দুর্ঘটনাস্থান লিখলে কেমন হয়? সাগরে, পদ্মায় কিংবা লেকে নৌকাডুবি হলে কি দুর্ঘটনাস্থল লেখা হবে?

আগামী শব্দের ব্যবহারে অনেকেই ভুল করেন। আগামী অর্থ ভবিষ্যতে আসবে বা ঘটবে এমন। ফলে কেউ যদি লেখেন—আগামী এক বছর পর আমার পড়ালেখা শেষ হবে—ভুল হবে। ‘আগামী’ লেখার পর আবার আগামীজ্ঞাপক ‘এক বছর পর’ লেখা বাহুল্য। এখানে কেবল ‘এক বছর পর’ লিখলেই চলবে।

অনেকে ভবিষ্যতের কোনো বিষয়ে বলতে গিয়ে ‘আগামীতে’ শব্দটি ব্যবহার করেন, যেমন :আগামীতে দেশের অবস্থা কেমন হবে জানি না। বস্তুত ‘আগামীতে’ একটি ভুল শব্দ। এর শুদ্ধ ও প্রমিত প্রয়োগ হচ্ছে আগামী দিনে বা ভবিষ্যতে। তাই লিখতে হবে—ভবিষ্যতে/আগামী দিনে দেশের অবস্থা কেমন হবে জানি না (বিশেষণের সঙ্গে বিভক্তি বা প্রত্যয় যুক্ত হয় না। আগামী/পরবর্তী—বিশেষণ পদ, তাই আগামীতে/পরবর্তীতে অশুদ্ধ)।

আমরা অনেকেই অনেক শব্দের মানে কিংবা বানান জানি না। এই অজ্ঞতা ঢাকতে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আরো বড় ভুল করি। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত গল্পটি মনে পড়ে গেল।

বাংলার শিক্ষক কবিতা পড়াচ্ছেন। কবিতার লাইনটি এই রকম :‘কপোল ভিজিয়া গেল দুই নয়নের জলে।’

এটা শোনার পর একজন ভাবুক ছাত্র জিগ্যেস করল: স্যার, কপোল মানে কী?

শিক্ষক বললেন : গাধা নাকি! কপোল মানে জানো না! কপোল অর্থ হলো কপাল!

ছাত্রটি একটু ভেবে বলল : স্যার, তাহলে নয়নের জলে কপোল ভেজে কী করে?

এবার শিক্ষক পড়ে গেলেন বেকায়দায়। আসলে তিনি নিজেও কপোলের অর্থ জানেন না। ছাত্রদের কাছে নিজের অজ্ঞতা প্রকাশ করা চলে না। তাই তিনি খানিকক্ষণ ভেবে বললেন, পরের লাইনটি না বলতেই তোমাদের এত প্রশ্ন?

এবার তিনি সহাস্যে বললেন, পরের লাইন হলো : পা দুটি বাঁধা ছিল কদমের ডালে।

সেই ভাবুক ছাত্রটির আর কোনো প্রশ্ন রইল না। পা উপরে বাঁধা থাকলে কপাল তো ভিজবেই (উল্লেখ্য, কপোল মানে চিবুক/গাল, যেটা শিক্ষক নিজেও জানতেন না)!

আসলে আমরা অনেকেই গল্পের সেই শিক্ষকের মতো অনেক শব্দেরই মানে জানি না। অথচ পাঠ্যবই, ব্যাকরণ বইয়ে প্রচলিত, অপ্রচলিত সব শব্দেরই অর্থ দেওয়া থাকে।

কারো ভুল ধরিয়ে দিলে সে খুব একটা খুশি হয় বলে মনে হয় না। অনেকে ভুলকে ‘অধিকার’ ও ‘স্বাধীনতা’ মনে করে থাকে। অনেকে আবার ভুলের শৃঙ্খলকে অলংকার মনে করে। ‘ভুল শুদ্ধের কোনো চিরন্তন মানদণ্ড নেই’—এমন বাণীও উচ্চারণ করে কেউ কেউ। এসবের ফাঁকফোকর দিয়ে ভুলের চর্চা এগিয়ে চলে।

পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা অনেক ভুল করি, যেমন—‘উত্কর্ষ’কে ‘উত্কর্ষতা’, ‘সখ্য’কে ‘সখ্যতা’, ‘সৌজন্য’কে ‘সৌজন্যতা’ লিখি। বাহ্যিক (বাহ্য), মহারাজা (মহারাজ), অর্ধরাত্রি (অর্ধরাত্র), মাধুর্যতা (মাধুর্য), মৌনতা (মৌন), কনিষ্ঠতম (কনিষ্ঠ), আবশ্যকীয় (আবশ্যক), অপমান হওয়া (অপমানিত হওয়া), প্রবেশ নিষেধ (প্রবেশ নিষিদ্ধ) ইত্যাদি (ব্র্যাকেটের ভেতরে সঠিক শব্দটি দেওয়া আছে)।

আমি নিশ্চিত, অনেকেই এগুলো মানতে চাইবেন না। বলবে : ব্যাটা বেশি বুঝিস? আমি ‘প্রবেশ নিষেধ’ লিখব, পারলে তুই আমাকে নিষিদ্ধ কর!

লেখক: রম্য রচয়িতা

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x