দুই বিস্মৃতপ্রায় নায়কের কথা

দুই বিস্মৃতপ্রায় নায়কের কথা
ছবি: সংগৃহীত

ভাষা আন্দোলনের ৬৯ বছরে পৌঁছে এই আন্দোলনের দুই বিস্মৃতপ্রায় নায়কের কথা মনে পড়ছে। একজন অলি আহাদ, অন্যজন এমাদুল হক। সাধারণ্যে পরিচিত ছিলেন লালা ভাই নামে। বায়ান্নতে ভাষা আন্দোলনের সময় দুজনেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহযোগী ছিলেন। বায়ান্নর এক বছর পর ১৯৫৩ সালে একুশে ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় বছরে ঢাকা মহানগরীতে যে বিশাল মৌন শোক মিছিল বেরিয়েছিল, তা সংগঠনের ব্যাপারে অলি আহাদ ও এমাদুল হক লালা ভাইয়ের কৃতিত্ব অনেক। এই মিছিলের সামনের সারিতে ছিলেন মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিব।

১৯৫৩ সাল ছিল বাংলাদেশে (তখন পূর্ব পাকিস্তান) মুসলিম লীগের নূরুল আমিন সরকারের শাসনের শেষ বছর। তা হলেও তাদের বিষদাঁত তখনো ভাঙেনি। তারা ঘোষণা করেছিলেন, একুশের শহিদ দিবস তারা পালন করতে দেবেন না। ১৪৪ ধারা জারি করবেন। ১৪৪ ধারা ভাঙা হলে তারা গুলি চালাবেন। অর্থাত্, আরেকটি রক্তাক্ত একুশে ঘটাবেন। সরকারের এই হুমকির মুখে ভাষা আন্দোলনের যুবনেতারা কি পিছিয়ে যাবেন মিছিল করা থেকে?

এই যুবনেতাদের বৈঠকে গাজিউল হক বললেন, দরকার হলে ১৪৪ ধারা ভাঙতে হবে, তবু সরকারের হুমকির কাছে মাথা নত করা চলবে না। অলি আহাদ বললেন, সরকার আগেভাগেই হুমকি দিয়েছে ১৪৪ ধারা দেবে। সরকারকে জানানো দরকার, এই শোক মিছিল শান্তিপূর্ণ হবে। কোনো হিংসাত্মক ঘটনা ঘটবে না এই মিছিল থেকে। তাদের দরকার নেই ১৪৪ ধারা জারি করার।

শেখ মুজিব ও এমাদুল হক এই প্রস্তাবে সায় দিলেন। তখন পাঞ্জাবি আইসিএস (পরে সিএসপি) এন এম খান ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকারের চিফ সেক্রেটারি। দীর্ঘকাল বাংলাদেশে সরকারি চাকরি করায় তিনি প্রায় বাঙালি হয়ে গিয়েছিলেন। তার নামে চট্টগ্রামের স্টেডিয়ামের নাম নিয়াজ মোহাম্মদ স্টেডিয়াম। তার আগের চিফ সেক্রেটারি আজিজ আহমদও পাঞ্জাবি আইসিএস অফিসার ছিলেন। তিনি যেমন ছিলেন ধূর্ত, তেমনই ছিলেন বাঙালিবিদ্বেষী। তিনিই বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে গুলিবর্ষণের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এন এম খান ছিলেন আজিজ আহমদের উলটো চরিত্রের। বাঙালি ও বাংলাদেশের প্রতি তার টান ছিল। তিনি চাইছিলেন না ভাষা আন্দোলনের প্রথম বার্ষিকীতে কোনো গোলমাল হোক। তিনি ভাষা আন্দোলনের যুবনেতাদের কাছে প্রস্তাব দিলেন, একুশের শোক মিছিল যদি শান্তিপূর্ণ হয় এবং মিছিলে কোনো স্লোগান দেওয়া না হয় এবং এই মর্মে সরকারকে নিশ্চয়তা দেওয়া হলে সরকার মিছিল করার অনুমতি দেবে।

সরকারের এই প্রস্তাব মেনে নেওয়া ভাষা আন্দোলনের নেতাদের পক্ষে কষ্টকর ছিল। মিছিল না হয় শান্তিপূর্ণ হবে, কিন্তু এই বিশাল মিছিলে আবেগাল্পুত হয়ে ‘শহিদ দিবস অমর হোক’ বলে কেউ স্লোগান দেবে না, এমন নিশ্চিয়তা কেমন করে দেওয়া যায়? এমাদুল হক লালা ভাই বললেন, আমাদের মিছিল মৌন মিছিল হবে। মিছিল যত বড়ই হোক, তা যাতে মৌন মিছিল হয়, তার ব্যবস্থা আমি করব। ছাত্রদের নিয়ে কয়েকটি স্কোয়াড গঠন করে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য মিছিলের পাশাপাশি রাখা হবে। লালা ভাইয়ের কথায় সবাই সম্মত হন। ঠিক হলো, একুশে ফেব্রুয়ারির শোক মিছিল মৌন মিছিল হবে।

অলি আহাদের মধ্যে একটা নেতাজিসুলভ ভাব ছিল। তিনি সেই শোক মিছিলে মিলিটারি কায়দায় শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করেছিলেন। এত বড় শোক মিছিল, মেডিক্যাল কলেজের শহিদ মিনার (বর্তমান শহিদ মিনার তখন হয়নি) থেকে যখন মিছিল বেরোচ্ছে, তখন তার মাথা পৌঁছে গেছে সদরঘাটে। বিস্ময়ের কথা, কালো পতাকাবাহী এই মিছিলে একটি শব্দ কেউ উচ্চারণ করেনি। আমি তখন ছাত্র। এই মিছিলে ছিলাম। মুজিব ভাই ব্যবস্থা করেছিলেন মিছিলের লোকদের পানি খাওনোর। মিছিল যখন সেন্ট্রাল জেলের সামনে পৌঁছায়, তখন এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। জেলে রাজনৈতিক বন্দিরা তাদের সেল থেকে বেরিয়ে এসে রুমাল উড়িয়ে স্লোগান দিচ্ছিলেন—‘শহিদ দিবস অমর হোক’, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। এ সময় শোক শোভাযাত্রার শৃঙ্খলা রক্ষা করা ছিল এক দারুণ ব্যাপার। মিছিলের সবার মন উসখুস করছে রাজবন্দিদের স্লোগানের সঙ্গে তাদের স্লোগান মেলাতে। ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’ বলে স্লোগান দেওয়ারও ইচ্ছে ছিল অনেকের। কিন্তু নেতাদের কঠোর নিয়ন্ত্রণে তারা মৌন থাকেন। মিছিল শান্তিপূর্ণভাবে জেলগেট পার হয়।

’৫৩ সালে ভাষা শহিদ দিবসের মিছিল এমন শান্তিপূর্ণ হবে সরকার হয়তো তা আশা করেনি। মুসলিম লীগ ওয়ালারা হয়তো আশা করছিলেন, মিছিল থেকে হিংসাত্মক ঘটনা ঘটবে, স্লোগান দেওয়া হবে এবং তারাও মিছিলের ওপর পুলিশ লেলিয়ে দেওয়ার সুযোগ পাবেন। তাদের এই আশা পূরণের জন্য তারা একটি ফাঁদ পেতেছিলেন। তখন প্রভিন্সিয়াল লাইব্রেরি নামে বাহাদুর শাহ পার্কের (তখন নাম ছিল ভিকটোরিয়া পার্ক) উলটো দিকে একটি বইয়ের দোকান ছিল। এই দোকানের মালিক ছিলেন গোঁড়া মুসলিম লীগার এবং মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনের খয়েরখাঁ। ’৫৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে যখন ঢাকা শহরের প্রতিটি দোকানপাট বন্ধ, গাড়িঘোড়া চলাচল নেই, তখন প্রভিন্সিয়াল লাইব্রেরির মালিক তার বইয়ের দোকান মিছিলে উসকানি দেওয়ার জন্য খোলা রেখেছিলেন। ভেবেছিলেন শোক মিছিল বাহাদুরশাহ পার্ক অতিক্রম করার সময় প্রভিন্সিয়াল লাইব্রেরি খোলা দেখে উত্তেজিত হয়ে লাইব্রেরিতে হামলা করবে। তখন পুলিশের সঙ্গে মুসলিম লীগের গুন্ডারা মিলে শোক মিছিলে চড়াও হবে। শোক মিছিল ভণ্ডুল হয়ে যাবে। এই বাসনা থেকে সরকার বাহাদুরশাহ পার্কে বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন রেখেছিল।

প্রভিন্সিয়াল লাইব্রেরি খোলা রয়েছে দেখে মিছিলের একটা অংশে দারুণ উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল। হয়তো বইয়ের দোকানটাতে হামলা হতো। কিন্তু এখানেই অলি আহাদ, এমাদুল হক লালা ভাইয়ের নেতৃত্বের গুণ। তাদের নিয়ন্ত্রণে মিছিল শান্তিপূর্ণভাবে বাহাদুর শাহ পার্ক অতিক্রম করে। মুসলিম লীগ সরকারের সব আশা নস্যাত্ হয়ে যায়।

আজিমপুর গোরস্তানে গিয়ে যখন মিছিল শেষ হয়, তখন দেখি অলি আহাদ ঘর্মাক্ত কলেবরে শহিদ বরকতের কবরের পাশে বসে আছেন। তার কাছেই দাঁড়িয়ে আছেন শহিদ বরকতের মা। দীর্ঘ শালপ্রাংশু দেহ। তাকে আমার সব সময়ই মনে হতো একটি দেবদারু গাছ। যত দিন বেঁচে ছিলেন, তত দিন প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে এসে শহিদ মিনারে দাঁড়াতেন। অশ্রুসজল চোখে বক্তৃতা দিতেন। তিনি যে কখন সন্তানের কবরে এসে বসে আছেন তা জানতাম না। তাদের কাছে গিয়ে বললাম, আহাদ ভাই, আপনাদের দুটো কোল্ড ড্রিংকস এনে দেব? অলি আহাদ বললেন, দাও না ভাই, তাহলে খুব উপকার হবে।

এখন বাজারে হরেক রকম কোল্ড ড্রিংকস। কোকাকোলা থেকে কত কী। তখন কোকোকোলা বা অন্য কোনো ড্রিংকস ঢাকায় আসেনি। সংবাদের আহমেদুল কবির পেশায় একজন ব্যবসায়ীও ছিলেন। তিনি ভীমটো নামে একটা ড্রিংকস বের করেছিলেন। সেটাই তখন ঢাকায় চালু ছিল। আমি এই ভীমটোর দুটো বোতল এনে একটি অলি আহাদকে, অন্যটি শহিদ বরকতের মাকে দিয়েছিলাম। তিনি আমার মাথায় হাত দিয়ে দোয়া করেছিলেন।

দীর্ঘ আটষট্টি বছর আগের ঘটনা। তবু মনে হয় এই সেদিনের কথা। ভাষা আন্দোলন সংগঠনে মুজিব ভাইয়ের সঙ্গে ফরিদপুরের বিভিন্ন স্থানে গেছি। তিনি ডাবের পানি খেতে ভালোবাসতেন। কোথাও যাওয়ার পথে ডাব বেচা হচ্ছে দেখলেই ডাবের অর্ডার দিতেন। ভাষা আন্দোলনে ১৯৪৮ সাল থেকে শেখ মুজিবের যে অবিস্মরণীয় অবদান, বদরুদ্দীন উমর তার ভাষা আন্দোলন সম্পর্কিত গ্রন্থে তা মুছে ফেলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে, ততই ইতিহাসের সেই সত্য স্বাভাবিকভাবেই বেরিয়ে আসছে। শেখ মুজিব জাতির পিতা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীরও পিতা। তার জীবনের খুঁটিনাটি নিয়েও শয়ে শয়ে বই লেখা হচ্ছে। কিন্তু বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাচ্ছেন ভাষা আন্দোলনের অন্য সব বীর নায়কেরা—অলি আহাদ, আবদুল মতিন, এমাদুল হক লালা ভাই, গাজীউল হক, রুহুল আমিন কায়সার, কে জি মোস্তফা এবং আরো অনেকে। ইতিহাস কি এদেরও একদিন সম্মান দেবে, প্রকৃত মর্যাদা দেবে, তা আমি জানি না। লালা ভাই ইয়ুথ লীগ (বর্তমানের যুবলীগ নয়) নামে প্রগতিশীল যুব রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের অন্যতম সংগঠক ও প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ইয়ুথ লীগ সারা প্রদেশের আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। লালাভাই অকালে বসন্ত রোগে মারা যান। ১৯৫৫ সালে তিনি যখন মারা যান, তখন শেরেবাংলা ফজলুল হক পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তিনি যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে লালা ভাইয়ের মৃতদেহ সমাধিস্থ করার জন্য হেলিকপ্টারযোগে পাঠিয়েছেন বরিশালে।

রুহুল আমিন কায়সার, অলি আহাদও আজ নেই। অলি আহাদ দারুণ প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক মনের মানুষ ছিলেন। ’৭১-এর মুক্তিসংগ্রামেও যোগ দিয়েছিলেন। চরিত্রে বামপন্থি হাওয়া সত্ত্বেও শেষ বয়সে তার মধ্যে ডানপন্থি রাজনীতির প্রবণতা দেখা দিয়েছিল। তিনি একটি আত্মজীবনী লিখে গেছেন। তাতে ভাষা আন্দোলনের অনেক অজানা কথা জানা যায়। আবার মুজিব ভাইও তার অসমাপ্ত আত্মজীবনী লিখে গেছেন। তাতে বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে অলি আহাদের ভূমিকার কথা জানা যায়।

ভাষা দিবসের ৬৯তম বার্ষিকিতে এসে শহিদ সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের স্মৃতির প্রতি যেমন শ্রদ্ধা জানাই, তেমনি বিনম্রচিত্তে শ্রদ্ধা জানাই ভাষা আন্দোলনের সেই সব বিস্মৃতপ্রায় নায়কদের প্রতি, যাদের লড়াকু ভূমিকা ছাড়া ভাষা আন্দোলন সফল হতো না। আর ভাষা আন্দোলন সফল না হলে বাংলাদেশও স্বাধীন হতো না। এক অর্থে এরাও বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি। বিস্মৃতি থেকে এদের সবাইকে ইতিহাসের পাতায় তুলে আনা দরকার।

ইত্তেফাক/টিআর

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x