বিশুদ্ধ চর্চা হোক একুশের অঙ্গীকার

বিশুদ্ধ চর্চা হোক একুশের অঙ্গীকার
ছবি: সংগৃহীত

বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো ও বৈচিত্র্যময়। বাংলা ভাষারও রয়েছে সুপ্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য। সেই সঙ্গে বাংলা পৃথিবীর একমাত্র ভাষা যা লাখো শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত। এমন গৌরবোজ্জ্বল অবদানের জন্য বাংলা ভাষা বিশ্ব দরবারে স্থান করে নিয়েছে, একুশে ফেব্রুয়ারি স্বীকৃতি পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ভিনদেশি ভাষার কবলে মাতৃভাষা আজ বড়ই অসহায়। বাংলা ভাষায় চলছে ভিনদেশি শব্দের অবাধ বিচরণ।

বিকৃত সংস্কৃতির প্রভাবে আজ বাঙালি হয়েও বাংলা বলতে আমরা লজ্জাবোধ করি। ভাষাকে তার প্রাপ্য মর্যাদাটুকু দিতে করি কার্পণ্য। মাতৃভাষা চর্চাকে উপেক্ষা করে বরং হিন্দি অথবা ইংরেজি ভাষায় আমরা বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। মাতৃভাষায় এক অকারণ নির্লিপ্ততা ও হীনম্মন্যতা কাজ করছে আমাদের মধ্যে। ভাষাকে নিয়ে আমরাও গর্ববোধ করি, কিন্তু তা সময়বিশেষ। বিভিন্ন দিবসকে কেন্দ্র করে ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করলেও পরক্ষণেই এ শ্রদ্ধা আর থাকছে না। অর্থাৎ ভাষার আনুষ্ঠানিকতায় আমরা যতটা তৎপর, ভাষার চর্চায় ঠিক ততটাই নিষ্ক্রিয়।

তথাকথিত আধুনিকতার নামে মায়ের ভাষাকে আজ আমরা ছেড়ে দিতে পারলেই বাঁচি। আরো বেশি উদ্বেগের বিষয় যে, ভাষার প্রতি এ অনীহা এখন কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মাঝে সীমাবদ্ধ নেই বরং সমাজের প্রতি স্তরের মানুষের মাঝেই ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি দেশের সচেতন ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মাঝে ভাষার এ বিকৃতায়নের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত। যে মহত্ ব্যক্তিরা মাতৃভাষা নিয়ে জ্ঞানের বুলি আওড়ান, দিনশেষে তারাও ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন। প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে এগিয়ে থাকতে নিজেদের সন্তানদেরকে করে তুলছেন পাশ্চাত্য ভাষামুখী। অথচ ভাষার সঙ্গে একটি জাতির অস্তিত্ব ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মাতৃভাষার সংরক্ষণে তাই এখনই তত্পর না হলে একসময় প্রশ্নবিদ্ধ হবে বাঙালির জাতিসত্ত্বা। নিজ ভাষার প্রতি এমন নিস্পৃহতা এবং ভিনদেশি ভাষার প্রতি ঝোঁকের অন্যতম কারণ অবশ্য, বিশ্বায়নের এ যুগে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে প্রতিটি স্থানে ইংরেজির দাপট।

এটি অবশ্যস্বীকার্য যে, বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে ইংরেজি ভাষায় পারদর্শিতার জুড়ি নেই। তবে অন্য ভাষায় পারদর্শী হতে গিয়ে যে নিজ ভাষাকে জলাঞ্জলি দিতে হবে এর কোনো ভিত্তি নেই। মাতৃভাষার যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি আমরা অন্যান্য ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করতেই পারি। বরং মাতৃভাষাকে ভালোবাসতে জানলে অন্যের ভাষার প্রতিও আমাদের শ্রদ্ধাবোধ বাড়বে। অন্যথায় অন্য ভাষার প্রতিও আমাদের পরিপূর্ণ সন্মানবোধ তৈরি হবে না, যা হবে তা নিতান্তই মেকি। তাছাড়া ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করলে আমরা দেখতে পাব, বাংলা ভাষায় যারা মহান পণ্ডিত ছিলেন তাদের প্রত্যেকের মধ্যেই ছিল একাধিক ভাষার চমত্কার দক্ষতা। এমনকি পৃথিবীর এমন অনেক উন্নত দেশ রয়েছে, যারা মাতৃভাষাকে ব্যবহার করেও সাফল্যের চরম শেখরে পৌঁছেছেন।

তবে আমরা বাঙালিরা কেন পারব না? তাই বিশ্বায়নের প্রকোপে আমাদের আত্মপরিচিতি ভুলে গেলে চলবে না। জাতি হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে হলেও মাতৃভাষার প্রতি আমাদের যত্নশীল ও সচেতন হতে হবে। ভাষার সঙ্গে ইতিমধ্যেই আমাদের যে মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে, সেটাকে ভেঙে দিয়ে বাংলা ভাষার সুষ্ঠু ও বিশুদ্ধ চর্চায় প্রত্যয়ী হতে হবে। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, মাতৃভাষার মানে সংকীর্ণতা নয়, বরং এ ভাষা আমাদের অহংকার, আমাদের নিজস্বতা। তাই ভাষার বিশুদ্ধ চর্চা হোক একুশের অঙ্গীকার।

লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x