বাংলা ভাষার বিকৃতি বন্ধ হোক

বাংলা ভাষার বিকৃতি বন্ধ হোক
ছবি: ইত্তেফাক

১৯৫২ সালে পাকিস্তানি শোষকদের চাপিয়ে দেওয়া ভাষার বিরুদ্ধে বাঙালি ছিল সোচ্চার। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ’৫২ সালে একুশে ফেব্রুয়ারি আমরা ভাষার জন্য জীবন দিয়ে পৃথিবীতে একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি। পাকিস্তানিরা আমাদের দাবি মানতে বাধ্য হয়েছিল।

নব্বইয়ের দশকে ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। যেটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। কিন্তু এ গৌরবের বিপরীত দিকও আছে। আমরা কি বাংলা ভাষাকে সঠিক মর্যাদা দিতে পারছি? আমরা কি বিশুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে পারি? আমরা কি বাংলা ভাষার বিকৃতি রোধ করতে পেরেছি? অথচ, বিশ্ববাসী আমাদের এক ভাষাপ্রেমী জাতি হিসেবেই চেনে। দিন দিন বাংলা ভাষার বিকৃতি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা একে অন্যের সঙ্গে কথা বলার জন্য বাংলা ভাষা ইংরেজিতে লিখছি। সেই কথোপকথনের চিত্র দেখলে মনে হয়, বাংলা ভাষার অস্তিত্বকে আমরা সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছি।

১৯৪৮ সালে করাচিতে নিখিল পাকিস্তান শিক্ষা সম্মেলনে পাকিস্তানিরা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রয়াসে আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব করেছিল। আমরা কিন্তু তাদের অযৌক্তিক প্রস্তাব গ্রহণ করিনি। হয়েছে প্রতিবাদ, আন্দোলন। কিন্তু এখন তরুণ প্রজন্মের বড় অংশই ইংরেজি অক্ষরে বাংলা লিখছে প্রতিনিয়ত। যার প্রভাব পরীক্ষার খাতায়ও দেখতে পাওয়া যায়! কিন্তু কোনো মহল থেকেই এর কোনো প্রতিবাদ ওঠছে না। ভাষা বিকৃত করার প্রবণতা তরুণদের মধ্যে বেশ লক্ষণীয়। বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ভাষাপ্রেম তেমন ফুটে উঠেছে না। পরিবেশে নিজেকে একটু শিক্ষিত বা মার্জিতভাবে উপস্থাপন করার জন্য বাংলা ভাষার মধ্যে ইংরেজি ব্যবহার করেন। কিন্তু তাদের সামনে এক জন কৃষক কিংবা রিকশাচালক যদি খাঁটি বা আঞ্চলিক বাংলা ভাষায় কথা বলেন তখন তথাকথিত শিক্ষিতরা তাদের ক্ষেত বলে। অফিস-আদালত, চলচ্চিত্র, নাটক, বিজ্ঞাপনসহ প্রায় জায়গাতেই চলছে বিদেশি ভাষার ব্যবহার। বিদেশি ভাষার আগ্রাসনে খাঁটি বাংলা ভাষার চর্চা দিন দিন কমে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় আফসোসের বিষয় হলো, আমাদের সমাজে কিছু সুশীল ব্যক্তিবর্গ আছেন যারা টকশো কিংবা প্রেরণা বক্তৃতায় (মোটিভেশনাল স্পিচ) বেশি ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেন। যার প্রভাব পড়ে দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে। তারাও মিশ্র ভাষায় কথা বলতে শেখে। বেসরকারি বেতারগুলোর উপস্থাপকরা তো বাংলা বলেন না বললেই চলে। বর্তমানে বেশির ভাগ মানুষই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যুক্ত আছেন। মোটামুটি সবাই ইউটিউবের সঙ্গে পরিচিত।

বেশির ভাগ তরুণ ইউটিউবাররা মিশ্র ভাষায় কথা বলেন, তাদের ইংরেজি উচ্চারণ ভালো হলেও বাংলা উচ্চারণ তেমন উন্নত না। বাংলা ভাষার বিকৃতির জন্য এরা দায়ী। জনতার মধ্যে বাংলা ভাষার এমন বিকৃত অবস্থা দেখেও সুশীল শ্রেণিরাও চুপচাপ-নীরবতা লক্ষ্য করে যাচ্ছে! আমরা বেশির ভাগ লোকজনই বিশুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে পারি না। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বাংলা ভাষার বিকৃতি রোধে কাজ শুরু করতে হবে। বিশুদ্ধ বাংলা ভাষা চর্চা জোর দিয়ে শুরু করতে হবে। শুধু একুশে ফেব্রুয়ারি এলেই রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিংবা শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে থাকলেই হবে না। বছরব্যাপী এ চর্চা চলমান রাখতে হবে। বুকের তাজা রক্ত আর জীবনের বিনিময় অর্জিত মাতৃভাষা বাংলার বিকৃতি রোধে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিকে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। জনতার মধ্যে বিশুদ্ধ বাংলার সাহিত্যকর্মগুলো ছড়িয়ে দিতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রমেও পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে। এই একুশের একুশ থেকে সবার মুখে বিশুদ্ধ বাংলার প্রতিধ্বনি উচ্চারিত হোক। ভাষা শহিদদের আত্মা শান্তি পাক। তবেই বাংলা মায়ের হূদয়েও মিলবে প্রশান্তি।

লেখক: শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x