অনুবাদে ভাষার প্রসার

অনুবাদে ভাষার প্রসার
গ্রাফিক্স: ইত্তেফাক

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অনুবাদচর্চ্চা’ নামে একটি বই আছে, সেখানে শিক্ষার্থীদের অনুবাদ শিক্ষা দেওয়ার জন্য শিক্ষকদের প্রতি ভূমিকাংশে বেশ কিছু নির্দেশনা বর্ণিত হয়েছে। তিনি মনে করতেন, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ অত্যন্ত দুঃসাধ্য।

তবে তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘যদি যথোচিত অধ্যবসায়ের সঙ্গে অন্তত দুই বত্সর কাল এই অনুবাদ প্রত্যনুবাদের পন্থা ধরে ভাষা ব্যবহারের অভ্যাস ঘটানো যায়, তাহলে ইংরেজি ও বাংলা দুই ভাষাতেই দখল জন্মানো সহজ হবে। ভাষা শিক্ষার প্রণালি হিসেবে অনুবাদের গুরুত্ব আমাদের দেশে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের দীর্ঘ সাত দশক পরও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে সম্প্রতি বাংলা একাডেমি ‘অনুবাদ’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে এবং অনূদিত পাঠ্যপুস্তক প্রকাশে সক্রিয় হয়েছে। অন্যদিকে ১৮ ফেব্রুয়ারি (২০২১) বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ‘আমার ভাষা’ নামে একটি অনুবাদ সফটওয়্যার উদ্বোধন করেছে। এই সফটওয়্যার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সুপ্রিম কোর্টের আদেশ ও রায়গুলো ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করতে সক্ষম। অর্থাত্ অনুবাদের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা প্রসারিত হওয়া শুরু হয়েছে ক্রমান্বয়ে।

অনুবাদ একটি সপ্রাণ, সংক্রামক, মূল্যবান সাহিত্যকর্ম এবং কখনো কখনো তা সৃষ্টিকর্মেরও মর্যাদা পায়। অনুবাদ সম্পর্কে কবি-কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘অন্যদেশের কবিতা’ গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন—‘মূল ভাষা না জেনে অনুবাদ করার প্রচেষ্টা গুরুতর ধৃষ্টতা বা অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। কিন্তু এ জন্য আমি নিজেকে তেমন অপরাধী মনে করি না, তার প্রথম ছোট কারণ শব্দের সৌকুমার্য যখন ভাষান্তরিত করা অসম্ভব, তখন মূল ভাষা জানার প্রশ্ন তেমন জরুরি নয়’। বাংলা কবিতায় অনুবাদ চর্চা বেগবান হয়েছে এই অনিবার্য দূরত্বকে স্বীকার করে নিয়ে।

এই দূরত্ব দূর করতে পারা গেলে অনুবাদেও এক গুণগত পরিবর্তন আসবে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। মূল কবিতার শব্দে অর্থের যে ব্যঞ্জনা, অনুবাদক তাতে নানাভাবে সাড়া দিয়ে থাকেন, কারণ অনেক শব্দই একার্থক নয়। বিশেষ অনুবাদে তার একটি অর্থই ধরা পড়ে, ব্যঞ্জনার বাকিটুকু মূল ভাষার সঙ্গে পরিচয় না হলে চিরদিন অজানা থেকে যায়। শব্দার্থগত দিক ছাড়াও আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক কবিতার গতি, তার ছন্দ-স্পন্দ, সেখানে শ্রবণেন্দ্রীয়ের ভূমিকা—অন্য ভাষার অনুবাদে পুরোপুরি আসার কথা নয়। পরোক্ষ অনুবাদে সেটা একেবারেই হারিয়ে যেতে পারে।

রবীন্দ্রনাথের সূত্রে বাংলা ভাষা শিখে সাহিত্যের অনুবাদে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন একাধিক গবেষক ও পণ্ডিত। বাংলা থেকে জার্মান অনুবাদে এগিয়ে আছেন অধ্যাপক ড. হান্স সাডার, মার্টিন ক্যামশন, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, হেলেন মেয়ার ফ্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তবে জার্মান ভাষায় রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’ অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয় ১৯১৪ সালে। কবি বুদ্ধদেব বসু হ্যেল্ডার্লিন (১৯৬৭) এবং রাইনের মারিয়া রিলকের (১৯৭০) কবিতা অনুবাদ করে জার্মান কবিতাকে জনপ্রিয় করে তোলেন।

অনুবাদে তিনি প্রাঞ্জলতার প্রকাশ ঘটিয়ে এক নতুন আঙ্গিকের কবিতার আস্বাদ তৈরি করেছেন। ভিন্ন ভাষার কবিতাটির ওপর পূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করার পর কবিতাটিকে তিনি নিজের মতো নিজের উপলব্ধিতে এবং পরে তার ভাষিক অভিব্যক্তিতে রূপান্তরিত করেছেন। ফলে এটি একটি নবসৃষ্টি, কেবল প্রথাগত অনুবাদ নয়। ইংরেজি থেকে জার্মান ভাষার কবিতার অনুবাদের ক্ষেত্রে বিশেষ একটি কোনো অনুবাদের ওপর তার নির্ভরতা ছিল না। বহু পরিশ্রমে তিনি কবিতার মর্মস্থলে প্রবেশ করতেন।

বাংলা একাডেমির অনুবাদ বিভাগ স্বাধীনতার আগে থেকে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যের বাংলা অনুবাদ পাঠকদের হাতে তুলে দেয়। তবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নয়নের জন্য বিশ্বের অন্যান্য উন্নত ভাষায় রচিত সাহিত্য ও চিন্তামূলক রচনার অনুবাদ অনস্বীকার্য মনে করে বিশ্বসাহিত্যের বাংলা অনুবাদ ব্যাপকভাবে শুরু হয় স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকে। অনুবাদকেও সাহিত্য হয়ে উঠতে হয়, শুধু মূল বক্তব্যকে প্রকাশ করলেই অনুবাদ হয় না। কবি-সাহিত্যিকের বক্তব্য ও ভাবকে অনুবাদের মাধ্যমে সত্যিকার রসসিক্ত সাহিত্য করে তুলতে হয়। অনুবাদকের কৃতিত্ব এখানেই। এই কৃতিত্ব দেখিয়েছেন বাংলা একাডেমির অনুবাদকেরা।

জার্মান মহাকবি গ্যেটে ১৮২৮ সালে লিখেছিলেন, ‘অনুবাদক হলেন তার নিজের জাতির দেবদূত।’ তার মতে, প্রত্যেক সাহিত্যই শেষ পর্যন্ত নিজেকে নিয়ে ক্লান্ত বিরক্ত হয়ে ওঠে, যদি কোনো বিদেশি উত্স থেকে সে আবার তরতাজা না হতে পারে। বিদেশি সাহিত্যের সঙ্গে সংযোগের ফলে গ্যেটের নিজের সাহিত্য ও ইউরোপের সব সাহিত্য কীভাবে বারবার সঞ্জীবিত হয়েছে, কীভাবে নতুন প্রাণের ধাক্কায় তার ক্লান্তি, তার গতানুগতিকতা কাটিয়ে উঠেছে, তিনি এ বিষয়ে অবহিত ছিলেন।

গ্যেটে যেমন ইরানের কবি হাফিজের কবিতার (ইংরেজি থেকে) জার্মান অনুবাদ পড়ে পারস্য সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হন এবং রচনা করেন ‘দিওয়ান অব দ্য ওয়েস্ট অ্যান্ড ইস্ট’, তেমনি গ্যেটের রচনা ইংরেজিতে পড়ে বাঙালি কবি-সাহিত্যিকেরা তার কল্পনার ব্যাপ্তি ও সৃষ্টির রহস্য অনুভব করে উদ্বেলিত হন উনিশ শতকেই। বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে অনুবাদকেরা গ্যেটের সৃষ্টিকর্মের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদে আত্মনিয়োগ করেন।

অবশ্য বিশ্বসাহিত্য বিষয়ে কৌতূহল মেটানোর জন্য এখনো এ দেশে প্রধান উপায় হলো ইংরেজি অনুবাদের শরণাপন্ন হওয়া। ইংরেজি ভাষার বাইরে যেসব বই—প্রধানত কবিতা এখানে অনুবাদ হয়েছে, তার প্রায় সবটাই ইংরেজি অনুবাদের মধ্যস্থতায়। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অনুবাদে কোনো গ্রহণযোগ্য মান অর্জিত হয়নি। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোনো স্পষ্ট ও দৃঢ় ভাষানীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কোনো অনুবাদনীতি গৃহীত না হওয়ায় ভাষা শিক্ষা ও অনুবাদচর্চা দুর্বলতার দোষে চিহ্নিত।

তবে বাংলায় বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদে টেক্সচুয়াল লেভেলের আক্ষরিক অনুবাদ এবং একই সঙ্গে রেফারেনসিয়াল বা অনুষঙ্গ অথবা পরোক্ষ ইশারা আবিষ্কার করে অনুবাদকেরা পরিশ্রমের স্বাক্ষর রেখেছেন। ফলে মূলের সঙ্গে কোনো অনুবাদই অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। আক্ষরিক ও কাঠামোগত অভিন্নতা বজায় রেখে কোহেসিভ লেভেলও অর্থ ও ব্যঞ্জনায় স্নাত হয়েছে। অনুবাদ হয়ে উঠেছে পুনঃসৃষ্টি। ফলে বাংলা ভাষার ঘটেছে ব্যাপক প্রসার।

লেখক: অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x