ভাষা আন্দোলনের ধ্রুব নক্ষত্র ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত

ভাষা আন্দোলনের ধ্রুব নক্ষত্র ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত
শহিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ফাইল ছবি

১৯৪৮ সালে রাজনীতিবিদদের মধ্যে সর্বপ্রথম যে নির্ভীক ব্যক্তিত্ব করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদে দাঁড়িয়ে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন, তিনি কুমিল্লার কৃতী সন্তান ও ৭১-এর শহিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। পাকিস্তান গণপরিষদে দুটি সংশোধনী এনেছিলেন তিনি। প্রথমটি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং দ্বিতীয়টি প্রতি বছর কমপক্ষে একবারের জন্য ঢাকায় পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশন।

ইংরেজিতে প্রদত্ত বক্তৃতায় বাংলাকে অধিকাংশ জাতিগোষ্ঠীর ভাষা উল্লেখ করে ধীরেন্দ্রনাথ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবি তোলেন। গণপরিষদের সেই অধিবেশনে তাঁর বক্তব্যে যতটা না আবেগের প্রতিফলন ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল যুক্তির ধার। পাকিস্তানের ৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লাখই বাংলাভাষী এবং পাকিস্তানে রাজকার্যে তাদের ভাষাকে বাদ দিলে সমস্যার সৃষ্টি হবে সেটাও তাঁর বক্তব্যে পরিষ্কার করেছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। তাঁর বক্তব্য থেকেই প্রথম দাবি ওঠে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার।

বাংলার পথে প্রান্তরে ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতাকেই গণপরিষদ সদস্যদের সামনে তুলে ধরেন তিনি। পূর্ব বাংলার একজন সাধারণ মানুষ পোস্ট অফিসে মানিঅর্ডার ফরম পূরণ করতে গেলেও যে উর্দু ভাষায় লিখিত ফর্ম পূরণ করতে গিয়ে হিমশিম খান—এই কথাও ধীরেন্দ্রনাথের বক্তব্যে উঠে এসেছিল সেদিন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন কাজটি তাঁর জন্য সহজ হবে না। তবে তিনি আশা করেছিলেন পূর্ব বাংলার প্রভাবশালী মুসলিম লীগ নেতারা তাঁকে সমর্থন দেবেন। সংসদ সদস্য প্রেমহরি বর্মণ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের সংশোধনী উপস্থাপনাকে সমর্থন করেন, ভূপেন্দ্রনাথ কুমার দত্ত এবং শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানান। তারা পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন এবং তাঁদের এ সমর্থনের মাধ্যমে মূলত পূর্ব পাকিস্তানে স্বাভাবিক মতামতই প্রতিফলিত হয়েছিল।

তমিজুদ্দিন খানের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ একযোগে এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে বাঙালি স্পিকার তমিজুদ্দিন খান জানালেন প্রস্তাবটি গৃহীত হচ্ছে না। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবটি গণপরিষদে বাতিল হওয়ার ফলে ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট অনুষ্ঠিত হয়। স্কুল, কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ক্লাস ছেড়ে বেরিয়ে আসে। সে বছরের ১১ মার্চ সমগ্র প্রদেশে ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত হয়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব বাতিল হওয়ার ঘটনা ক্ষুব্ধ করেছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। ১১ মার্চের ছাত্র ধর্মঘটে ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহর মতো শিক্ষকরাও সামনে থেকে পথ দেখিয়ে গেছেন। এ আন্দোলনে গ্রেপ্তার হন শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, রমেশদাশ গুপ্তসহ অসংখ্য ছাত্রনেতা। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুল আসন নিয়ে জয়লাভ করে। ৯ মে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা মার্চে নিজ বাড়ির আঙিনায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়ান। কুমিল্লার সেই বাড়ি থেকেই হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। বর্ষিয়ান এই রাজনীতিবিদকে তারা নির্মমভাবে হত্যা করে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পবিত্র রক্তে ভিজে আছে বাংলাদেশের মাটি, ভিজে আছে বাংলা বর্ণমালা।

ইত্তেফাক/ইউবি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x