ভাষা আন্দোলন ও ভাষা বাণিজ্য: দেশে-বিদেশে

ভাষা আন্দোলন ও ভাষা বাণিজ্য: দেশে-বিদেশে
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। ছবি: সংগৃহীত

একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু ভারতীয় উপমহাদেশে নয়, সারা দুনিয়ার ইতিহাসে এক বিস্ময়কর ঘটনা। দুনিয়ার মানুষ হতচকিত বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়েছে মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের জনতার দুর্জয় প্রতিরোধের শক্তিতে, শ্রদ্ধায় মাথা নত করেছে ভাষার দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানের তরুণদের এই বিশ্ব ঐতিহাসিক আত্মত্যাগে। তাই বলা যায় জাতিগত অত্যাচারের বিরুদ্ধে, জনতার গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য দুনিয়া জুড়ে মানুষের যুগ যুগব্যাপী যে সংগ্রাম একুশে ফেব্রুয়ারি তাকে এক নতুন চেতনায় উন্নীত করেছে।

বাঙালি জাতি বুক ফুলিয়ে বলতে পারে, বাংলা আমার মাতৃভাষা, বাংলা আমার ইতিহাস, বাংলা আমার ঐতিহ্য। বাংলা হয়েছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা। তবে এই বাংলা ভাষার জন্য যে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানেই (অধুনা বাংলাদেশ) আন্দোলন হয়েছে তা কিন্তু নয়। বিষয়টি নিয়ে সামান্য আলোকপাত করতে হলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে। ১৭৬৭ থেকে ১৮৩২, দীর্ঘ ৬৫ বছর পর অবিভক্ত ভারতবর্ষের জঙ্গলমহল জেলা ভেঙে গঠন করা হয় মানভূম জেলা। ১৯১২ সালে ইংরেজ শাসক মানভূমকেই বিহার উড়িষ্যার সঙ্গে যুক্ত করে দেয়।

চব্বিশ বছর যেতে না যেতেই বিহার থেকে উড়িষ্যা পৃথক করে মানভূমি থেকে গেল বিহারেই। অথচ ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে জানা যায়, সেই সময় সেখানকার ৭২% মানুষের ভাষা ছিল বাংলা। শাসনতান্ত্রিক সুবিধার অজুহাতে মানভূমির বাংলাভাষীর মানুষ মানভূমিকে বিহারের হিন্দি বলয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে বাংলাতে আনার আকাঙ্ক্ষায় ক্ষোভে ফুঁসতে লাগল, শুরু হলো ভাষা আন্দোলন। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হলো, কিন্তু মানভূমি থেকে গেল বিহারেই। সাম্রাজ্যবাদী প্রতিরোধের আঁতুড়ঘর মানভূমিকে ঘন ঘন বিচ্ছিন্ন করার ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। স্বাধীন ভারতে বিহার রাজ্য সরকারের চক্রান্তে পঠন-পাঠন দিন দিন বন্ধ হতে লাগল। অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে বাংলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন বাতিল করা হলো। সৃষ্টি হয় এক রাজনৈতিক অস্থিরতার। মানভূমকে বাংলার সঙ্গে সংযুক্তি ও বাংলা ভাষার দাবিতে তত্কালীন মূল কংগ্রেসের একাংশ পদত্যাগ করে ‘লোক সেবক সংঘ’ নামে নতুন দল গঠন করেন যার নেতৃত্বে ছিলেন স্বনামধন্য নেতা ও ভাষাপ্রেমী অতুল্যচন্দ্র ঘোষ, বিভূতিভূষণ দাসগুপ্ত, লাবন্যপ্রভা দেবী, জহরি মাহাতো ও জগবন্ধু ভট্টাচার্য। দাবি একটাই ‘মানভূমের ভাষা বাংলা চাই’। এটা সুস্পষ্ট যে, মানভূমে বাংলা ভাষা আন্দোলন ১৯১২ সালে শুরু হয়। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে ভাষা আন্দোলন তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়ে মানভূমের বাঙালিদের মধ্যে। মানভূমের এ ভাষা আন্দোলন পৃথিবীতে ঘটা দীর্ঘতম ভাষা আন্দোলন। ১৯৫৬ সালের আগে পুরুলিয়া জেলা বিহারের অন্তর্ভুক্ত ছিল। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে তারা সুদৃঢ় আন্দোলন করেন। এরপর ১৯৫৬ সালে ভারত সরকার মানভূম জেলা ভেঙে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সঙ্গে একটি নতুন জেলা সংযুক্ত করতে বাধ্য করেন।

বাংলা ভাষার আন্দোলন মানেই আমরা বুঝি ১৯৫২-এর ২১ শে ফেব্রুয়ারি। আমরা জানি সালাম, রফিক, শফিক, বরকত ও জব্বারের নাম। কিন্তু এর বাইরেও যে বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন তা অনেকের কাছে অজানাই রয়ে গেছে।

১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন আর ১৯৬১ সালের আসামের ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট এক নয়। কেননা আসামে বহুজাতি-উপজাতি ভাষাভাষী মানুষের বসবাস। এই সব মানুষের নিজস্ব ইতিহাস-ঐতিহ্য, রাজনৈতিক পটভূমি ও সংস্কৃতিগত স্বাতন্ত্র্যও বিদ্ধমান। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, ১৯ মে আসামের ভাষা আন্দোলনের জন্য যারা শিলচর রেলওয়ে স্টেশনে প্রাণ হারান তারা সবাই বাঙালি ছিলেন। বিষয়টি আরো আলোচিত হয় কমলা ভট্টাচার্যের কারণে। কারণ তিনিই বাংলা ভাষার জন্য প্রথম মহিলা শহিদ। সে আলোকে আসামের ভাষা আন্দোলন একটি মর্যাদাপূর্ণ গুরুত্ব বহন করে। কেননা মাতৃভাষার জন্য এক জন নারীসহ ১১ জনের প্রাণহানি খুব ছোটো ঘটনা ছিল না। কিন্তু তার পরও বিষয়টি আসামের কাছাড় জেলার অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবেই থেকে গেল।

বাংলা ভাষার এই আন্দোলন সফল না হওয়ার কারণ ছিল আন্দোলনকারীদের সবাই দেশভাগের সময় পূর্ববঙ্গ থেকে আগত এবং সঠিক নেতৃত্বের অভাব। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার স্বীকৃতি দেওয়ার পর বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষার একটা মর্যাদা তৈরি হয়। বাঙালির সাফল্যের ভান্ডারে আরেকটি অর্জন যোগ হয়। প্রাচ্যের সমৃদ্ধশালী দেশ জাপান নিজেদের ভাষা জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদা না পেয়েও ১৯৬৪ সালের টোকিও অলিম্পিকের পর থেকে বাণিজ্যিকভাবে প্রায় অর্ধশতক বিশ্বকে শাসন করেছে। সেজন্য ভাষা কোনো অন্তরায় হয়নি। গত ২১ শে ফেব্রুয়ারি গণমাধ্যমকে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, জাতিসংঘে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রতিবছর ৬০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়। ইতিপূর্বে জার্মানি, ভারত ও জাপানও তাদের ভাষাকে জাতিসংঘে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করে, কিন্তু অর্থের পরিমাণ শুনে সবাই পিছুটান দেয়। জাতিসংঘে বাংলা দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করুক তা সবাই চাই। তবে আমাদের বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে সারা বিশ্বে যে স্বীকৃতি লাভ করেছে তা কোনো অংশেই কম নয়।

লেখক: সভাপতি-আন্তর্জাতিক বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি সমিতি (দিল্লি), বাংলাদেশ শাখা

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x