প্রমিত বাংলা বানান ও উচ্চারণে ঔদাসীন্য

প্রমিত বাংলা বানান ও উচ্চারণে ঔদাসীন্য
ছবি: প্রতীকী

আজকাল প্রায়শই অনেকের মুখেই মুখস্থ বুলি শুনতে পাই—আধুনিক ছেলেমেয়েরা ঠিকমতো বাংলা বলতে চায় না; ওরা বাংলা-হিন্দি-ইংরেজি মিশ্রিত নতুন এক ভাষার জন্ম দিয়েছে। ওরা বাংগিশ। অর্থাত্ না পারছে ভালো বাংলা বলতে, না পারছে ভালো ইংলিশ আওড়াতে।

‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’—বাংলা ভাষার এই জনপ্রিয় প্রবাদটি না লিখে স্বস্তি মিলছে না মোটেও।

এবার আসা যাক বিষয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে। ফেব্রুয়ারি ভাষার মাস। বছরের এই একটি মাস নিয়ে আমরা যতটা গর্জন তুলি তার কিছুটা ছিটেফোঁটা যদি বাকি ১১টি মাস দেখাতে পারতাম, তবেই মনে হয় বাংলা ভাষাকে সঠিকভাবে মর্যাদা দিয়ে টিকিয়ে রাখা যেত। একটা সময় ছিল, ভালো বাংলা সাহিত্য মানেই পশ্চিমবাংলার সাহিত্যকে ধরে নেওয়া হতো। শুদ্ধ বাংলা মানেই তাদের বাচনভঙ্গি আর উচ্চারণকেই প্রাধান্য দেওয়া হতো। কিন্তু সময় পালটেছে। সেদিক বিবেচনায় আমরা অনেক অগ্রগামী ও সমৃদ্ধ।

পশ্চিম বাংলার অনেক কবি সাহিত্যিকের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে দেখেছি, তারা অকপটে স্বীকার করছেন তাদের ওখানে আর সেভাবে বাংলা সাহিত্যচর্চা বা বাংলা ভাষার ব্যবহার হচ্ছে না। অধুনা ছেলেমেয়েরা পাশ্চাত্য চলাফেরায় আর হিন্দির দাপটে বেমালুম বাংলাকে ভুলে যাচ্ছে। তবে আমাদের দেশেই বাংলা সাহিত্য এবং বাংলা ভাষার সঠিক চর্চা চলছে। শুনে গর্বে বুকটা ভরে যায়। কিন্তু খুব কাছ থেকে যখন আমাদের চিত্রটি অবলোকন করি, তখন খুব কষ্ট পাই। বাংলার সঠিক চর্চা বা ব্যবহার মানে ইংরেজিকে ফেলে দিতে হবে তা নয়। ইংরেজি হচ্ছে আন্তর্জাতিক ভাষা। তা আমাদের অবশ্যই জানতে হবে। তবে সেটা বাংলাকে অবজ্ঞা করে নয়। ইংরেজি ভাষায় যদি আমরা পারদর্শী না হই, তবে আমাদের সাহিত্য ভান্ডারকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করতে আমরা ব্যর্থ হব। সাহিত্যকে বিশ্বের কাছে সুপরিচিত করতে না পারলে সে সাহিত্য স্থায়িত্ব লাভ করবে না।

প্রথমে আসা যাক বাংলা বানানরীতির বিষয়টির ব্যাপারে। আমরা শিক্ষিত সমাজের অভিজ্ঞ লোকেরা যদি কোনো ইংরেজি বানান ভুল করে ফেলি, তবে লজ্জায় আমাদের মাথাকাটা যায়। কিন্তু অহরহ বাংলা বানান ভুল করে যেন ‘সাহেব বনে’ যাই। এটা যেন খুবই গৌরবের একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। খুব গর্বভরে বলতে পছন্দ করি, বাংলাটা আসলে একদমই চর্চা নেই। তাই বাংলা ঠিকমতো লিখতেই পারি না।

এই ধরা যাক উচ্চারণের বিষয়টি—সেক্ষেত্রে ইংরেজি উচ্চারণ খুব সাবধানে বলি। যদি একটু ভুল হয়ে যায়, তবে লোকে ধরে নিবে আমরা অর্ধশিক্ষিত! কিন্তু যখন বাংলা বলার ক্ষেত্রে এক লাইনে পাঁচটি শব্দের শুদ্ধ উচ্চারণই আমার অজানা, তাতে আমরা মোটেও লজ্জিত নই।

এবার আসি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কথায়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সত্যিই ওনাদের বাংলা বানান, উচ্চারণ এবং বাক্য প্রয়োগ দেখে যে কোনো সচেতন মানুষ মূর্ছা যেতে বাধ্য।

বাংলা শিক্ষক ছাড়া অন্যান্য বিষয়ের কতিপয় শিক্ষক রয়েছেন যারা বোর্ডে লিখতে গিয়ে বানানের ক্ষেত্রে এতটাই উদাসীন কিংবা লেকচার দেওয়ার সময় উচ্চারণের ক্ষেত্রে এমনসব আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেন, তাতে শিক্ষার্থীরা সেই সুনির্দিষ্ট বিষয়ের শিক্ষাগ্রহণ বাদ দিয়ে শিক্ষকের আঞ্চলিকতায় মুখ টিপে হেসেই অস্থির।

অন্যান্য বিষয়ের অনেক শিক্ষকই ধরে নেন, বাংলা বাক্য ব্যবহারে উচ্চারণ আর বানানের কাজটি মোটেও তাদের নয়। এটা বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের দায়িত্ব। সেক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দিনভর শিক্ষার্থীরা পাঁচ বা ছয়টি বিষয়ের মধ্যে একটি বাংলা ক্লাস পায়। এই একটি ক্লাসের মাধ্যমে কীভাবে তারা শুদ্ধ বাংলা বানান আর উচ্চারণ রপ্ত করবে! তবে সব শিক্ষকদের চিত্র এটি নয়। মুষ্টিমেয় শিক্ষকদের চিত্র ঐগুলো। কথায় বলে, ‘এক কেজি দুধের মধ্যে এক ফোঁটা টক ঢেলে দিলেই যথেষ্ট’। এবার বলি আমাদের মতো বাংলা সাহিত্যের মুষ্টিমেয় শিক্ষকদের গল্প কথা।

বেশ কয়েক মাস আগে জনৈক বাংলা বিভাগীয় প্রধানের সঙ্গে জরুরি মিটিং-এ বসেছি।

মিটিংয়ের শুরুটা ছিল এমন—‘ম্যাডাম আর বলিয়েন না পরতি (প্রায়) দিনই কোনো না কোনো পোরগাম (প্রোগ্রাম) লেগেই আছে।’ যতদূর জেনেছি ওনি এভাবেই আঞ্চলিকতার মাধুরী মিশিয়ে প্রতিনিয়ত ক্লাস নিচ্ছেন।

আঞ্চলিক ভাষা সত্যি আপন মহিমায় এক সুমিষ্ট ভাষা। নিজেদের ভেতরে এ ভাষা ব্যবহার করে কথা বললে হূদ্যতা ও ভালোবাসা বাড়ে। কিন্তু সেটি কেন প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা হবে! প্রতিষ্ঠানে আমাদের অবশ্যই প্রমিত ভাষা প্রয়োগ করতে হবে। সেই সঙ্গে বাচনভঙ্গি এবং বাক্য বিন্যাসে থাকবে মাধুর্যময় অলঙ্করণ। নতুবা এই কোমলমতি শিশু-কিশোরেরা কোথায় শিখবে শুদ্ধ উচ্চারণ আর সুবাক্য বিন্যাস? শিক্ষার্থীরা তো নরম কাদামাটি। ওদেরকে শিক্ষা দেওয়ার কৌশল রপ্ত করতে না পারলে আমরা কীসের শিক্ষক? শিক্ষকের গুণে কঠিন ও দুরূহ বিষয় শিক্ষার্থীদের কাছে খুব সহজ হয়ে ধরা দেয় আর শিক্ষকের অক্ষমতায় সহজ বিষয় থেকেও শিক্ষার্থীরা বিমুখ হয়ে পড়ে। এজন্য আধুনিক ছেলেমেয়েদের দোষারূপ বন্ধ করে আমাদের অনেক বেশি সচেতন ও ইতিবাচক কর্মস্পৃহা দেখাতে হবে। রাস্তাঘাটে বের হলেই প্রথমে যেটি দৃষ্টিকাড়ে সেটি হচ্ছে দেওয়াল ঠাসা পোস্টারে। খুব জানতে ইচ্ছে করে যারা পোস্টারের কাজের সঙ্গে যুক্ত তারা না হয় কম লেখাপড়া জানা লোক। কিন্তু বড় বড় নেতা বা মহা মনীষীদের পোস্টারগুলো যে ভুল বানানে ছেয়ে আছে, সেটা কি তাদের নজর কাড়ে না? বহু নির্বোধ বানান থাকে সেই পোস্টার জুড়ে! এর হিসেব কষে শেষ করা যাবে না। তবে যেই বানানটি পোস্টারে সবচেয়ে বেশি বার ব্যবহূত হয় সেটা হচ্ছে ‘স্বার্থক’। খুব ইচ্ছে করে প্রতিটি দেওয়ালের পোস্টারে পোস্টারে শুদ্ধ করে লিখে দিতে ‘সার্থক’।

চলুন আমরা সবসময় ছেলেমেয়েদের ওপর ভুলের বোঝা না চাপিয়ে প্রত্যেকে নিজেদের সঠিক অবস্থান তৈরি করি। তবেই বদলে যাবে সমাজ-দেশ। বেঁচে যাব আমরা সুস্থ-সুন্দর নতুন প্রজন্মকে নিয়ে।

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই বিখ্যাত উক্তি টেনে বলতে চাই—‘আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, তারপর ইংরেজি শেখার পত্তন।’

লেখক :সহকারী অধ্যাপক, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি

ইত্তেফাক/এমএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x