করোনার টিকা লইয়া ধোঁয়াশা

করোনার টিকা লইয়া ধোঁয়াশা
[প্রতিকী ছবি]

করোনা মহামারির উদ্বেগ ও একরাশ হতাশা লইয়া বিশ্ববাসী গেল বত্সরটি পার করিয়াছেন। এখন নূতন বৎসরে বহু কাঙ্ক্ষিত করোনার টিকার সুখবর আসিতেছে। ইতিমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবদেহে কয়েকটি টিকার প্রয়োগও শুরু হইয়াছে। ২৭৩টি ভ্যাকসিন লইয়া গবেষণা অব্যাহত থাকিলেও মোট ১২টি ভ্যাকসিন গবেষণার তৃতীয় ধাপ অতিক্রম করিয়াছে। তাহার মধ্যে এই পর্যন্ত মাত্র ছয়টি ভ্যাকসিন জনগণের উপর ব্যবহারের অনুমতি মিলিয়াছে। এই ভ্যাকসিনগুলি হইল—ফাইজার-বায়োএনটেক কোম্পানির তৈরি টোজিনামেরান, মডার্না কোম্পানির এমআরএনএ-১২৭৩, চীনা কোম্পানি সিনোফার্ম ও সিনোভ্যাকের দুইটি ভ্যাকসিন, রুশ কোম্পানি গামালেয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়-অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি একটি ভ্যাকসিন; কিন্তু করোনার টিকা লইয়া অনেকের মধ্যে যে সন্দেহ, সংশয় ও বিভ্রান্তি রহিয়াছে, রহিয়াছে ইহার কার্যকারিতা লইয়া প্রশ্ন, তাহাতে এই টিকা প্রয়োগের সফলতা লইয়া কিছুটা হইলেও ধোঁয়াশা তৈরি হইতেছে।

সাধারণত যে কোনো টিকা মানবদেহে প্রয়োগের জন্য নিরাপদ কি না—তাহা পরীক্ষানিরীক্ষা করিতে ৮-১০ বৎসর লাগিয়া যায়; কিন্তু করোনার মতো পৃথিবীর ইতিহাসে এই পর্যন্ত আসা অণুজীবগুলির মধ্যে সবচাইতে অধিক ছোঁয়াচে ভাইরাসের টিকা আবিষ্কার কীভাবে মাত্র কয়েক মাসে সম্ভব, তাহা লইয়া প্রশ্ন থাকা অস্বাভাবিক নহে। সম্প্রতি ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকা নেওয়ার পর পর্তুগালে এক স্বাস্থ্যকর্মী, সুইজারল্যান্ডে এক বৃদ্ধা এবং নরওয়েতে দুই স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যুর পর এই ব্যাপারে সৃষ্টি হইয়াছে ভয় ও ভীতি। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে মডার্নার টিকা নেওয়ার পর এক চিকিৎসকের দেহে তীব্র অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া, মাথা ঘোরা ও হূত্স্পন্দন বাড়িয়া যাওয়া ইত্যাদি নেতিবাচক লক্ষণ দেখা দেয়। ফাইজারের টিকা নেওয়ার পরও অনেকের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গিয়াছে। তাহা ছাড়া ভাইরাসটি প্রকৃতি হইতে উদ্ভূত, নাকি কোনো ল্যাবরেটরিতে মনুষ্যসৃষ্ট—ইহা লইয়া অনেকের মনে সন্দেহ দানা বাঁধিয়াছে। করোনার টিকা লইয়া কূটনৈতিক লড়াই বা ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারেও অনেকে বিরক্ত। ইহা সঠিক তাপমাত্রায় রাখা যাইবে কি না—ইহা লইয়াও কথা উঠিতেছে। তাই করোনা টিকার কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার বিষয়টি লইয়া এখনো যেই সকল প্রশ্ন আছে, টিকাটি প্রয়োগের পাশাপাশি সেই ব্যাপারে চিকিৎসক ও অণুজীব বিজ্ঞানীদের মতামত তুলিয়া ধরিয়া প্রত্যেক দেশের সরকারের উচিত জনসচেতনতামূলক প্রচারাভিযান পরিচালনা করা।

২০১৯ সালের নভেম্বরে চীনের উহান প্রদেশে করোনা ভাইরাসের উৎপত্তির পর ভয়াবহ এই ভাইরাসটি দ্রুত সমগ্র বিশ্বে ছড়াইয়া পড়ে। ইতিমধ্যে বিশ্বে ইহাতে আক্রান্ত হইয়াছে ৯ কোটিরও অধিক মানুষ এবং মৃত্যুবরণ করিয়াছে প্রায় ২০ লক্ষ। এই জন্য জরুরি ভিত্তিতে মানুষ বাঁচাইতে বিজ্ঞানীরা টিকা আবিষ্কারে প্রাণান্তকর পরিশ্রম করিয়াছেন এবং এখনো উন্নতমানের টিকা আবিষ্কারে চেষ্টা চালাইয়া যাইতেছেন। বলা হইতেছে, যেই সকল টিকার প্রয়োগ শুরু হইয়াছে তাহার কার্যকারিতা ৭০ শতাংশ হইতে ৯৫ শতাংশ। সাধারণত কোনো টিকা ৫০ শতাংশ কার্যকর হইলেও তাহা ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়। ফ্লু ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ৪০ হইতে ৬০ শতাংশ এবং ইহা প্রতি বত্সর লইতে হয়। তাহার পরও অনন্যোপায় হইয়া আমরা ইহা ব্যবহার করিতেছি। একসময় কলেরার টিকার সাইড এফেক্ট বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল মারাত্মক। তাহার পরও আমরা সেই সকল টিকা ব্যবহার করিয়াছি মৃত্যুহার কমাইতে। বর্তমানে বিশ্বে লক্ষ লক্ষ মানুষ করোনার টিকা ব্যবহার করিতেছে। তাহাদের সকলেই কি মারা যাইতেছেন? নিশ্চয়ই নহে। অতএব, বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া করোনার টিকা লইয়া অযথা সন্দেহ সৃষ্টি বা জনমনে আতঙ্ক তৈরি করা সমীচীন হইবে না। যতদিন না আরো উন্নতমানের টিকা আবিষ্কার হয়, ততদিন রিস্ক-বেনিফিট রেশিও তথা ঝুঁকির চাইতে লাভ অধিক বিবেচনায় বর্তমান টিকা ব্যবহারে কাহারও আপত্তি থাকিবার কথা নহে।

ইত্তেফাক/এমআর

Nogod
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত