মানুষের কৃপাণ, প্রকৃতির প্রতিশোধ

মানুষের কৃপাণ, প্রকৃতির প্রতিশোধ
ছবি: সংগৃহীত

মানুষ ও প্রকৃতি একে অপরের কতটা পরিপূরক, করোনা ভাইরাস অতিমারি তার জাজ্বল্য প্রমাণ হয়ে হাজির। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের (ডব্লিউডব্লিউএফ) এই মূল্যায়ন তাই প্রশ্নটিকে আরেক দফায় সামনে নিয়ে আসে :প্রাণবিক তাগিদ, নাকি মানবিক গুণ, মানুষের জীবনাচরণে কোনটির প্রকাশ কাম্য? অন্য প্রাণীর সঙ্গে মানুষের পার্থক্যরেখা অমোচনীয় কালিতে এঁকে দেয় তো তার মানবিকতাই। সুতরাং বেঁচে থাকবার আকাঙ্ক্ষার পেছনে মানুষের প্রাণবিক তাগিদ সত্য হলেও অন্য প্রাণীর প্রতি সহমর্মিতা, প্রকৃতির প্রতি সহূদয়তা তার শ্রেষ্ঠত্বের দলিল। কিন্তু বাস্তবিক দেখা যাচ্ছে, এক হাতে এই দলিল উঁচিয়ে ধরে মানুষ অন্য হাতে তুলে নিয়েছে কৃপাণ!

তাই যদি না হবে গত পাঁচ দশকে দুই-তৃতীয়াংশ বন্যপ্রাণ হারিয়ে যেত না। ডব্লিউডব্লিউএফ সোজাসাপটা বলছে, প্রকৃতি-পরিবেশকে ধ্বংস করছে মানুষ নির্বিচারে, বেরহমভাবে। বন কেটে বানিয়েছে বসত, গড়েছে পরিবেশবিনাশী কারখানা। কাঠ বেচে কামিয়েছে টাকা। এখন, এই করোনাকালে যে হারে মানুষ প্রকৃতিবিনাশে মত্ত, অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে খান খান।

২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত হারিয়ে গেছে ১৯ লাখ মাইল বনভূমি, যা ব্রিটেনের আয়তনের আট গুণ। ১০ লাখ প্রজাতির প্রাণী পৌঁছে গেছে বিলুপ্তির দোরগোড়ায়। ফি বছর নষ্ট হচ্ছে ১৩০ কোটি টন খাদ্য। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ১ লাখ কোটি ডলার মূল্যের অর্থনীতি। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রাণী ও উদ্ভিদের ১ লাখ প্রজাতির মধ্যে ৩২ হাজার প্রজাতি হারাতে বসেছে পৃথিবী।

‘শ্রেষ্ঠ’ মানুষের এহেন ‘নিকৃষ্ট’ কর্মের ফলে সার্বিকভাবে যে ভেঙে পড়েছে বাস্তুতন্ত্র, তা দুই বিয়োগ দুই সমান শূন্যের মতো বাস্তব। অথচ মানুষের জীবনও বাস্তুতন্ত্রনির্ভর। নিজেদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও আর্থিক ক্ষতিই শুধু নয়, পৃথিবীতে টিকে থাকার সম্ভাবনাকেও ঝুঁকিতে ফেলছি আমরা, আর কবে বুঝব? মরিয়া হয়ে প্রকৃতির পাঠানো ‘সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে’, বিপত্সংকেতেও কি হুঁশ ফিরবে না আমাদের?

কিন্তু কথায় যখন কাজ হয় না, তখন ভিন্ন পথ ধরতে হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এরই মধ্যে পরিবেশ ধ্বংসকেও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। বন-বনভূমি হাপিস করে দেবেন, কৃষিজমির বৈশিষ্ট্য কেড়ে নেবেন, নদীর গতিপথ রুদ্ধ করে দেবেন, উন্নয়নের দোহাই পেড়ে এসব করে আর রেহাই পাবেন না। পরিবেশ ধ্বংসকারী ও ভূমি-নদী-বন দখলের হোতাদের বিচারের জন্য নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আইসিসির দরজা এখন খোলা। পেরুর সাবেক প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফুজিমোরিকে পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগে এরই মধ্যে?আইসিসির কাঠগড়ায় নেওয়ার চেষ্টাও হয়েছিল। তবে তার অপকর্ম যেহেতু আইসিসি প্রতিষ্ঠার (২০০২) আগের সময়ের, তাই তিনি আপাতত ফসকে গেছেন।

অর্থাত্ যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, মানব পাচারকারীদের পাশাপাশি পরিবেশ ধ্বংসকারীরাও এখন আদালতের চোখে মানবতাবিরোধী অপরাধী। হাতে রক্তের দাগ নেই যার, নিজ হাতে একটি প্রাণীও হয়তো হত্যা করেননি যিনি, তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন। তাই বলে আপনার অবিমৃশ্য সিদ্ধান্তে বা স্বার্থান্ধ অবস্থানের কারণে যদি প্রাণ-প্রকৃতি বিপন্ন হয়, তাহলে কি শাস্তি আপনার প্রাপ্য নয়? এখন থেকে শাস্তি পাবেন।

প্রকৃতি-প্রতিবেশ ধ্বংস ও ভূমি দখলই কেবল নয়, সাংস্কৃতিক নিদর্শন ও বিশ্ব ঐতিহ্যের সাক্ষী প্রত্নসম্পদের ক্ষতিও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ মানছেন আইসিসি। আশার কথা, এই অপরাধে মালির জঙ্গি নেতা আহমাদ আল-ফাকি আল-মাহদিকে ৯ বছরের কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। তিনি ২০১২ সালে জাতিসংঘের বিশ্ব ঐতিহ্য-ঘোষিত টিমবাকটুর সৌধগুলো গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন। আইসিসি তাকে ২০১৬ সালে যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত করে।

তবে চট্টগ্রামের চুনতি অভয়ারণ্যে একজন সংসদ সদস্যের আবাস গড়ার সুপারিশে স্পষ্ট, ব্যক্তিগত লাভালাভের হিসাবের বৃত্তে আটকা পড়ে এখনো খাবি খাচ্ছি আমরা। শতবর্ষী মাদার-গর্জনের জন্য সুপরিচিত চট্টগ্রামের বাঁশখালী, লোহাগড়া ও সাতকানিয়া উপজেলা এবং কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ৭৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের চুনতি অভয়ারণ্যে এরই মধ্যে প্রায় সাড়ে ৩০০ দখলদার থাবা বসিয়েছে।

সারা দেশে বনের জমি জবরদখলকারীর সংখ্যা বন বিভাগের হিসেবেই ১ লাখ০ ৬০ হাজার ৫৬৬ জন। সংরক্ষিত বনও তছনছ করেছেন ৮৮ হাজার ২১৫ জন। বন-বনভূমির জায়গায় কী না করা হয়েছে— শিল্পকারখানা, হাটবাজার, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কটেজ, ফার্ম, রিসোর্ট, বাড়িঘর। সব মিলিয়ে প্রায় ৪ লাখ একর বন-বনভূমি নিশ্চিহ্ন এবং নিশ্চিহ্ন কিন্তু এক দিনে বা রাতারাতি হয়নি; হচ্ছে দিনের পর দিন ধরে, সবার চোখের সামনেই।

নিজের ক্ষুদ্র লাভালাভের গণ্ডির বাইরে বেরোতে তখনই হয়তো উদ্যত হব আমরা, যখন প্রকৃতির আঙিনায় তার পা ফেলার মতো নিরাপদ জায়গাটুকুও আর অবশিষ্ট থাকবে না! আদালতের সাজাও এড়ানো যায় বইকি, প্রকৃতির প্রতিশোধের সামনে জারিজুরি কিছুই খাটবে না।

. লেখক :সাংবাদিক

ইত্তেফাক/এনএ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x