আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও ঐতিহাসিক সত্য উপস্থাপনে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও ঐতিহাসিক সত্য উপস্থাপনে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি
প্রতীকী ছবি

উত্তর আমেরিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এক ব্যতিক্রমী পরিবেশে উদযাপিত হলো এবারের 'মহান শহীদ দিবস' ও 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস'। 'একুশে ফেব্রুয়ারি' সারা বিশ্বে বসবাসকারী বাঙালি সমাজে বিশেষ গুরুত্ব নিয়ে উপস্থিত হয়। শত ব্যস্ততাকে পেছনে ফেলে বাঙালী সংস্কৃতি আর বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় ১৯৫২ সালের সংগ্রাম মুখর দিনগুলো নিয়ে সারা দুনিয়ার শহরে শহরে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা, সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হয়। দেশপ্রেমিক বাঙালী সমাজ বিনম্র চিত্তে ভাষা তথা বাঙালির সামাজিক, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় জীবন উৎসর্গকারী বীর শহীদদের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দিবসটি পালিত হয়, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী সহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগণ এ উপলক্ষে জাতির উদ্দেশ্যে বিশেষ বাণী দিয়ে থাকেন। বাংলা একাডেমি মাসব্যাপী বই মেলার আয়োজন করে। লেখক, কবি, সাহিত্যিক আর প্রকাশকরা এ সময়টির অপেক্ষায় সারা বছর প্রস্তুতি নেন। নতুন, পুরানো লেখক, বুদ্ধিজীবী আর সংস্কৃতিকর্মীদের সৃষ্টিশীলতায় ভাষা, সাহিত্য, রাজনীতি,ও অর্থনীতির গবেষণায় ঘটে নব সংযোজন। অতীতের সকল ধারাবাহিকতা আর ঐতিহ্যকে পেছনে ফেলে বিশ্বব্যাপী এবারের একুশে ফেব্রুয়ারি এক ভিন্ন আবহে উপস্থিত হলো।

কোভিড-১৯ এর ভয়াবহতা একুশের অনুষ্ঠানমালায় শারীরিক উপস্থিতিকে বাধাগ্রস্ত করলেও, ভার্চুয়াল অংশগ্রহণের আরম্ভরতায় উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিল একুশের সকল আয়োজন। প্রবাসের বাঙালি সমাজ আর প্রবাসের দুতাবাসগুলো নানা অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে দিবসটির গুরুত্ব আর মাহাত্ম্য তুলে ধরেছে। সময়ের তফাৎ এর কারণে বাংলাদেশে যেদিন 'একুশ' উদযাপিত হয়েছে কানাডাতে তার পরদিন ছিল 'একুশ' তথা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের দিন। ইথারীয় সংস্কৃতির অবারিত সুযোগ কে কাজে লাগিয়ে এবারের অনেকগুলো একুশের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ আমাকে নতুন অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ করেছে। 'একুশ' সম্পর্কে আমার ঐতিহাসিক তথ্য ভাণ্ডার নিয়ে নিদারুণ সংশয় জাগ্রত হয়েছে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বের ইতিহাস নিয়ে এতকাল যা জেনে এসেছিলাম-সবই কি তাহলে মিথ্যে ছিল?

বাংলাদেশে বিকৃত ইতিহাসের চর্চা নতুন নয়। ৭৫ পরবর্তীকালে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবেই ইতিহাস বিকৃতির সংস্কৃতি টি শুরু হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নামটি উঠিয়ে দিয়ে জিয়াকে স্বাধীনতার রূপকার হিসেবে প্রতিস্থাপন করা হয়। ১৯৭৭ সালের প্রহসনের গণভোটের আগে দেশবিরোধী পাকিস্তানি দোসর আর মেজর জিয়ার অনুসারীরা দেয়ালে দেয়ালে রঙিন পোষ্টার সেঁটে দেয়, যাতে সুন্দর হরফে লেখা ছিল, ১৯৭১ এ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করছেন " তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান!!" পরাজিত শক্তির পরিকল্পিত ইতিহাস বিকৃতির এই ধারাটি ১৯৯৬ সাল অবধি অব্যাহত থাকে।

এই দুই দশকে স্বাধিকার, মুক্তি সংগ্রাম আর বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চায় চরম বিপর্যয় ঘটে যায়। অনেক সত্যি, মিথ্যে হয়ে যায়। আবার অনেক মিথ্যেই, সত্যি হিসেবে মেনে নিতে হয়। মিথ্যে ইতিহাস কে ই সত্যি জেনে গড়ে উঠে একটি নতুন প্রজন্ম। ১৯৯৬ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে ঐতিহাসিক সত্য প্রতিস্থাপনের নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, ঐতিহাসিক সত্যের বিকৃতি রোধে দেশের সর্বোচ্চ আদালত ও নানা নির্দেশনা প্রদান করে। ১৯৭১ সালের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের সত্যিকে পুনরুদ্ধারে আন্তরিকতা থাকলেও ৭৫-৯৫ প্রজন্ম আজও বিভ্রান্তিমুক্ত নয়। স্কুল কলেজের পাঠক্রমে এখনো ৫২ থেকে ৭১ এর গৌরবগাঁথার পর্যাপ্ত সংযোজন ঘটেনি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জীবনাদর্শ যেখানে নৈতিকতা, ত্যাগ, মানবিকতা,সততা আর দেশপ্রেমের বড় শিক্ষা হতে পারে, শতাব্দীর সেই শ্রেষ্ঠ মহানায়কের জীবনালেখ্য এখনো কেনো সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয়নি - তা আমার বোধগম্য হয় না। সরিষার ভিতরে লুকিয়ে থাকা ভুতের ভয়ে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী দেশপ্রেমিক মানুষ সন্ত্রস্ত হয়।

দুই দশকের ইতিহাস বিকৃতি এখনো যখন সমাজের ক্যান্সার,সেই প্রেক্ষাপটে ভাষা আন্দোলনের নতুন ইতিহাসে আমি আজ বিভ্রান্ত।মহান একুশের অনুষ্ঠানে ভাষাসৈনিকদের নাম উচ্চারিত হয়নি, তমুদ্দন মজলিস, রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ, ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ্, অধ্যাপক আবুল কাশেম, আবুল কালাম শামসুদ্দিন কারও নামই আলোচিত হয় না। সৈয়দ মুজতবা আলী, কবি ফররুখ আহমদ এর মতো মানুষেরা লিখনির মাধ্যমে বাংলা ভাষার পক্ষে যে জাগরণ সৃষ্টি করেছিলেন, একথা বলতে সুধীজনেরা যেন লজ্জা পায়। ১৯৪৮ সালের ২৫ শে ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে সর্বপ্রথম যিনি বজ্রকন্ঠে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবী উত্থাপন করেছিলেন, সেই শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নামটিও অনুচ্চারিত থেকে যায়। 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি' খ্যাত সুলেখক, গবেষক, বুদ্ধিজীবী প্রগতির ধারক আবদুল গাফফার চৌধুরীর নামটি কোন আলোচনায়ই আসেনি। ১৯৪৯ সালের ২৪ শে মার্চ কার্জন হলে পাকিস্তানি গভর্নর জেনারেল উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে 'নো' 'নো' চিৎকারে যারা গর্জে উঠেছিলেন, এবারকার 'মহান শহীদ দিবস' ও 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' এর আলোচনায় সুধীজনদের বক্তব্যে সেই বীর বাঙালিদের বীরত্বগাঁথা নিয়ে স্মৃতিচারণের অনুপস্থিতিতে আমার মতো অনেকই আজ শঙ্কিত।

১৯৪৮ থেকে ১৯৫২, রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে অধিকার আদায়ের সংগ্রাম কে সংগঠিত করতে গিয়ে অনেক বীর বাঙালি নেতৃত্ব দিয়েছেন। আন্দোলনের চূড়ান্ত বিজয় অর্জনে ১৯৫২ সালের ৩১ শে জানুয়ারিতে গঠিত ' সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ' ছিল মাইলফলক। আবদুল মতিন, গাজীউল হক, আবুল কাশেম, আবদুস সামাদ আজাদ, তাজউদ্দীন আহমদ, আবদুল গফুর, অলি আহাদ, শামসুল হক চৌধুরী, কমরেড তোহায়া, শেখ মুজিবুর রহমান ও মাওলানা ভাসানীসহ ৪০ জনের সমন্বয়ে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সুযোগ্য ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব শ্রদ্ধার সংগে স্মরণীয়। আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও কৃতজ্ঞ চিত্তে তমদ্দুন মজলিস, রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ, পাকিস্তানের পার্লামেন্টে সর্বপ্রথম বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে প্রস্তাব উত্থাপনকারী শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তে ও ডক্টর মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ্সহ সকলের অবদান কে ই শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি এবারের শহীদ দিবসের আলোচনায় কিছু অতি উৎসাহী সুবিধাভোগী নব্য মুজিব প্রেমিক আমলা, কুটনীতিক আর ক্ষমতালোভী রাজনীতিকের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আলোচনায় ঐতিহাসিক সত্যকে অবজ্ঞা করার অপপ্রয়াস লক্ষণীয় ছিল, যা কোনভাবেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার ইতিহাস বিকৃতি রোধের পরিকল্পনার সংগে ইতিবাচক নয়।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালী জাগরণের অগ্রদূত। বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ আর বাঙালির অধিকার সংগ্রামের আলোচনায় হাজার বছরের ইতিহাসে তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। একটি জাতির অস্তিত্ব আর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে এমন নির্ভীক, ত্যাগী দেশ-প্রেমিক জাতিয়তাবাদী নেতা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতি আর বাংলাদেশের বিস্ময়কর গৌরব, পৃথিবীর শোষিত বঞ্চিত মানুষের আদর্শ আর পরবর্তী প্রজন্মের কাছে দেশপ্রেমের মহীরুহ। মহান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে ও রয়েছে তাঁর অসামান্য অবদান, পাকিস্তানী অপশাসনের রোষানলে পড়ে কারাগারে থেকেও ভাষা আন্দোলনে সাথে একাত্ম থেকেছেন, দশদিন আমরণ অনশন করেছেন। তিনিই প্রথম বাঙালি যিনি সর্ব প্রথম কোন আন্তর্জাতিক সভায় বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন, বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির গবেষণার পথ কে উন্মুক্ত করেছিলেন। অতি উৎসাহী, সুবিধাবাদী নব্য মুজিবপ্রেমীদের কারণে যদি এমন মহান নেতার জীবনালেখ্য বিতর্কিত হয়, পরবর্তী প্রজন্ম যদি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক সত্য অনুসন্ধানে ৭৫ পরবর্তীকালের মতো আবারও বিভ্রান্ত হয়, তাহলে এর দায়-ভার কে নেবে?

লেখক: কলামিস্ট, উন্নয়ন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x