জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতেই হবে

জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতেই হবে
ছবি: সংগৃহীত।

জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতেই হবে। ২০১৩ সালে হাইকোর্টের রায়ে নির্বাচন কমিশনে জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ বলে ঘোষিত। প্রায় সব র্শীষ নেতাই যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত। অনেকেই ইতোমধ্যেই বিচার-পর্ব শেষে ফাঁসিও কার্যকর করা হয়েছে। এখন দাবি উঠছে জামায়াতকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ ঘোষিত করতে হবে।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পরই জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় বাংলাদেশে। কিন্তু দেশেরে প্রথম ফৌজি প্রশাসক জিয়াউর রহমান তার প্রতিপত্তি বৃদ্ধির জন্যই জামায়াতকে ফের মাথাচাড়া দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী পাকিস্তানিদের ফরে শুরু হয় জেনারেল জিয়ার হাত ধরে। নিজের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা মেটাতে স্বাধীনতার শত্রুদের সঙ্গে হাত মেলান তিনি। ৭১-এ দেশের স্বাধীনতার শত্রুদের মন্ত্রী করতে জিয়া কুণ্ঠিত হননি। দেশের ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে লুণ্ঠন করতে পিছপা হননি তিনি।

জিয়ার মতোই সামরিক উত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলরে পর মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের প্রশ্রয় দিতে শুরু করণে হুসেন মুহম্মদ এরশাদও। আর জিয়ার স্ত্রী খালেদা জিয়া জামায়াতকে সঙ্গি করইে বাংলাদেশে সরকার গঠন করনে। মহান মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগকে অসম্মান করে পাকিস্তানপন্থী জামায়াতরাই বাংলাদেশেরে সর্বোচ্চ ক্ষমতা ভোগ করতে থাকে খালেদা জিয়ার কল্যানে।

বিএনপির সৌজন্যেই বাংলাদেশে জামায়াতের বাড়বাড়ন্ত। তাদরে ধৃষ্টতাও একসময় মারাত্মক আকার নেয়। ফাঁসিতে লটকানোর আগে ২০০৭ সালে বাংলাদেশেরে মাটিতে দাঁড়িয়েই মহান মুক্তিযোদ্ধাদরে অসম্মান প্রদর্শন করারও সাহস পেয়েছিলেন জামায়াতের মহাসচিব আলি আহসান মহম্মদ মুজাহিদ। মুক্তিযুদ্ধকে তিনি গৃহযুদ্ধ বলে কটাক্ষ করেন। বলেছিলেন, একাত্তররে কোনো যুদ্ধাপরাধীই নাকি নেই। অবশ্য বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে যুদ্ধাপরাধী প্রমাণ করে ফাঁসি দেওয়া হয়।

জিয়াউর রহমানরে কাছ থেকে রাজনৈতিক পুনর্বাসন পেয়ে উল্টো পাকিস্তানের হয়েই সাফাই গাইতে শুরু করে। ২০০৭ সালেই মুক্তিযুদ্ধকে গৃহযুদ্ধ বলে বর্ণনা করে জামায়াত বুঝিয়ে দেয় তাদের কাছে পাকিস্তান ও ইসলাম সার্থক। স্বাধীনতার এতো বছর পরে তারা দেশভাগের স্মৃতি ভুলতে পারছে না। তারা যে আজও স্বাধীনতার বিরোধী কথাও স্মরণ করে চলছে জামায়াতের মুরুব্বিরা।

মহান মুক্তিযুদ্ধকে কোনো দিনই সমর্থন করেনি জামায়াত। ভারতের সার্বিক সহযোগতিায় পাকিস্তানি গণহত্যার বিরুদ্ধে লড়াই করে লাভ করা দেশের স্বাধীনতাকে চিরকাল অসম্মান করেছে জামায়াতিরা। তাই একাত্তররে মহান মুক্তিযুদ্ধকে প্রকাশ্যে গৃহযুদ্ধ বলার সাহস পেয়েছিল বিএনপি আমলে। যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত মামলায় বিচারপতিরা বলেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি কোনো সম্মানই নেই জামায়াতিদের। দেশের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান নেই তাদরে। জামায়াত আমির গোলাম আজমরা ৩০ লক্ষ শহীদদের প্রতি এখনও শ্রদ্ধা জানাতে রাজি নয়। তাই আদালত পরামর্শ দিয়েছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী দল ও ব্যক্তিদের সরকারি, বেসরকারি এবং আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্ত সংগঠনরে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হোক। কোনো দিনও যাতে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি র্শীষ পদে বসতে না পারে সেটাই বলেছিলেন সরকারকে।

বিচারপতিরা তাদরে রায়ে বলেছিলেন, রাজাকার, আল-বদর, আল-শাম ও পিস কমিটির নামে বাংলাদেশেরে স্বাধীনতা বিরোধীদের মূল মদতদাতাই ছিলো জামায়াত। পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানিদের দখলদারি বজায় রাখতে আর্থসামাজিকই পাক-সেনাদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে বাঙালি নিধন যজ্ঞে হাত মেলায়। যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমরে নেতৃত্বে জামায়াত মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশেরে স্বীকৃতি বিরোধিতা করে প্রচার চালায়। পাকিস্তানের মতো জামায়াতের নেতারা আজও মুক্তিযুদ্ধে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জন্য ক্ষমা চায়নি। বরং তারা বলে চলেছে মুক্তি যুদ্ধ নাকি কোনো যুদ্ধই নয়। তাই যুদ্ধাপরাধীও নাকি নাই।

বাংলাদেশে বিরোধী কার্যকলাপরে জন্য ১৯৭১ সালেই নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় জামায়াত। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সেই নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পরই ফের মাথাচাড়া দিয়ে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি। ২৩ হাজার যুদ্ধাপরাধীকে মুক্তি দেন জিয়া। এদের মধ্যে ওনেকেরেই যুদ্ধাপরাধ আগেই প্রমাণিত। ১৯৭৮ সালে গোলামআজম পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। জিয়া ধর্মভিত্তিক রাজনীতি প্রবর্তন করে জামায়াতকে মাথা তুলে দাঁড়াতে সাহস যোগান।

এর আগে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের মাটিতে মৌলবাদীদের ধর্মীয় রাজনীতি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পাকিস্তান পন্থীরা আত্মগোপনে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু জিয়া তাদের পুনর্জীবন দান করে। বিএনপি আর সামরিক শাসকদের কাছ থেকে দু-দশকরেও বেশি সময় ধরে আর্থিক ও অন্যান্য সুবিধা পেয়ে বাংলাদেশের মাটিতেই ফুলে ফেঁপে ওঠে জামায়াতিরা। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে জামাত বিএনপির জোট সঙ্গি হয়ে সরকার চালাবার সময় আরও বেশি করে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হয়।

আর এই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে জামাত নিজেদের আধিপত্য মারাত্মক বিস্তার করে। ব্যাংক, বীমা কোম্পানি থেকে শুরু করে গণমাধ্যমের ব্যবসাতেও নিজেদের পরিধি বিস্তার করতে সক্ষম হয়। পাকিস্তানপন্থী এই দলটি তাদরে ক্যাডারদের এইসব সংস্থায় কর্মসংস্থানে যোগ করে দেয়। দেশে ও বিদেশে নিজেদেরে প্রভাব বাড়ে তাদের। ২০০৭-২০০৮ সালে নিয়ন্ত্রিত তদারকি সরকাররে আমলে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বহু শীর্ষ নেতা নেত্রী গ্রেফতার হলেও রহস্যজনকভাবে জামায়াতিরা ছাড়া পায়। পাকিস্তানিদের হাত থেকে নিজেদেরে মুক্তি করতে লক্ষ লক্ষ বাঙালি সেদিন জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন।

মহান স্বাধীনতার জন্য। তাদরে এই আত্মত্যাগরে বিরোধিতা করেও স্বাধীন দেশে বসে বহালতবিতয়েই ছিলেন জামাতিরা। এটা বাস্তব, জামাতিদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বেরেই চলেছিল জিয়া ও খালেদার আমলে। তাই স্বাধীনতা যোদ্ধাদের অসম্মান করার ধৃষ্টতা দেখাতে পেরেছিল জামাত নেতারা। পাকিস্তানিরা গণহত্যা করলেও বিন্দুমাত্র দুঃখ প্রকাশ করার প্রয়োজনও বোধ করেনি তারা।

ইসলামি মৌলবাদীর নামে পাকিস্তানি গোয়েন্দা বাহিনী ও ফৌজি প্রশাসকদের নজরদারিতে ১৯৭১ সালে বুদ্ধিজীবী, ছাত্র ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে শক্তি বিনাশ করার কাজে সবচেয়ে বড় ভূমিকায় জামাত। তথাকথতি অখণ্ড পাকিস্তানের স্বার্থেই জামায়াতের সহযোগী সংগঠন আল-বদর, রাজাকার, আল-শাম, পিস কমিটির সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। পূর্ব পাকিস্তানকে নিজেদেরে দখলে রাখতে জামাত ও তাদের সহযোগী সংগঠনকে অস্ত্র প্রশিক্ষণও দেয় পাক-সেনারা।

মুক্তিযুদ্ধের সময় শত শত মানুষ খুন হন জামায়াতের হাতে। নারীদের ইজ্জত লুন্ঠিত হয় তাদের ষড়যন্ত্রে। বহু হিন্দুকে গায়ের জোড়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়। জামায়াতের প্রথম সারির নেতা গোলাম আজম, আলি আহসান মহম্মদ মুজাহিদ, আবদুল কাদের মোল্লা, মহম্মদ কামরুজ্জামান-সহ অনেকেই যুদ্ধাপরাধের বিচারে অপরাধী প্রমাণিত। আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের শাস্তিও হয়েছে। ১৯৭১ সালে দেশেরে স্বাধীনতার পর গোলামআজমরে নাগরিকত্বও বাতিল করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু জেনারেল জিয়া বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডরে পর এদের জামাই আদরে দেশে ফিরিয়ে আনেন।

দেশের ফিরে এই মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদেরই অনেককেই স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ভূমিকায় দেখা যায়। গণহত্যায় মুখ্য ভূমিকা নেওয়া দুই ঘাতক বাংলাদেশেরে মন্ত্রীও হয়েছেন। এধরনরে ঘটনার বোধহয় বিশ্বে আর কোনও নজির নেই। তাই জামায়াতকে নির্মূল করাই এখন জরুরী। এটা ঠিক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শেষ হলে বহু জামাত নেতাকেই ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে হবে। আইন কাউকে ছেড়ে কথা বলবে না। কিন্তু এতেই নির্মূল হবেনা স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি। কারণ পুরনো নেতারা ফাঁসিতে ঝুললেও তরুণ প্রজন্মের হাতে জামায়াত একই পথে চলবে। চলতে থাকবে পাকিস্তান পন্থীদের ষড়যন্ত্র। জামাতের দেশ-বিরোধী আদর্শ নতুন নেতৃত্বের হাতেও অটুট থাকবে।

পাকিস্তানের কুখ্যাত সংস্থা আইএসআইয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিরোধী শক্তি মদত পাবে। মৌলবাদীদের কার্যকলাপ বাড়বে। সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চলবেই। বাংলাদেশে ইসলামি শাসন প্রত্যাবর্তনের নামে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি দেশের উন্নয়নে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যাবেই। কারণ এটাই জামায়াতের একমাত্র লক্ষ্য। একাত্তরের পরাজয়রে প্রতিশোধ নিতে আজও মরিয়া তারা।

ইত্তেফাক/এএইচপি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x