তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সামাজিক অধিকার

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সামাজিক অধিকার
ছবি: সংগৃহীত

আপনার-আমার আশপাশেই বসবাস করছে অসংখ্য তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী। প্রতি ক্ষেত্রে তাদের করা হচ্ছে লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত। এই সমাজ তাদের শিক্ষার অধিকার দেয়নি, চাকরি করার অধিকার দেয়নি এমনকি মানুষ হিসেবেও মূল্য দেয় না বরং প্রতিনিয়ত বাধ্য করা হচ্ছে সমাজ থেকে বের হওয়ার জন্য। তাহলে তারা কোথায় যাবে, কীভাবে বেঁচে থাকবে?

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না তারাও মানুষ, তাদেরও ক্ষুধা আছে এবং ভালোভাবে বাঁচার অধিকার আছে। কিন্তু আমরা তাদের সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করছি। তাদের নিয়ে প্রতিনিয়ত হাসি-তামাশা করে একঘর করে রাখছি। এত অপমান সহ্য করতে না পেরে আমাদের সমাজ থেকে বের হয়ে বেঁচে থাকার নতুন পথ খুঁজে নিচ্ছে। ১০ বা ১৫ জন মিলে তার মধ্যে একজনকে গুরু মেনে তার অধীনে থেকে বেঁচে থাকার নতুন কৌশল শিখে নিচ্ছে। জীবিকা হিসেবে বেছে নিচ্ছে ভিক্ষাবৃত্তি, যৌনকর্ম। এছাড়াও জড়াচ্ছে বিভিন্ন অপকর্মে। তারা প্রায়ই আমাদের ট্রেনে, বাসে, রাস্তায়, ১০ টাকা, ২০ টাকার জন্য বায়না ধরে। বলা যায়, একপ্রকার বাধ্য করেই টাকা নেয়। এতে আমরা অনেকেই বিরক্ত হয়ে থাকি। কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন, তাদের এই পথে আসার জন্য কারা বাধ্য করেছে? উত্তর খুঁজে পেলে আশা করছি কখনো আর বিরক্ত হবেন না।

সরকারি হিসেব মতে, দেশে হিজড়ার সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। কিন্তু বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার মতে প্রায় দেড় লাখ। এত বড় একটা জনগোষ্ঠীর জন্য নেই কোনো শিক্ষা কিংবা চাকরির ব্যবস্থা। অবশ্য এখন কোনো কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের শিক্ষা দিতে এগিয়ে আসছে। এছাড়াও আমাদের দেশের প্রত্যেক ধর্ম মতে হিজড়ারা কোনো পারিবারিক সূত্রে সম্পত্তি পাচ্ছে না। এ ব্যাপারে অনেক দিন থেকেই তারা আন্দোলন করে আসছে কিন্তু এখনো এ সমস্যার ঠিকভাবে সমাধান করতে পারেনি সরকার। তবে সরকারিভাবে কিছুসংখ্যক হিজড়াকে মাসিক ভাতা দেওয়া হয়। এবং তাদের জন্য বাড়ি নির্মাণ করে দিয়েছে সরকার। এটা একটা ভালো উদ্যোগ। কিন্তু তা নিতান্তই কম এবং সবাই এই ভাতা পাচ্ছে না। তাই এই ব্যাপারে সরকারের আরো ভালোভাবে দৃষ্টি দেওয়া উচিত বলে মনে করছি। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ সরকার হিজড়া জনগোষ্ঠীকে ‘হিজড়া লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছিল তা এখনো কার্যকর হয়নি, তা দ্রুত কার্যকর করা অতীব জরুরি।

কিছু দিন আগের একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। প্রায়ই হিজড়াদের সঙ্গে দেখা হলে কথা বলার সুযোগ হয় আমাদের। সেই সূত্র ধরেই কিছুদিন আগে এক হিজড়ার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর কথা বলার চেষ্টা করলাম। আমি তাকে আপু বলে সম্বোধন করলাম। তাকে কফি খাওয়ার অফার করলাম। প্রথমে সে রাজি না হলেও কিছুক্ষণ পরে মত দিলেন। তাকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে যাই। কিন্তু রেস্টুরেন্টের ভেতর প্রবেশ করার সময় একজন ছেলে আমাকে থামিয়ে বলল, আপু আপনি ট্রেন্সজেন্ডার নিয়ে ভেতরে যেতে পারবেন না। আমি বললাম কেন? ছেলেটি বলল, এতে আমাদের অন্য গেস্টদের সমস্যা হবে। তাই তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। আমি এই কথা শুনে বিনা প্রতিবাদেই চলে আসলাম। পাশেই আরেকটা রেস্টুরেন্ট ছিল সেখানে গেলাম। সেখানে প্রবেশ করতে কোনো অসুবিধা হলো না। কিন্তু আমরা দুজন যখন ভেতরে যাই, তখন সব মানুষ আমাদের দিকে এমনভাবে তাকিয়েছিল যেন আমরা ভিনগ্রহের প্রাণী। সব কিছু উপেক্ষা করে আমরা দুজন বসে কফি অর্ডার দিলাম। আমাদের পাশেই এক আপু বসে ছিল তার সঙ্গে একটা বাচ্চা ছিল। কেন জানি না বাচ্চাটা বারবার আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পরে বাচ্চার মা আমাকে বলল, আপনি এই হিজড়া নিয়ে রেস্টুরেন্টে আসছেন কেন? দেখছেন না বাচ্চা ভয় পাচ্ছে। আমি তার কথা শুনে নির্বাক হয়ে মনে মনে বললাম, হে মানুষ নামের অমানুষ তোমরা কবে মানুষ হবে?

তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর মধ্যেও অজানা অনেক সুপ্ত প্রতিভা রয়েছে। সরকার উদ্যোগ নিলে তাদেরকে জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। আর এই ব্যাপারে আমাদেরও সহযোগিতা করতে হবে। কারণ আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনই পারে তৃতীয় লিঙ্গের ভালোভাবে বাঁচার একটি সুন্দর পরিবেশ দিতে। আমরা কি পারি না তাদের মানুষ হিসেবে গ্রহণ করে আপন করে নিতে?

লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x