অনেক, অনেক এগিয়েছে দেশ

অনেক, অনেক এগিয়েছে দেশ
প্রতীকী ছবি

এখন ফাল্গুনের মাঝামাঝি সময়। ইংরেজি মার্চ মাস। আমাদের স্বাধীনতার পরিপূর্ণতা প্রাপ্তির মাস। এবার অবশ্য ভিন্ন ঘটনা। আগামী ২৬ মার্চ যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে পালিত হবে স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি দিবস। পাশাপাশি চলছে মুজিব শতবর্ষের নানা অনুষ্ঠান। ভাবতে কিছুটা অবাকই লাগে, স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। একটা জাতির জীবনে ৫০ বছর কিছুই নয়। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন।

আমরা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে রক্তাক্ত যুদ্ধ করে। কত স্মৃতি, কত কথা মুক্তিযোদ্ধাদের মনে, সব বাঙালির মনে। কোথায় শুরু করেছিলাম, আর আজ আমরা কোথায়? স্বাধীনতার আগে বর্তমান পশ্চিম পাকিস্তানি এবং তাদের এদেশীয় দোসররা বলত স্বাধীন হলে তোমরা উপবাস করে মরবে। কী আছে তোমাদের—দুটো পাট, কিছু চা আর কিছু চামড়া ছাড়া? এই দিয়ে ৭ কোটি বাঙালির ভাত-কাপড় জোগাবে তোমরা! কী মনে হয় আজ? ৫০ বছর পর আমাদের অবস্থান কোথায়?

স্বাধীনতার মাসের পূর্বমুহূর্তেই জাতিসংঘের ‘কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি’ (সিডিজি) আমাদের ‘এলডিসি’র তালিকা থেকে বের হয়ে যাওয়ার সুপারিশ করেছে। কত বড় অর্জন, ভাবা যায়! খাতির করে তারা এ সুপারিশ করেনি। ‘স্বল্পোন্নত’ দেশ থেকে উন্নয়নশীল নিম্ন-মধ্যবিত্ত দেশ হতে হলে তিনটি শর্ত পালন করতে হয়। এই তিনটি শর্ত হচ্ছে মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা। এসব সূচকে অব্যাহতভাবে উন্নতি করলেই স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়া যায়। বলা বাহুল্য, আমরা সফলতার সঙ্গে সেই তালিকা থেকে বের হয়ে এসেছি। মাথাপিছু আয় আমাদের এখন কত?

২০১৯-২০ অর্থবছরে আমাদের মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৭৯ ডলার। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা হবে ২ হাজার ৩২৬ ডলার। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন কত? এই মুহূর্তে তা ৪৪-৪৫ বিলিয়ন ডলার (১ বিলিয়ন সমান শতকোটি)। ডলার আমাদের অনেক বেশি। ৮-৯ মাসের আমদানির সমপরিমাণ ডলার এখন আমাদের রিজার্ভে। ১৯৭২-৭৩ সালে আমাদের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ১২৯ ডলার। তখন ২০-২৫টি ডলারের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রীতিমতো তদবির করতে হতো। আজ ৪-৫-১০ হাজার ডলারের জন্যও তদবির করতে হয় না। ৫০ বছর আগে আমাদের বাজেটের আকার ছিল মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকা। সেই স্থলে ২০২০-২১ অর্থবছরে আমাদের বাজেটের আকার হচ্ছে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। উন্নয়ন বাজেটের আকারই হচ্ছে ২ লাখ ১৫ হাজার ৪৩ কোটি টাকা। নতুন এক সম্পদ এসেছে আমাদের অনুকূলে। বিশ্বের প্রায় ১৪০-১৫০টি দেশে এক থেকে দেড় কোটি বাঙালি আজ কাজ করে খান। তারা বছরে বিশাল পরিমাণ ডলার দেশে পাঠান।

২০২০ সালে তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ২১ মিলিয়ন ডলারের ওপরে। এই পাঠানো অর্থ গ্রামবাংলার অর্থনীতিকে সচল ও সবল করে রেখেছে। রেমিট্যান্স প্রাপকেরা তাদের বাড়িঘর পাকা করেছে। পয়োব্যবস্থা স্বাস্থ্যসম্মত করেছে। পানীয় জলের ব্যবস্থা করেছে। কৃষির যান্ত্রিকীকরণে অর্থের জোগান দিচ্ছে। সেচের জল সরবরাহে অর্থের জোগান দিচ্ছে তারা। এর ফলে গ্রামের চেহারা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। ৫০ বছর আগের গ্রাম আর আজকের গ্রাম এক নয়। ঘরে ঘরে বিদ্যুত্। কুপিবাতি বিলীন হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিদ্যুত্ উত্পাদনের ক্ষমতা আমাদের ছিল ২৪ হাজার মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ আমাদের এখন উদ্বৃত্ত।

৫০ বছরে চালের উৎপাদন চার গুণ বেড়েছে। কিছু গম অবশ্য আমদানি করতে হয়। মাছে বাংলাদেশ বিপ্লব সাধন করেছে। শাকসবজি, মাছ-মাংস, ডিম এবং ফলমূল এখন প্রচুর। আগে ফল ছিল রোগীদের খাবার। আজ বাজারে বাজারে ফলে ফলে সয়লাব। মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তিত হয়েছে। স্বাধীনতার পরপর কেউ আটার রুটি খেতে চাইত না। এখন সকালের নাশতা মানেই আটার রুটি। অনেকে রাতেও আটার রুটি খায়। চা আমরা রপ্তানি করতাম। এখন তা আমদানি করতে হয়। কারণ চা খায় এখন সবাই। শ্রমজীবী মানুষ থেকে মধ্যবিত্ত—সবাই এখন চা সেবন করে। শুধু চা কেন, কফিও এখন জনপ্রিয় পানীয়। মানুষ মোটা চাল খেতে চায় না। চিকন চালের চাহিদা বেশি। গ্রামাঞ্চলে বহু পেশা ও জীবিকা উধাও হয়েছে। এর স্থলে নতুন পেশা ও জীবিকার জন্ম হয়েছে। আগে আমরা কৃষক, কামার, কুমার, তাঁতি ও জেলেদের কথা বলে রাজনীতি করতাম।

এখন এসব পেশা মরণোন্মুখ। জন্ম নিচ্ছে নতুন নতুন পেশা। সারা দেশে পরিবহন ও যাতায়াত-কাঠামোর বিশাল পরিবর্তন হয়েছে। বরিশাল অঞ্চলে লিফটসহ পাঁচতলা স্টিমার চলে। এসি বাস সারা দেশে জনপ্রিয়। ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গ, চট্টগ্রাম ও দক্ষিণবঙ্গে এখন সহজেই চলাচল করা যায়। ঢাকায় আগে উত্তরবঙ্গের কোনো লোক ছিল না। আজ বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবীর টাকা গ্রামে যাচ্ছে। গ্রামে ‘ক্যাশের’ সরবরাহ বাড়ছে। বাজার, কেনা-বেচার এখন রমরমা অবস্থা। গ্রামাঞ্চলের বাজারে এখন সবকিছু পাওয়া যায়। ঢাকায় বাজার করার জন্য আসার কোনো দরকার পড়ে না। এখন উপজেলার বাজার বড় বড় রাস্তার পাশে। আগে ‘থানা’ পর্যায়ের বাজার ছিল নদী ঘেঁষে। শত শত নৌকায় মাল পরিবাহিত হতো। আজ ৫০ বছর পর বহু অঞ্চলে নৌকা নেই, মাঝি নেই—কারণ নদী নেই। ফলে আবার জেলেও নেই। এখানে ব্যাবসায়িক জগতে বিশাল পরিবর্তন হয়েছে।

পুরোনো ‘জাত ব্যবসায়ীদের’ পাশাপাশি নতুন নতুন উদ্যোক্তারা কাজে নেমেছে। গ্রামের বাজারে এখন স্বর্ণের দোকান প্রচুর। মাল এখন তারা ঢাকা থেকে নেয় না। ঢাকার পাইকাররা মাল গ্রামে গ্রামে পৌঁছে দেয়। ‘ট্রেড ক্রেডিটে’র ব্যবস্থা দূর হয়েছে। যোগাযোগ, টাকা পরিশোধ হয় মোবাইলে মোবাইলে। গ্রামে ‘এজেন্ট ব্যাংকিং’ চালু হয়েছে। ‘বিকাশ’ ব্যবস্থা বেশ দৃঢ়। ঢাকার আশপাশ অঞ্চলের লোকেরা ঢাকায় চিকিত্সা-বাজার করে দিনে দিনে বাড়ি ফিরে যেতে পারে। ৫০ বছরে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দারিদ্র্য দূরীকরণে। ছোটবেলায় আমরা গ্রামাঞ্চলে দেখেছি ভিখারিদের উপস্থিতি। মানুষের খাবার ছিল না। মানুষের কাজ ছিল না। গরিব মানুষ ধনীদের বাড়িতে বাড়িতে খাবারের জন্য যেত। অভাব-অনটন লেগেই ছিল। এই যে একসময়—ফাল্গুন-চৈত্র মাস, বৈশাখ মাস ছিল অভাবের মাস। আবার ছিল কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাস। মানুষের অভাব-অনটন ও দুঃখের কোনো সীমা ছিল না। ৮০-৮৫ শতাংশ লোকই বসবাস করত দারিদ্র্যসীমার নিচে। উত্তরবঙ্গে ‘মঙ্গা’ ছিল একটা নিয়মিত ব্যাপার। ‘মঙ্গা’ মানে যেখানে ভিক্ষা করেও দুই মুঠো চাল-ভাত পাওয়া যায় না। উপসে-বেমারে কত লোক যে মারা যেত তার হিসাব কে রাখে। মানুষ দুই-চার পাঁচ টাকার লেনদেনের মধ্যেই সীমিত ছিল। আজ? আজ কি দেশে কেউ না খেয়ে মারা যায়?

এই এত বড় একটা সংকট গেল ২০২০ সালে—‘করোনা-১৯’-এর সংকট। মানুষের কাজ নেই। মিল-ফ্যাক্টরি বন্ধ। অফিস-আদালত বন্ধ। মানুষ গৃহবন্দি। এই অবস্থাতেও মানুষ না খেয়ে মারা যায়নি। এটা একটা বড় অর্জন আমাদের। এখন মানুষের গায়ে জামা-গেঞ্জি আছে। পায়ে জুতা আছে। অনেকের বাড়িঘর পাকা হয়েছে। সরকার গরিবদের জন্য ঘরবাড়ি বানিয়ে দিচ্ছে। লাখ লাখ লোক সামাজিক নিরাপত্তার অধীনে মাসিক ভাতা পাচ্ছে। সরকার খোলা বাজারি নীতির অধীনে প্রয়োজনে ভোগ্যপণ্য সরবরাহ করছে।

ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, আশুলিয়া, জয়দেবপুর ও চট্টগ্রামের তৈরি পোশাকশিল্পে কমপক্ষে ৪০-৫০ লাখ শ্রমিক কাজ করছে। এদের অধিকাংশই মহিলা। এই শ্রমিকদের ওপর ভর করে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট শিল্প-দোকান। ৫০ বছরে অর্থনৈতিক কাঠামোর বিরাট পরিবর্তন হয়েছে। কৃষি এখন আর প্রধান অবদানকারী নয়। জিডিপিতে প্রধান খাত হচ্ছে এখন সেবা খাত। তারপর শিল্প। কৃষির স্থান অনেক নিচে। চা, চামড়া, পাট ইত্যাদি রপ্তানির স্থলে জায়গা করে নিয়েছে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত দ্রব্য, ওষুধপত্র ইত্যাদি। ‘রেমিট্যান্স খাত’ বলে একটা বড় খাতের জন্ম হয়েছে। এটা জনশক্তি রপ্তানি খাত। এখন বিশাল এক খাত। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ হচ্ছে। ছোট ছোট উদ্যোগের সংখ্যা বাড়ছে। ৫০-৬০টি ব্যাংক, ৩০-৪০টি অ-ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও শতাধিক বিমা কোম্পানিতে হাজার হাজার শিক্ষিত ছেলেমেয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এতত্সত্ত্বেও আমরা কি বলতে পারি দারিদ্র্য পুরোপুরি দূর হয়েছে? না তা বলা যাবে না। তবে বর্তমান সরকারের আমলে এই ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য এসেছে। বাংলাদেশের অর্জন আজ সর্বত্র স্বীকৃত। আমরা উন্নয়নের রোলমডেল। বাংলাদেশ সম্মান ও মর্যাদায় এক নতুন উচ্চতায় আসীন আজ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিরলস প্রচেষ্টা, দূরদর্শী ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে তা সম্ভব হয়েছে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x