সমতার ক্ষেত্রে আরো অগ্রগতি প্রয়োজন

সমতার ক্ষেত্রে আরো অগ্রগতি প্রয়োজন
ছবি: প্রতীকী

আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের নারীসমাজকে আমরা জানাই শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। এই বত্সরের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য হইল ‘নারীর সমতা সকলের প্রগতি’। নারী দিবসের এই প্রতিপাদ্য নির্ধারণে বারংবার সমতার বিষয়টি ঘুরিয়া ফিরিয়া আসিতেছে।

২০১৬ সালে এই দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল ‘সমতার জন্য অঙ্গীকার’। কিন্তু সেই অঙ্গীকার আমরা কতটা রক্ষা করিতে পারিয়াছি? এমনকি গত বত্সরের প্রতিপাদ্যেও সমতার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়—‘প্রজন্ম হউক সমতার, সকল নারীর অধিকার’। সত্যি বর্তমান বিশ্বে সমাজ ও রাষ্ট্রের শীর্ষপদ হইতে সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গে সর্বত্র নারীদের সদর্প বিচরণের দৃষ্টান্ত থাকিলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে নারীর বৈষম্যের শিকার হওয়ার দৃষ্টান্ত কম নহে। নারীকে এইভাবে বঞ্চিত-লাঞ্ছিত রাখিয়া মানবতা ও সভ্যতার উন্নয়ন নিষ্ফল হইতে বাধ্য।

উল্লেখ্য, নারী দিবসটি এক শতাব্দী-প্রাচীন একটি আন্তর্জাতিক দিবস। এই দিবসটি পালনের পটভূমি হইতেছে এই দিনে আমেরিকায় ঘটিয়া যাওয়া একটি আন্দোলন। ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ নিউ ইয়র্কের সুতা কারখানায় কর্মরত নারী শ্রমিকরা বেতন-বৈষম্য, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা আর কাজের বিরূপ পরিবেশের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামিতে বাধ্য হন। কিন্তু তাহাদের উপর কারখানা মালিক ও তাহাদের মদতপুষ্ট প্রশাসন দমন-নিপীড়ন চালায়। ইহার প্রায় অর্ধশতাব্দী পর ১৯০৮ সালে জার্মানিতে দিবসটি স্মরণে প্রথম নারী সম্মেলন ও ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হইতে এই দিবস পালনের প্রস্তাব করা হয়, যাহা কার্যকর হয় ১৯১৪ সাল হইতে।

আর ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘের মাধ্যমে দিবসটি আরো ব্যাপকভাবে পালিত হইয়া আসিতেছে। কিন্তু এই দিবস এত বত্সর ধরিয়া পালন করা সত্ত্বেও নারী অধিকার ও মুক্তি কতখানি অর্জিত হইয়াছে? ইতিমধ্যে নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করা হইয়াছে। তাহার পরও কি দেশে ধর্ষণ, অ্যাসিড নিক্ষেপ, যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা ইত্যাদি বন্ধ হইয়াছে? এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সমাজের ব্যর্থতার পাল্লা বরং দিন দিন বাড়িতেছে। পথে-ঘাটে, পরিবহন ও কর্মক্ষেত্রে তো বটে, ঘরের ভিতরেও নারীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা আজ বিঘ্নিত হইতেছে।

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন সূচকে আমাদের নারী সমাজের রহিয়াছে বিরাট ভূমিকা। এই দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হইল গার্মেন্ট বা তৈরি পোশাক রপ্তানি। এই খাতে নারীর ভূমিকাই সবচাইতে অধিক। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ক্ষেত্রে নারীর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হইয়াছে। লিঙ্গসমতা সূচকে এই দেশের নারীদের অবস্থান এখন পার্শ্ববর্তী ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের নারীদের তুলনায় উন্নত হইয়াছে।

কিন্তু নারীর অধিকারের সম্পূর্ণ সমতা এখনো আসে নাই। চাকরির ক্ষেত্রে নারী এখনো সমান সুযোগ-সুবিধা হইতে বঞ্চিত। নিম্ন-আয়ের শ্রমজীবী নারী আজও পুরুষের চাইতে কম মজুরি লাভ করিতেছেন। স্থানীয় সরকারের পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়নের চেষ্টা আজও তেমন ফলপ্রসূ হইতেছে না। জাতীয় রাজনীতিতেও নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়ে নাই। নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় নারী আজও উপেক্ষিত।

শিক্ষার সকল পর্যায়ে নারীরা আজ পুরুষের সমান মেধার পরিচয় দিতেছেন বটে, কিন্তু তাহার পরও নারীর সম-অধিকারের বিষয়টি গুরুত্ব লাভ করিতেছে না। নারীর এই সম-অধিকারের সহিত সমগ্র সমাজের উন্নয়ন ও অগ্রগতি নির্ভরশীল। মূলত নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিশ্বে সর্বজনীন প্রগতি লাভ করা সম্ভব। নারী-পুরুষের সমতা অর্জনে পশ্চাত্মুখী দৃষ্টিভঙ্গি এক বিরাট বাধা। এই বাধার প্রাচীর ভাঙিতে হইবে।

বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী যখন আমরা পালন করিতে যাইতেছি, তখনো নারী-পুরুষের সমতা অর্জিত হইবে না, তাহা মানিয়া লওয়া কঠিন। অতএব, নারীর প্রতি সকল রকম বৈষম্য ও অন্যায়-অবিচারের অবসান ঘটাইয়া গড়িয়া তুলিতে হইবে একটি সুখী, সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও সমতার বিশ্ব।

ইত্তেফাক/এএইচপি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x