দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে ‘আলাদা করে’ নারী দিবসের প্রয়োজন হবে না

দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে ‘আলাদা করে’ নারী দিবসের প্রয়োজন হবে না
ফাইল ছবি

আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। প্রতিবারের মতো এবারও এই দিবসটি অনেক জাঁকজমকভাবে পালিত হচ্ছে। অনেক বিপণী বিতানে বিশেষভাবে ছাড়ের আয়োজন করা হয়েছে তাদের গ্রাহকদের জন্য। অনেক রেস্তোরাঁতেও রয়েছে বিশেষ আয়োজন। বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি প্ৰতিষ্ঠানগুলো, মাসব্যাপী নানাবিধ আয়োজনের মাধ্যমে সকলকে জানাতে সক্ষম হবে- নারী দিবস উপলক্ষে তাদের সচেতনতার মাত্রা কতটা উচ্চ পর্যায়ে ছিল। প্রতিবছর তারা একইভাবেই অনেক উৎসাহের মাধ্যমে এই দিবসটিকে উদযাপন করে।

কিন্তু এই উদযাপনের মধ্যে কতটুকু প্রাধান্য পায় নারী এবং পুরুষের সমান অধিকারের কথা? কেন নারী দিবসে নারীদের নিয়ে এতো আয়োজন করা হয়? কেন সেখানে সেই সব পুরুষদেরও সম্মাননা দেওয়া হয় না, যারা নারীকে প্রকৃতপক্ষে নারী এবং সমাজের শক্তিশালী একটি অংশ হিসেবে মনে প্রাণে মেনে নিতে সক্ষম হয়? যারা প্রকৃতপক্ষে মনে করে যেকোনো দিবস উদযাপনের মাধ্যমে নারীশক্তিকে সীমাবদ্ধ করা যায় না। কেন সন্ধান করা হয় না সে সমস্ত পুরুষদের যারা তাদের প্রকৃত জীবনে নারীশক্তিকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের আমরা সমাজের সামনে তুলে ধরে গোটা সমাজের জন্য একটা দৃষ্টান্তের ব্যবস্থা করতে পারি। এটা গেলো সামাজিক পর্যায়ে আমার বিবেচনা করার মিনতি।

এখন ধরা যাক আমাদের ঘরের কথা। আজকাল অনেক সুযোগ্য পুরুষেরা তাদের অর্ধাঙ্গিনীকে অথবা গর্ভধারিণী মাকে অথবা তাদের বোনকে অথবা তাদের কন্যা সন্তানদের উদ্দেশ্য করে সামাজিক মাধ্যমগুলোতে অনেক আবেগী বক্তব্য রাখেন। কিন্তু কেন এই এক দিনের জন্য সকল ভালোবাসা বরাদ্দ ? কেন জীবনের প্রতিটা দিনই এমন হয় না? আর এতো উপলব্ধিরই বা দরকার কি? কি দরকার বারবার মনে করিয়ে দেওয়ার যে, নারী তুমি সব পারো। একটা সাধারণ মানুষ যা করতে পারে, নারী হিসেবে তার বিপরীত কিছু কেন হতে যাবে? কোনো পুরুষ যখন তার সংসারের জন্য উপার্জন করে তখন তাকে ধন্যবাদ জানাই? তাহলে একজন নারীর ক্ষেত্রে এটা হবে কেন? কেন আমরা সেই নারীকে তার নিজের কাজের জন্য তাকেই অনুপ্রেরণা দিতে যাবো? আমি অনুপ্রেরণা দেবার বিপক্ষে না? কিন্তু দিতে হলে পরিবারের প্রতিটি সদস্যই এই অনুপ্রেরণা পাবার যোগ্য। সেটা পুরুষ হতে পারে আবার নারীও হতে পারে।

প্রতিটি নারীই তাদের ঘরের সকল সদস্যের দেখাশুনা করার পরও বাইরের কোনো না কোনো কাজ সম্পন্ন করে থাকেন। সেটা হতে পারে বাজার করা, কোনো সদস্যকে চিকিৎসা করতে নিয়ে যাওয়া, আবার সন্তানদের পড়াশুনায় সাহায্য করা। আবার কেউ কেউ বাইরে কাজ করে পরিবারের আর্থিক সহায়তাও করে থাকেন। তাহলে এখন ভেবে দেখুন তো, কোন দিক থেকে নারীকে আপনার দুর্বল মনে হয় যে, পুরুষ হিসেবে আপনি তাকে তার নিজস্ব প্রতিদিনকার কাজের জন্য তাকে অনুপ্রেরণা দেবেন ? আপনার কি তাকে শারীরিকভাবে দুর্বল মনে হয়? তাহলে এবার আরও একটু ভেবে দেখুন, যে শরীর তার নিজের মধ্যে আরও একটি প্রাণ ধারণ করার ক্ষমতা রাখে তা কিভাবে এতো দুর্বল হয়? সেতো বরং আপনার থেকে বেশি শক্তিশালী। তবে এতটা সুবিচার না করতে পারলেও এতটুকু মেনে নিতে কষ্ট কেন হবে, যে নারী কোনো প্রাণী নয় বা আপনার ভোগের বা অধিকার প্রয়োগের বস্তুও নয় যে আপনি যখন ইচ্ছা তাকে সম্মান দেবেন আবার আপনার ইচ্ছার পুতুল করে তাকে ঘরে তুলে রেখে দেবেন।

যেদিন নারীকে আপনার সমতুল্য মনে হবে, অফিসে যখন একজন নারীর পদোন্নতিকে কোনো নারীর পদোন্নতি মনে না করে একজন সহকর্মীর পদোন্নতি হিসেবে মেনে নিতে শিখবেন, যেদিন আপনার সহধর্মীনির অথবা আপনার বোনের বাইরে কাজে যাবার ক্ষেত্রে আপনার অনুমতির প্রয়োজন হবে না, সেইদিন থেকে আর এই নারী দিবস উদযাপনের দরকার হবে না। আমরা এই দিনটিকে তখন অন্য কোনোভাবে উদযাপন করতে সক্ষম হবো।

ইত্তেফাক/ইউবি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x