বিশ্বাস ও বোঝাপড়ার ওপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

বিশ্বাস ও বোঝাপড়ার ওপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক
প্রতীকী ছবি।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যেকার উষ্ণ সম্পর্কের মূলে রয়েছে বিশ্বাস ও পারস্পরিক সমঝোতা। 'প্রতিবেশীই প্রথম', ভারতের এই নীতির কারণে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। তবুও বাংলাদেশের কিছু মানুষ ভারতের উদ্দেশ্য নিয়ে সর্বদাই সন্দেহে ভোগেন।

এক মতামতে এসব নিয়ে আলোচনা করেন অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো জয়িতা ভট্টাচার্য। তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বীজ রোপিত হয় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে। এসময় শুধু শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েই ক্ষান্ত ছিল না ভারত, বরং মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রণাঙ্গনেও লড়েছে ভারতীয় সেনারা।

পাশাপাশি, যুদ্ধ পরবর্তী দেশ পুনর্গঠনে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সহায়তা দেয় ভারত। ১৯৭২ সালের মার্চে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিজের প্রথম বাংলাদেশ সফরে স্পষ্ট করে বলেন, ভারতের উদ্দেশ্য শুধুই বাংলাদেশকে সহায়তা করা। তিনি আরও বলেন, দুইটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে সমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বের সূচনা হচ্ছে।

পরের চার দশকে এই সম্পর্ক নানা পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের শাসনকালে (১৯৭২-১৯৭৫) এই সম্পর্ক ছিল হৃদ্যতাপূর্ণ। পরে জেনারেল জিয়াউর রহমারের সময়ে (১৯৭৫-১৯৮১) এই সম্পর্ক রূপান্তরিত হয় অবিশ্বাসে। এই অবিশ্বাস ও সন্দেহ এরশাদের আমল (১৯৮২-১৯৯০) এবং বেগম খালেদা জিয়ার সময়েও (১৯৯১-১৯৯৫ এবং ২০০১-২০০৬) বহাল থাকে।

দ্বিপক্ষীয় বন্ধুত্ব উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ ও ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর। এই সময়গুলোতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। গঙ্গা পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ১৯৯৬ সালে। এছাড়া আন্তর্জাতিক আদালতে সমুদ্রসীমা বিষয়ে বিজয় লাভ করে বাংলাদেশ। ফলে ইন্ডিয়া ১৯.৪৬৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয় ভারত।

প্রতিবেশী হওয়ার কারণে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অনেক মিল আছে। ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা, সংস্কৃতি, নদী ইত্যাদিতে এ দু'দেশের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই মিলগুলো শক্তি জোগায় আবার নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি করে। এগুলো হচ্ছে, পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য ইস্যু, অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান ইত্যাদি। দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার জন্য ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৫০ এরও বেশি প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারিত্ব আছে নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জ্বালানি, বিজ্ঞান ইত্যাদি ক্ষেত্রে। দুই দেশের চিন্তাভাবনা বিনিময়ের জন্য এগুলোই প্রধান প্ল্যাটফর্ম।

বাংলাদেশের চাহিদার ক্ষেত্রগুলোতে ভারত মনোযোগী হয়েছে। যেমন সীমান্ত হত্যা কমিয়ে আনতে নন লেথাল অস্ত্র দেওয়া হচ্ছে বিএসএফকে। এছাড়া বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে বিভিন্ন বাংলাদেশি পণ্যকে ভারতের বাজারে কর মুক্ত সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতামত ভারত যথেষ্ট সতর্কতার সাথে নিয়েছে। বাংলাদেশের সম্মতি ছাড়া কোনো চুক্তি চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। এমনকি ১৯৭১ সালে স্বাক্ষরিত ২৫ বছর মেয়াদী মৈত্রী চুক্তিও ১৯৯৭ সালে মেয়াদ শেষে রিনিউ করেনি ভারত, কারণ বাংলাদেশ এটা রিনিউ করতে আগ্রহী ছিল না।

বাংলাদেশের বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার না থাকলে হয়তো এই দ্বিপক্ষীয় বন্ধুত্ব এই পর্যায়ে পৌঁছাতই না। তারা ভারতের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষার গুরুত্ব বোঝেন। বিশেষ একটা বিষয়ে বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানাতেই হবে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশের ভেতরে আস্তানা গড়ে তুলেছিল। বাংলাদেশ সরকার এদের নির্মূল করায় ভারতের ঐ অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদ কমে এসেছে।

ইত্তেফাক/এসএ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x