সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের সম্পর্ক

সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের সম্পর্ক
প্রতীকী ছবি

একটি সন্তান বাবা-মায়ের জন্য সৃষ্টিকর্তার দেওয়া সেরা উপহার। সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের মধ্যকার সম্পর্কের মতো গভীর ও বিশ্বস্ত দ্বিতীয়টি হতে পারে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের সন্তানরা অনেক বেশিই এগিয়ে আছে সব দিক থেকে। ফলে তাদের সঙ্গে বাবা-মায়েদের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে রীতিমতো বেগ পেতে হয় বাবা-মাকে।

বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালের সময়টাতে তাদের মনোজগতে দোলা দেয় নানান রকম ভালো লাগা, মন্দ লাগা, দুঃখবোধ। শৈশবের ও যৌবনের মাঝামাঝি এই সময়টাতে দ্রুত পরিবর্তনশীল বাড়ন্ত সময় হচ্ছে বয়ঃসন্ধিকাল। বাবা-মায়ের উচিত সেই রকম সময়টাকে নিজের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে তাদের প্রতি সেই আচরণ করা। নিজেদের যে অপূর্ণতা মনের মাঝে হাহাকারের বিষয় হয়ে আছে, তা যেন নিজ সন্তানের মনেও লেগে না থাকে। মনে রাখতে হবে, একটি অপূর্ণতা জন্ম দিতে পারে একটি খারাপ কাজের। কারণ এই সময়টাতেই কিন্তু তারা মানসিকভাবে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে। ভালো-খারাপ বিচারের সেই জ্ঞানটুকুও তখন লোপ পায়।

যুগের বিবর্তনকে মেনে নেওয়া আর মানিয়ে নেওয়ার বিকল্প আর কিছুই হতে পারে না। আমাদের দেশের আবহাওয়া অনুযায়ী সাধারণত ১৩ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে যৌবনের প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হয়। এই সময়টাতে হরমোনের কারণে তাদের মধ্যে আকস্মিক পরিবর্তন আসে দেহ ও মনে।

এ সময় তাদের মধ্যে আবেগ কাজ করে ব্যাপকভাবে। এ ক্ষতিকর আবেগ নিয়ন্ত্রণের কৌশল তাদের জানা থাকে না। এ সময়ে সঠিকভাবে তাদের সঙ্গে আচরণ না করার ফলে তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা দিতে পারে। কারণ কীভাবে ভালো আবেগের চর্চা করতে হয়, তা তাদের জানা থাকে না। এ সময় বাবা-মায়ের সান্নিধ্যে থাকাটা খুবই জরুরি। কিন্তু দেখা যায়, বেশির ভাগ বাবা-মা জানেন না, তার সন্তানের হঠাত্ পরিবর্তনকে কী করে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। তার সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করে তার এ হতাশা থেকে কেমন করে মুক্তি পেতে হয় তার ধারণা দেওয়া।

বর্তমানে প্রায়শ একটি কথা বা অভিযোগ থাকে—সন্তান বাবা-মায়ের কথা শোনে না। নিজের মতো করে চলতে চায়। এই কথাটা কতটা যুক্তিসঙ্গত? যারা অভিভাবক আছেন তারা কি সব সময় সন্তানের মনের দিকটা ভেবে দেখেছেন? বেশির ভাগ সময় নিজেদের ইচ্ছেগুলোকে চাপিয়ে দিই সন্তানের ওপর। সেক্ষেত্রে দেখা যায় বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের একটা ফারাক তৈরি হয়। বর্তমান প্রজন্মের সন্তানদের মানসিকতা হলো—স্বাধীনচেতা। তারা চাপিয়ে দেওয়া বিষয়কে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারে না।

অভিভাবকগণ বলে থাকেন তাদের বাবা-মাও তো তাদের মানুষ করেছেন, তবে কেন তাদের সঙ্গে এমনটি করতে হবে! কেনই-বা তাদের মন বুঝে কাজ করতে হবে? বর্তমানে আকাশসংস্কৃতির যুগে এসে এমনটা মনে করাটা কতটা যুক্তিসংগত!

এ সময়টাতে সবচেয়ে খারাপ দিক হচ্ছে—ইন্টারনেট অ্যাডিকশন ও নেশা। এই সময়টাতে দেখা যায় বন্ধু নির্বাচনে তারা ভুল করে থাকে। একটি খারাপ সঙ্গ শেষ করে দিতে পারে একটি জীবন। অভিভাবকগণকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে তারা কাদের সঙ্গে চলাফেরা করছে এবং তার মধ্যে বিশেষ কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না।

দিনদিন ইন্টারনেটের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর যেমন ভালো দিক আছে ঠিক তেমনিভাবে খারাপ দিকও কিন্তু কম নয়। এদিকটাতেও আমাদের সজাগ থাকতে হবে। কারণ যে কোনো জিনিসকে নেশা হিসেবে নেওয়া উচিত নয়।

বাবা-মায়েরা তার সন্তানকে যেভাবে অন্যের সামনে সমালোচনা করে থাকে, ঠিক তেমনি করে প্রশংসা করেন না। এটা ঠিক নয়, যেমন করে খারাপ কাজের শাস্তি দেন, ঠিক তেমন করে ভালো কাজের জন্যও উত্সাহিত করতে হবে। পুরস্কৃত করতে হবে, বাহবা দিতে হবে। তাদের কথাগুলো মন দিয়ে শুনতে হবে। যে কথাটি মানা যায় তা মেনে নিতে হবে, যা মানা যায় না তার খারাপ দিকটাকে তার সামনে তুলে ধরতে হবে এবং বুঝিয়ে বলতে হবে, কেন তা মানা যাচ্ছে না।

এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে কখনো কখনো পরিবারের সদস্যরা হাঁপিয়ে ওঠেন। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। কী করা উচিত তখন তারা বুঝতে পারেন না। সন্তানটি যদি ধ্বংসাত্মক ও অবাধ্য আচরণের সীমা অতিক্রম করে, সেই অবস্থায় যদি তার পড়াশোনার ক্ষতি হয় অথবা ধরা যাক পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়, তাহলে দেরি না করে মনোরোগ চিকিত্সার ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, আপনার থেকে বেশি আপনার সন্তানের মঙ্গল অন্য কেউই শতভাগ চাইতে পারে না বা চাইবেও না। সুতরাং আপনার করা আচরণই বলে দেবে পরবর্তীকালে আপনার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক কেমন হবে, কেমন হবে তার এবং আপনার আগামী দিনগুলো। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, আজকের সন্তানরাই আগামী দিনের ভবিষ্যত্।

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, নোয়াখালী সরকারি মহিলা কলেজ।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x