গ্রামীণ উন্নয়ন ভাবনা যেভাবে শুরু

গ্রামীণ উন্নয়ন ভাবনা যেভাবে শুরু
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের গ্রামগুলো ছিল স্বনির্ভর। কোনো অভাব ছিল না; বৈষম্য ছিল না। যার যতটুকু প্রয়োজন জমি চাষ করত। ফসল ফলাত। পশু-পাখি পালন করত, মাছ ধরত। মানুষের চাহিদাও ছিল কম। হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলিম শাসনামল পর্যন্ত গ্রামীণ জীবন ছিল সচ্ছল। জীবিকার প্রধান উৎস ছিল কৃষি। তার সঙ্গে গড়ে উঠেছিল কুটিরশিল্প, তাঁত ও ক্ষুদ্র পাটশিল্প। গ্রামসমাজ ও পঞ্চায়েতের ভিত্তিতে সংগঠিত ছিল গ্রামীণ জীবন। ইংরেজ আমলে কৃষক বাঁধা পড়ে গেল জমিদারদের জোয়ালে। ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ল পুরোনো গ্রামীণ সমাজ, গ্রামসভা ও পঞ্চায়েত। ভেঙে গেল স্বনির্ভরতা ও আত্মশক্তি। প্রতিকূল উত্পাদন সম্পর্ক, বৈরী আবহাওয়া, ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং উৎপাদিত পণ্যের অবনমিত মূল্য অভাব ও দারিদ্র্য বাড়িয়ে দেয় কৃষকের। তারা হয়ে পড়েন ঋণগ্রস্ত।

বঙ্গবন্ধু দেশে খাদ্যের নিরাপত্তা অর্জনের লক্ষ্যে সবার আগে কৃষি উন্নয়নের দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন। আধুনিক কৃষি উপকরণ ও অধিক উত্পাদনশীল বীজ ব্যবহারকে উত্সাহিত করেছেন। শীতকালীন শস্য উত্পাদনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। পানি সেচের জন্য গভীর নলকূপ ও পাওয়ার পাম্প স্থাপন এবং সেচের নালা নির্মাণের জন্য কর্মীদের পরামর্শ দিয়েছেন। আমার একবার সুযোগ হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাত্ করার। ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাস। তারিখ মনে নেই। আমার বাবা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবুল হুদা ভূঁইয়াকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এই দুই নিবেদিতপ্রাণ আওয়ামী লীগ কর্মীর প্রথম সাক্ষাত্। বাবা আমাকেও নিয়ে যান সঙ্গে করে। বঙ্গবন্ধু তার স্বভাবসুলভ স্নেহ ও ভালোবাসায় আমাদের আপ্লুত করলেন। একজন আওয়ামী লীগ ঘরানার সন্তান ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে একটু বেশি স্নেহ করলেন আমাকে। বললেন, দেশ স্বাধীন হয়েছে। এখন খাদ্যের উত্পাদন বাড়াতে হবে। সেচের ব্যবস্থা করো। উচ্চফলনশীল জাতের শস্য লাগাও। রাস্তাঘাট ঠিক করো। গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়াও। এখন গ্রামই হবে আমাদের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। এরপর থেকে এ দুই নেতাকে দেখেছি তিতাসের তীর ঘেঁষে অনেক সেচের নালা কাটায় জনগণকে সহায়তা করতে। গ্রামে গ্রামে কো-অপারেটিভ করে গভীর নলকূপ বসাতে।

দেশের কৃষিব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণ, কৃষককে যান্ত্রিক চাষে উদ্বুদ্ধকরণ, উৎপাদিত কৃষিপণ্যের সুষম বণ্টন এবং দেশের বেকার যুবসমাজকে কৃষিসংশ্লিষ্ট কাজে নিয়োজিতকরণের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু সমবায় ব্যবস্থা চালু করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। সমবায়কে তিনি বেছে নেন সমাজতন্ত্রে উত্তরণের পথ হিসেবে। তার লক্ষ্য ছিল গ্রামভিত্তিক বহুমুখী কৃষি সমবায় গড়ে তোলা। তাতে উত্পাদন ও বিপণন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। তবে তিনি জমির মালিকানা কেড়ে নেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন না। বরং জমির মালিকানা কৃষকেরই থাকবে বলে তিনি জনগণকে আশ্বস্ত করেছেন। তিনি কৃষকের ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত জমি একসঙ্গে করে যৌথ কৃষি খামার গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন, যাতে আধুনিক চাষাবাদ সম্ভব হয়। যান্ত্রিকীকরণ সহজ হয়। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘গ্রামে গ্রামে বহুমুখী কো-অপারেটিভ করা হবে। ভুল করবেন না। আমি আপনাদের জমি নেব না। ভয় পাবেন না যে, জমি নিয়ে যাব তা নয়। পাঁচ বছরের প্ল্যানে এই বাংলাদেশের ৬৫ হাজার গ্রামে কো-অপারেটিভ হবে। প্রতিটি গ্রামে এই কো-অপারেটিভ; এই জমির মালিকের জমি থাকবে; কিন্তু তার যে অংশ বেকার, যে মানুষ কাজ করতে পারে তাকে কো-অপারেটিভের সদস্য হতে হবে। এগুলো বহুমুখী কো-অপারেটিভ হবে। পয়সা যাবে তাদের কাছে, ফার্টিলাইজার যাবে তাদের কাছে, টেস্ট রিলিফ যাবে তাদের কাছে, ওয়ার্কস প্রোগ্রাম যাবে তাদের কাছে, আস্তে আস্তে ইউনিয়ন কাউন্সিল টাউটদের বিদায় দেওয়া হবে। তা না হলে দেশকে বাঁচানো যাবে না। এজন্যই ভিলেজ কো-অপারেটিভ হবে। আমি ঘোষণা করছি, পাঁচ বছরের প্ল্যানে প্রতিটি গ্রামে ৫০০ থেকে হাজার ফ্যামিলি পর্যন্ত নিয়ে কম্পলসারি কো-অপারেটিভ হবে। আপনার জমির ফসল আপনি নেবেন, অংশ যাবে কো-অপারেটিভের হাতে, অংশ যাবে গভর্নমেন্টের হাতে।’

দেশের গ্রামীণ উন্নয়নকে সফল করার জন্য প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সমতাভিত্তিক উন্নয়ন দর্শনের আওতায় সমবায়কে অন্যতম কৌশল হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে চালু করেছিলেন বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি কুমিল্লা উদ্ভাবিত দ্বিস্তরবিশিষ্ট নতুন সমবায়ব্যবস্থা, যা পরে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড নামে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। দেশের দারিদ্র্যপীড়িত উত্তরাঞ্চলে গ্রামীণ উন্নয়নের প্রশিক্ষণ ও গবেষণা পরিচালনার জন্য ২ দশমিক ২ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলেন বগুড়া একাডেমি।

স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমবায়ী উদ্যোগকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করেন। সমবায়ী মালিকানাকে রাষ্ট্রের দ্বিতীয় মালিকানা খাত হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন। সংবিধানের ১৩ (খ) অনুচ্ছেদে উত্পাদন খাত, উৎপাদন ব্যবস্থা ও বণ্টনব্যবস্থাসমূহের মালিক বা নিয়ন্ত্রক হিসেবে সদস্যদের পক্ষে সমবায়সমূহের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু তার বিভিন্ন বক্তৃতায় সমবায়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং দেশের জনগণকে সমবায়ের মাধ্যমে সংগঠিত হওয়ার জন্য উত্সাহিত করেন। ১৯৭২ সালের ৩০ জুন বাংলাদেশ জাতীয় সমবায় ইউনিয়ন আয়োজিত সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ আমার স্বপ্ন, ধ্যান, ধারণা ও আরাধনার ধন। আর সেই সোনার বাংলা ঘুমিয়ে আছে চির অবহেলিত গ্রামের আনাচে-কানাচে, চির উপেক্ষিত পল্লির কন্দরে কন্দরে, বিস্তীর্ণ জলাভূমির আশপাশে আর অরণ্যের গভীরে। ভাইয়েরা আমার, আসুন সমবায়ের জাদুস্পর্শে সুপ্ত গ্রামবাংলাকে জাগিয়ে তুলি।’

বঙ্গবন্ধু মানুষে মানুষে বৈষম্য ও আঞ্চলিক বৈষম্যের ঘোর বিরোধী ছিলেন। পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মূল কারণই ছিল আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং বাংলাদেশকে শোষণমুক্ত করা। এ সম্পর্কে খুবই স্পষ্ট ভাষায় তিনি বৈষম্যের ফিরিস্তি দিয়েছিলেন ১৯৭৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সিরাজগঞ্জের এক জনসভায়। এ বৈষম্যের খতিয়ান তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরিতে তোমরা ৮৫ জন, আমরা ১৫ জন, সামরিক বিভাগে তোমরা ৯০ জন, আমাদের দিয়েছে ১০ জন। বৈদেশিক সাহায্যের তোমরা খরচ করেছ ৮০ ভাগ, আমাদের দিয়েছে ২০ ভাগ। মহাপ্রলয়ে দক্ষিণ বাংলার ১০ লাখ লোক মারা গেল। লাখ লাখ লোক অসহায় অবস্থায় রইল। রিলিফ কাজের জন্য বিদেশ থেকে হেলিকপ্টার এসে কাজ করে গেল। অথচ ঢাকার একখানা মাত্র সামরিক বাহিনীর হেলিকপ্টার ছাড়া পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আর কোনো হেলিকপ্টার এলো না। আমরা এসব বেইনসাফির অবসান করব।’ এর জন্যই তিনি স্বাধীন দেশের সংবিধানে ‘সমাজতন্ত্র’ কথাটি সংযুক্ত করেছিলেন রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে। বঙ্গবন্ধু দেশের গ্রামীণ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সমাজতন্ত্রে উত্তরণ ও বহুমুখী সমবায় প্রতিষ্ঠার বিপ্লবকে একসঙ্গে গ্রথিত করেছেন। একটির সঙ্গে অপরটি সংযুক্ত, একে অপরের পরিপূরক।

বঙ্গবন্ধু ঘোষিত গ্রামভিত্তিক বহুমুখী কৃষি সমবায়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল যৌথ কৃষি খামার প্রতিষ্ঠা করা। এর জন্য প্রয়োজন ছোট ছোট খণ্ডে বিভক্ত জমির একাত্রীকরণ, যাতে যান্ত্রিক চাষাবাদ সম্ভব হয়। উপকরণ সংগ্রহ ও আর্থিক সংস্থান সহজতর হয়। উত্পাদন বৃদ্ধি পায়। কর্মহীন যুবকদের কর্মসংস্থান করা যায়। সর্বোপরি গ্রামীণ আয়বৈষম্য নিরসন সম্ভব হয়। এ সম্পর্কে সত্তরের দশকের প্রথম ভাগে কিছু মাঠ গবেষণা পরিচালিত হয়েছিল বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে। এর মধ্যে কুমিল্লার বামইল প্রকল্প, ময়মনসিংহের শিমলা যৌথ খামার প্রকল্প, চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় গুমাইবিল প্রকল্প এবং রাজশাহীর গুরুদাসপুর প্রকল্প উল্লেখযোগ্য। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঐ প্রকল্পগুলো অস্তিত্ব হারায়। এদের সমস্যা ও সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা, যৌথ কৃষি খামারের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক দিক বিশ্লেষণ করা এবং দেশে সমবায় কৃষি খামারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে বেশ কিছু সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছিল বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে। এর মধ্যে ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে কুমিল্লা একাডেমিতে, ১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ১৯৭৩ সালের মে মাসে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় অনুষ্ঠিত সেমিনারসমূহ উল্লেখযোগ্য। ঐ সব সেমিনারের আলোচনা ও সুপারিশসমূহ ভবিষ্যতে যৌথ কৃষি খামার প্রতিষ্ঠার নীতিমালা প্রণয়নে কাজে আসতে পারে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হলো, বঙ্গবন্ধুর যৌথ কৃষি খামার প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় আজও প্রাসঙ্গিক। শিমলা প্রকল্পের সঙ্গে কিছুদিন যুক্ত থেকে এবং এ নিয়ে গবেষণা করে উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য যৌথ কৃষি খামারব্যবস্থাকে খুবই কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে মনে হয়েছে আমার। বর্তমানে শ্রমিক-সংকট নিরসন ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণের জন্য এটি একটি উত্তম পন্থা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।

লেখক: উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ। সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট। গবেষণাক্ষেত্রে গৌরবময় ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘একুশে পদক’ ২০২০ প্রাপ্ত

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x