বর্ণবাদ উসকে দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা!

বর্ণবাদ উসকে দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা!
ছবি: প্রতীকী।

প্রযুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দ্বিমুখী লড়াইয়ে ভিন্ন অবস্থান বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে ইউরোপ। যুক্তরাষ্ট্র ব্যক্তিস্বাধীনতার ক্ষেত্রে যথেষ্ট উদার, অন্যদিকে চীন এক্ষেত্রে ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করে থাকে। এরই মধ্যে ইউরোপ ‘তৃতীয় একটি পথ’ বের করার চেষ্টা করছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে সংখ্যালঘু অশ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার ভূরিভূরি প্রমাণ রয়েছে। যেমন ফেসিয়াল রিকগনিশন সিস্টেম, যেটি নারী, অশ্বেতাঙ্গ বা ভিন্ন বর্ণের মানুষ শনাক্ত করতে পারে না। এর ফলে কর্মক্ষেত্রে বা অন্যান্য আইনগত ইস্যুতে তারা বৈষম্যের শিকার হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ নেই বললেই চলে। অভিযোগ উঠছে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণান্ধ প্রকৃতির, যা ইউরোপীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

এআই বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন শিগিগর নতুন রুল জারি করতে যাচ্ছে, যাতে অন্তত বিশ্বাসযোগ্যতার ন্যূনতা মান রক্ষা করা যায়। কিন্তু ইউরোপীয় দেশগুলোতে বর্তমানে যে বর্ণবাদ সমস্যা দেখা দিচ্ছে, তাতে অবস্থার খুব একটা হেরফের হবে বলে মনে হয় না। ডিজিটাল অধিকার গ্রুপ সারাহ চ্যান্ডার মনে করেন, এটি খুব অল্পই কাজে আসবে। আমরা মনে করি না এসব বিধিনিষেধ বর্ণবাদী চিন্তাধারায় অভ্যস্ত মানুষের আচরণে পরিবর্তন ঘটাবে। তিনি মনে করেন, নীতিনির্ধারণী মহল এ নিয়ে একরকম আত্মতৃপ্তি অনুভব করতে পারে, কিন্তু সেটি যথেষ্ট নয়। কারণ তারা বাস্তবতা বিবেচনায় নিচ্ছে না। এমনকি শক্তিশালী ডাটা প্রটেকশন বিধি, মৌলিক অধিকার ও বৈষম্য প্রতিরোধমূলক আইনও এক্ষেত্রে ইউরোপীয় সংখ্যালঘু গ্রুপগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়।

এ বছরের জানুয়ারিতে শিশুকল্যাণবিষয়ক ডিজিটাল কেলেঙ্কারির দায় নিয়ে নেদারল্যান্ডসে সরকার পদত্যাগ করে। এটি ছিল একটি পদ্ধতি, যার মাধ্যমে শিশুকল্যাণ তহবিলের সুবিধাভোগীর সংখ্যার হিসাব করা হয়। বিশেষ করে কত লোক ভুয়া তথ্য দিয়ে সরকারের কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছে, সেটি নিরূপণ করা হয়েছিল। এভাবে প্রমাণ ছাড়াই ২৬ হাজার অভিভাবক চিহ্নিত হন। দেখা যায়, এই অভিভাবকেরা সংখ্যালঘু অশ্বেতাঙ্গ এবং তাদের দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে। তাদের দেওয়া লাখ লাখ ইউরো ফেরত নেওয়া হয়। তারা সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ পায়নি। ডাচ ডাটা প্রটেকশন কর্তৃপক্ষ জানতে পারে, কর কর্তৃপক্ষ এক্ষেত্রে যে পদ্ধতি অনুসরণ করে তা ‘বৈষম্যমূলক’।

‘এটি পুরোপুরি অনুমাননির্ভর, বাস্তবতাবিবর্জিত একটি পদ্ধতি। এখানে যে অটোমেশন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, তা পক্ষপাত, অহমিকা ও বর্ণবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এতে সমাজের একটি অংশের স্বার্থ পুরোপুরি উপেক্ষিত হয়েছে।’ বলেছেন অধিকার গ্রুপ ডিজিটাল ফ্রিডম ফান্ডের ন্যানি জানসেন রেভেন্টলো। গ্রুপটি ডিজিটাল আইন প্রণয়ন ইস্যুতে কাজ করে থাকে। অন্যদিকে নারীদের প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ করে তুলতে কাজ করা সংগঠন ফ্রয়েনলুফ ডট ওআরজির প্রতিষ্ঠাতা নাকিমা স্টেফবোয়ের বলেন, তার মেয়ে সম্প্রতি আমস্টার্ডাম ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। সে বৈষম্যমূলক পরীক্ষা নজরদারি সফটওয়ারের কারণে ভর্তি হতে পারেনি। ঐ সফটওয়ারে কে অশ্বেতাঙ্গ, কে শ্যামবর্ণ তা শনাক্ত করা হয়।

স্টেফবোয়ের বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি বাস্তবায়নে ইউরোপের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকতে হবে। অন্যথায় উত্তর আমেরিকার মতো অবস্থা তৈরি হবে। সেখানে বলা হচ্ছে, কোনো মানুষই পুরো নারী সমাজ, পুরো ট্রান্সজেন্ডার, অশ্বেতাঙ্গ বা এশিয়ান নিয়ে মাথা ঘামায় না। আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ না থাকায় পদ্ধতিটি যুক্তরাষ্ট্রে অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। ইউরোপেও যেন সে রকম অবস্থা না হয়, সে ব্যাপারে স্টেফবোয়েল সতর্ক করে দেন। ইউরোপিয়ান কমিশন যে বিষয়টি সম্পর্কে একেবারেই অনবহিত তা নয়। গত বছর ইউরোপিয়ান কমিশনের ভেরা হুয়েরভা বলেছিলেন, বাস্তব জগত্ আর ডিজিটাল জগত্ এক নয়। ডিজিটাল পদ্ধতিতে উপাত্ত কপি পেস্ট করে বসিয়ে দিলে হবে না, বাস্তব পরিস্থিতির অনিয়ম ও অসংগতিগুলো প্রতিফলিত হয় না। কাজেই আমাদের মনোযোগ দিতে হবে কীভাবে সম্ভাব্য ক্ষতি এড়ানো যায়।

এদিকে ইইউর আসন্ন এআই আইনে বর্ণবৈষম্য ইস্যুটি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইডিআরআইয়ের নেতৃত্বাধীন নাগরিক অধিকার গ্রুপগুলোর একটি জোট। বলা হয়েছে, ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করেও বর্ণবৈষম্য যে সমাজ থেকে দূর করা যাচ্ছে না, বরং সেটি আরো উসকে দেওয়া হচ্ছে, সেদিকে আইনপ্রণেতাদের দৃষ্টি দেওয়া উচিত।

ইত্তেফাক/এএইচপি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x