করোনাকালে যেভাবে উদ্বেগ বাড়ছে

করোনাকালে যেভাবে উদ্বেগ বাড়ছে
গ্রাফিক্স: ইত্তেফাক

বাংলা ভাষায় একটি প্রবাদ আছে, ‘কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ’। করোনাকালে এই প্রবাদের সত্যতা আবারও প্রমাণিত হয়েছে। করোনার কারণে বিশ্ব অর্থনীতি ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রতিটি দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বিশ্বব্যাপী দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

যারা কিছুদিন আগেও দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করে কিছুটা বিত্তের মুখ দেখতে শুরু করেছিলেন, তারাও করোনার কারণে নতুন করে আবারও দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছেন। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার মধ্যে করোনার প্রথম ধাক্কায় বিশ্বব্যাপী অন্তত ১০ কোটি মানুষ নিশ্চিতভাবেই নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। করোনার সংক্রমণ দীর্ঘমেয়াদি হলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আরো অনেক বৃদ্ধি পাবে। করোনা সংক্রমণের কারণে বিশ্বব্যাপী দরিদ্র ও অসহায় মানুষগুলো সবচেয়ে বেশি কর্মহীন হয়ে পড়েছে। আর কর্মহীন বেকার হয়ে পড়ার অর্থই হচ্ছে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি করা। কারণ কর্মহীন মানুষ অর্থই হচ্ছে পরনির্ভরতা বৃদ্ধি পাওয়া। ধারণা করা হয়েছিল, করোনার প্রভাব বিত্তবান-বিত্তহীন উভয় শ্রেণির মানুষের মধ্যেই বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, করোনা সংক্রমণের কারণে অতিদরিদ্র মানুষ যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সর্বাধিক বিত্তবান মানুষ সেভাবে প্রভাবিত হয়নি। বরং করোনার সুযোগে বিত্তবান মানুষ তাদের বিত্তের পাহাড় আরো স্ফীত করতে সক্ষম হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ম্যাগাজিন ফোর্বস সম্প্রতি বিশ্বের সবচেয়ে বিত্তবান ব্যক্তিদের তালিকা প্রকাশ করেছে। এটি তাদের এ ধরনের ৩৫তম তালিকা। পত্রিকাটি লিখেছে, করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা বিপন্ন হলেও সবচেয়ে বিত্তবান মানুষদের আর্থিক অবস্থার ওপর তা তেমন কোনো বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারেনি। বরং করোনাকালে বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের সম্পদের পরিমাণ আরো বেড়েছে। শুধু সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে তাই নয়, বিত্তবানের সংখ্যাও বেড়েছে।

অর্থাৎ করোনার সংক্রমণ তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। করোনার সংক্রমণ চলাকালে বিশ্বব্যাপী বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ৭৫৫-এ উন্নীত হয়েছে। তাদের মিলিত সম্পদের নিট মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১৩ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলার। এর আগে ২০২০ সালে বিশ্বে বিলিয়নিয়ার ছিলেন ২ হাজার ৯৫ জন। তাদের মিলিত সম্পদের পরিমাণ ছিল ৮ ট্রিলিয়ন বা ৮ লাখ মার্কিন ডলার। এর অর্থ হচ্ছে, এক বছরের ব্যবধানে করোনাকালীন অবস্থায় বিশ্বে বিলিয়নিয়ার বেড়েছে ৬৬০ জন এবং তাদের সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে ৫ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিলিয়নিয়ার বলতে এমন সব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বোঝায়, যাদের মোট সম্পদের পরিমাণ ১১ কোটি মার্কিন ডলার বা তারও বেশি। এক বছরের ব্যবধানে বিলিয়নিয়ার বৃদ্ধি পেয়েছেন ৪৯৩ জন। প্রতি ১৭ ঘণ্টায় বিশ্বে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা এক জন করে বেড়েছে। প্রতি ১০০ জন বিলিয়নিয়ারের মধ্যে ৮৬ জনের সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অতিধনীদের মধ্যে ১ হাজার ৯৭৫ জনই সেলফ মেইড বা নিজের চেষ্টায় বিত্তবান হয়েছেন।

ফোর্বসের প্রতিবেদন মোতাবেক, বিশ্বে অতি বিত্তবান মানুষের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমনকি করোনার মতো অতিমারির সময়েও তাদের সম্পদ আহরণে কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে না। কিন্তু যারা সমাজে বিত্তহীন, তাদের অবস্থা দিনে দিনেই আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। অনেকেই পেশাচ্যুত হয়ে নতুন করে দরিদ্র শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন। আমরা যদি বিষয়টি বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করি, তাহলে একই চিত্র প্রত্যক্ষ করা যাবে। বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত দরিদ্র মানুষের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। কারো কারো মতে, দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ২০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

সাধারণ মানুষ খুবই অসহায় অবস্থার মধ্যে রয়েছে। যে কারণে প্রায়শই প্রশ্ন উঠতে শোনা যায়, ‘জীবন আগে, নাকি জীবিকা?’ দেশের বেশির ভাগ, বিশেষ করে যারা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং স্বল্প আয়ের মানুষ, তারা খুবই বিপাকে পড়েছেন। কিন্তু এর মধ্যেও একশ্রেণির মানুষ নানা অবৈধ পন্থা অবলম্বন করে বিত্তের পাহাড় গড়ে তুলছেন। প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে বর্তমানে ব্যাংক হিসাবধারী কোটিপতি হচ্ছেন ৮৭ হাজার ৫০০ জন। অর্থাৎ, দেশে অন্তত এই সংখ্যক ব্যাংক হিসাবধারী আছেন, যাদের হিসাবে কোটি অথবা তদূর্ধ্ব পরিমাণ টাকা রয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, করোনাকালীন অবস্থায় দেশে কোটিপতি ব্যাংক হিসাবধারী বেড়েছে ৪ হাজার ৮৬৫ জন। কোটিপতি ব্যাংক হিসাবধারীদের ব্যাংক হিসাবে অন্তত ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা রয়েছে। এটা বৈধ হিসাব।

এর বাইরেও শত শত কোটিপতি আছেন, যারা তাদের টাকা দেশের বাইরে পাচার করেছেন অথবা অন্য কোনোভাবে লুকিয়ে রেখেছেন। করোনাকালীন অবস্থায় দেশে বিত্তবান ও বিত্তহীনের ব্যবধান দ্রুত বাড়ছে। একশ্রেণির মানুষ আছেন, যারা করোনার সুযোগ গ্রহণ করে নিজেদের আর্থিক সামর্থ্য বৃদ্ধি করে চলেছেন। দরিদ্র মানুষের জন্য দেওয়া ত্রাণসামগ্রী চুরি করে বা অন্য কোনো উপায়ে তারা বিত্তের পাহাড় গড়ে তুলছেন। দেশের অর্থনৈতিক উন্নন হচ্ছে, এটা যে কোনো মানুষই স্বীকার করবেন। কিন্তু উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষ ন্যায্যতার ভিত্তিতে ভোগ করতে পারছে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষ যাতে ন্যায্যতার ভিত্তিতে ভোগ করতে পারে, তার ব্যবস্থা করাই এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি। অন্যথায় উন্নয়নের সব সুফল ব্যর্থ হতে বাধ্য। করোনার সংক্রমণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার দেশব্যাপী সাত দিনের ‘লকডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। কিন্তু এই ‘লকডাউন’ কর্মসূচি মানার ব্যাপারে কারো মধ্যেই তেমন কোনো আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে না। মানুষ তাদের জীবিকা হারানোর ভয়ে রাস্তায় নেমে এসেছেন। তারা কাজ করতে চান। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই তারা নিজ নিজ কর্মে নিযুক্ত থাকতে চান।

লকডাউন কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা অসংগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। অফিস-আদালত শর্ত সাপেক্ষে খোলা রাখা হয়েছে। কিন্তু জনপরিবহন বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে অবশ্য তিন দিনের মাথায় সিটির ভেতরে জনপরিবহন খুলে দেওয়া হয়েছে। সরকার করোনার সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন সেক্টরের জন্য ঋণ ও আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছেন। এটা অত্যন্ত ভালো একটি উদ্যোগ, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য আর্থিক প্রণোদনা প্রদান একটি সাহসী উদ্যোগ। কিন্তু এই উদ্যোগে কারা লাভবান হয়েছেন? শিল্প খাতে যে ঋণ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, তার বড় অংশ শিল্প উদ্যোক্তাগণ ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছেন। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, যারা করোনাকালীন অবস্থায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তারা এই ঋণ প্রণোদনা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারেননি।

বিশেষ করে যারা অতি ক্ষুদ্র এবং কুটির শিল্পের উদ্যোক্তা, তারা এই ঋণের অর্থ হাতে পাননি। কারণ ব্যাংক-ব্যবস্থা সব সময়ই ‘তেলা মাথায় তেল’ দিতেই বেশি পছন্দ করে। বৃহত্ শিল্পমালিকগণ ব্যাংক থেকে যত সহজে ঋণ পান, ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের মালিকগণ তত সহজে ঋণ পান না। বৃহৎ শিল্পোদ্যোক্তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই ঋণের টাকা দেশে পাচার করার অভিযোগ রয়েছে। এই মুহূর্তে যারা অতি ক্ষুদ্র এবং কুটিরশিল্পের মালিক, তাদের জন্য আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তারা কর্মযজ্ঞ শুরু করতে পারলে দেশের কর্মসংস্থানের চিত্র পালটে যাবে। প্রয়োজনে বিদ্যমান আইন পরিবর্তন করে হলেও তাদের জন্য আর্থিক সাপোর্ট দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পগুলো যাতে বৃহৎ শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ হিসেবে কাজ করতে পারে, তার ব্যবস্থা করতে হবে। ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পগুলো বড় শিল্পের জন্য কাঁচামাল সাপ্লাই দিতে পারে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তাহলে এদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যায় পড়তে হবে না। ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প বৃহৎ শিল্পের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, তারা পরস্পর সহযোগী।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x