দশ দিগন্তে

ব্রিটিশ রাজপরিবার শক্তির একটি স্তম্ভ হারাল

ব্রিটিশ রাজপরিবার শক্তির একটি স্তম্ভ হারাল
প্রিন্স ফিলিপ ও রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। ছবি: বিবিসি

শুক্রবার ৯ এপ্রিল ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের স্বামী প্রিন্স ফিলিপ (ডিউক অব এডিনবারা) ৯৯ বছর বয়সে মারা গেলেন। ৭৩ বছর স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে ছিলেন। রানি নিজেও এখন ৯০ ঊর্ধ্ব বয়সি। যদিও এই বয়সেও তিনি শক্ত-সমর্থ আছেন। কিন্তু ৭৩ বছরের এই অন্তরঙ্গ সঙ্গীকে হারানো তাকে কতটা শোকাভিভূত করবে তা সহজেই অনুমেয়। রানি নিজেই বলেছেন, ফিলিপ ছিলেন তার শক্তি ও প্রেরণার উৎস।

প্রিন্স ফিলিপ সাধারণ মানুষের কাছে ছিলেন তাদের পছন্দের লোক। কিন্তু বিতর্কিত ব্যক্তিও ছিলেন। তিনি নানা বিষয়ে তার নিজস্ব মত ব্যক্ত করতে গিয়ে বিতর্কিত হয়েছেন। কিন্তু একটা বিষয় উল্লেখযোগ্য, রানি বা রাজপরিবার কোনো বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন এমন কাজ তিনি করেননি। নিয়মতান্ত্রিক রাজপরিবারের সব কঠোরতা তিনি মেনে চলেছেন। রানির তিনি উপদেশদাতা ছিলেন। এই উপদেশ দান ছাড়া তিনি কখনো নিজস্ব মত রানির ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেননি। লেবার অথবা টোরি, যে গভর্মেন্টই ক্ষমতায় থাকুক তিনি কোনো গভর্মেন্টেরই বিরাগ ভাজন হওয়ার মতো কথাবার্তা বলেননি।

তার পরিণত বয়সেই মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু তার মৃত্যুতে রানি তার শক্তি কিছুটা হারাবেন। রাজপরিবার দুর্বল হবে। বর্তমানে রাজপরিবার নানা সংকটে বিব্রত। এই সংকট থেকে উদ্ধার লাভের ব্যাপারে রানি তার সুবিবেচক স্বামীর সাহায্য ও পরামর্শ আর পাবেন না। প্রিন্স ফিলিপ গ্রিস বংশোদ্ভূত। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ পর্যন্ত জার্মান বংশোদ্ভূত রাজা ও রানি ব্রিটিশ সিংহাসনে বসেছেন। প্রিন্স ফিলিপের পুত্র বা কন্যা সিংহাসনে বসার সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটেনে শুরু হবে গ্রিক বংশোদ্ভূত রাজা বা রানির ব্রিটিশ সিংহাসনে আরোহণ। কিন্তু প্রিন্স ফিলিপের পুত্র প্রিন্স চার্লসকে টপকে যদি তার ছেলে (চার্লস ডায়ানার ছেলে) প্রিন্স উইলিয়াম সিংহাসনে বসেন তাহলে অন্য কথা।

আমি লন্ডনে বসবাস করছি ৪৭ বছর ধরে। ব্রিটিশ রাজপরিবারের অনেকের মৃত্যু আমি দেখেছি। তার মধ্যে দুটি মৃত্যু আমার কাছে ট্রাজিক মনে হয়েছে। একটি বর্তমান রানির ছোট বোন মার্গারেটের এবং অন্যটি প্রিন্সেস ডায়ানার। এই দুটি মৃত্যুর জন্যই রাজপরিবারের মধ্যযুগীয় আভিজাত্যবোধ এবং কঠোর পারিবারিক শৃঙ্খলা দায়ী ছিল। প্রিন্সেস মার্গারেট সুন্দরী ছিলেন। তিনি প্রেমে পড়েছিলেন রাজকীয় অশ্বশালার এক অফিসার ক্যাপ্টেন টাউনসেল্ডের। গভীর প্রেম। কিন্তু অনেক কান্নাকাটি করেও এই বিয়েতে মার্গারেট রানিমাতা এলিজাবেথ এবং রানি এলিজাবেথের সম্মতি পাননি।

এই প্রেমে ব্যর্থতা মার্গারেটের জীবন ধ্বংস করে। পরে এক ফটোগ্রাফারের সঙ্গে তার বিয়ে হয় বটে, কিন্তু সেই বিয়ে স্থায়ী হয়নি। প্রেমে ব্যর্থ মার্গারেট ড্রাগস এডিক্টও হয়েছিলেন। নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মা এবং বোনের সামনেই তার মৃত্যু হয়। তার এবং রানির মা মৃত্যুবরণ করেন ১০৪ বছর বয়সে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় বোমাবিধ্বস্ত জনগণের জন্য তার সেবাকার্য এবং তার জনহিতকর নানা কাজের জন্য তিনি খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি জীবিত থাকতেই তার ছোট কন্যা মার্গারেটের মৃত্যু হয়।

রানির প্রথম ছেলে প্রিন্স চার্লসের স্ত্রী প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যু সমগ্র বিশ্বকে শোকাভিভূত করে। আমি আমার দীর্ঘ জীবনে আর কারো মৃত্যুতে সারা লন্ডন শহরকে এমন উদ্বেল হতে দেখিনি। ডায়ানাকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য লন্ডনের এমন কোনো রাস্তা এবং গলি ছিল না, যা ফুলে ফুলে ছেয়ে যায়নি। প্রিন্সেস ডায়ানা অপরূপ সুন্দরী ছিলেন। জনহিতকর কাজে ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। প্রিন্স উইলিয়াম ও হ্যারির জন্মের পর চার্লস ও ডায়ানার বিয়ে ভেঙে যায়। প্যারিসে এক মোটর দুর্ঘটনায় তার মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। অনেকে মনে করেন, ষড়যন্ত্র করেই এই দুর্ঘটনাটি ঘটানো হয়।

ডায়ানার মৃত্যু ব্রিটিশ রাজপরিবারের জনপ্রিয়তা নষ্ট করে ফেলেছিল। এই সময় রানির স্বামী প্রিন্স ফিলিপ রাজপরিবারের এই নষ্ট সম্মান ও জনপ্রিয়তা অনেকটাই উদ্ধার করেন। তালাকপ্রাপ্ত বন্ধুপত্নী ক্যামেলিয়ার সঙ্গে প্রিন্স চার্লসের বিয়ে রানি শেষ পর্যন্ত মেনে নেন। এমনকি ডায়ানার দ্বিতীয় ছেলে হ্যারি যখন বিদ্রোহী হয়ে আমেরিকার এক তালাকপ্রাপ্ত মিশ্র বর্ণের মেয়ে মেগানকে বিয়ে করতে চান, রানি তাতে সম্মতি দেন। বহু শতাব্দীর প্রাচীন ব্রিটিশ রাজপরিবারের মডার্নাইজেশনের ব্যাপারেও ডিডক অব উইন্সসর বা প্রিন্স ফিলিপের নেপথ্য ভূমিকা রয়েছে।

এক বিধবা মার্কিন মহিলাকে বিয়ে করার জন্য বর্তমান রানির চাচা রাজা অষ্টম এডোয়ার্ড সিংহাসন ছাড়তে বাধ্য হন। তার এই বিয়ে ব্রিটিশ রাজপরিবার এবং পার্লামেন্ট মেনে নেয়নি। তারপর এক শ বছর পুরো না হতেই ব্রিটিশ রাজপরিবার এবং পার্লামেন্টকে তালাকপ্রাপ্ত মিশ্র বর্ণের নারীকে প্রিন্স হ্যারির বিয়ে করা মেনে নিতে হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে যুগের পরিবর্তনে এবং এই পরিবর্তন মেনে নিতে প্রিন্স ফিলিপ এই রাজপরিবারকে যথেষ্ট সাহায্য করেছেন।

তবু রাজপরিবার এখনো বিতর্কমুক্ত হতে পারেনি। বিদ্রোহী হ্যারি শুধু মেগানকে বিয়ে করেই ক্ষান্ত হননি। তিনি রাজপরিবারকে ত্যাগ করেছেন, এমনকি দেশ ত্যাগও করেছেন। রাজপরিবারে বর্ণবৈষম্য (Racism) রয়েছে বলে তিনি অভিযোগ তুলেছেন এবং এই অভিযোগে রাজপরিবার বিব্রত। তারা হ্যারির অভিযোগ খণ্ডন করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এই সময় প্রিন্স ফিলিপ ‘গ্রান্ডড্যাড’ হিসেবে হ্যারিকে সংযত করা এবং তার পরিবারকেও রেসিজমের অভিযোগমুক্ত করার ব্যাপারে ভূমিকা রাখতে পারতেন। কিন্তু মৃত্যু তাকে সেই সুযোগ দিল না।

ব্রিটেনে কয়েক শতাব্দীর প্রাচীন রাজতন্ত্র যে এখনো টিকে আছে, তার প্রথম কারণ এই রাজতন্ত্র নিয়মতান্ত্রিক। প্রত্যক্ষভাবে দেশ শাসনের ক্ষমতা তাদের নেই। ম্যাগনাকার্টা স্বাক্ষরিত হওয়ার পর রাজার হাত থেকে দেশ শাসন করার সব ক্ষমতা নির্বাচিত পার্লামেন্টের হাতে চলে যায়। এই অবস্থায় ক্ষমতাহীন রাজতন্ত্রের যেটুকু দায়দায়িত্ব তা সুনিপুণভাবে পালন করে ব্রিটিশ রাজতন্ত্র টিকে আছে। জন সেবামূলক কাজেও বর্তমান রানি এবং তার মা অতুলনীয় অবদান রেখে জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় লন্ডন শহরের যেখানেই বোমা পড়ত, রানিমাতা সেখানেই ছুটে যেতেন ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যের জন্য। অন্যদিকে বর্তমান রানি তার কিশোরী বয়সেও যুদ্ধাহতদের সেবার জন্য দায়িত্ব পালন করেছেন। রানি হওয়ার পর স্বামী ফিলিপকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ ঘুরেছেন এবং দেশগুলোর সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক উন্নত করেছেন।

একবার অস্ট্রেলিয়া সফরের সময় এক মাওরি নেতা (আদিবাসী নেতা) তার উলঙ্গ পশ্চােদশ রানীকে দেখায়। ব্যাপারটি গুরুতর হওয়ার আগেই প্রিন্স ফিলিপ তাকে একটি হাসির ব্যাপারে পরিণত করেন এবং রানিকে বিব্রত হওয়া থেকে রক্ষা করেন। একবার রানির বাংলাদেশ সফরের সময়েও অনুরূপ ঘটনা ঘটেছিল। রানি একটি দুস্থ নিবাস পরিদর্শনে গেলে এক দুস্থ মহিলার শিশু ছেলে রানির গলার হার টেনে ধরেছিল।

রানির বহু সংকটময় মুহূর্তে ফিলিপ ছিলেন তার পরামর্শদাতা ও সাহসদাতা। আগেই বলেছি, ব্রিটিশ রাজতন্ত্রকে মডার্নাইজ করার ব্যাপারে তার অবদান উল্লেখযোগ্য। অবিভক্ত ভারতের শেষ ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন ছিলেন ব্রিটিশ রাজপরিবারের আত্মীয়। তার ঘটকালিতেই প্রিন্সেস এলিজাবেথের সঙ্গে প্রিন্স ফিলিপের বিয়ে হয়। এর ফলে ব্রিটিশ রাজপরিবারে মাউন্ট ব্যাটেনের প্রভাব আরো বেড়ে যায়।

অবিভক্ত ভারতে লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন যখন ভাইসরয়, তখন তার স্ত্রী পামেলা মাউন্ট ব্যাটেনের সঙ্গে নেহেরুর ‘গোপন প্রেমের’ গুজব বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মাউন্ট ব্যাটেনের সঙ্গে পামেলার দূরত্ব তৈরি হয়। পামেলার মৃত্যুর পর তার মৃতদেহ প্রথামতো সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। এই সময় নিঃসঙ্গ মাউন্ট ব্যাটেনকে সাহস ও শক্তি জোগান প্রিন্স ফিলিপ। আবার মাউন্ট ব্যাটেন যখন আইরিশ সন্ত্রাসীদের বোমা হামলায় নিহত হন, তখন শোকসন্তপ্ত রাজপরিবারকে সান্ত্বনা ও সাহস জুগিয়েছেন প্রিন্স ফিলিপ। তার নেপথ্য ভূমিকা ব্রিটিশ রাজপরিবারের শক্তির একটা স্তম্ভ ছিল। এই ক্ষতি রাজপরিবার সহসা পূরণ করতে পারবে না।

লন্ডন, ১০ এপ্রিল, শনিবার, ২০২১

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x