এ কোন শিক্ষা নিচ্ছে মাসুম ছেলেমেয়েরা

এ কোন শিক্ষা নিচ্ছে মাসুম ছেলেমেয়েরা
প্রতীকী ছবি

গত ৩ ও ৪ এপ্রিল মামুনুলের, তার বোনের এবং জান্নাত আরা ঝর্ণার টেলিফোন কথোপকথন প্রচার হয়ে যাওয়ার পর রাজাকারপুত্র মামুনুলের ধর্মব্যবসায়ীরা একযোগে বলা শুরু করল, টেলিফোন কথোপকথন ভুয়া, বানোয়াট, এগুলো মামুনুল হকের বা তার স্ত্রী আমেনা তৈয়বা বা তার বোনের এবং স্বর্ণার ছেলের নয়। কিন্তু ধর্মের কল বাতাসে নড়ে বলে যে প্রবাদটি চালু রয়েছে তা সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। আর তাই তো ধর্মব্যবসায়ী মামুনুল হক নিজেই প্রকাশ্যে হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিল অকপটে স্বীকার করে যে টেলিফোন কথোপকথন সত্যি সত্যি তার। সারা দেশব্যাপী প্রশ্ন উঠেছে, এরা কি আসলেই ধর্মগুরু নাকি ধর্মের নামে প্রতারক, ফায়দালোভী।

বিশেষ করে, মামুনুল হক নতুন বক্তব্য দিয়ে বলেছে, ‘স্ত্রীকে খুশি করার জন্য মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া যায়’। এটিকে অনেকেই ধর্ম অবমাননা বলে মনে করছেন। তারা বলছেন, ইসলাম ধর্মে এ ধরনের কোনো কথাই নেই। বরং ইসলামসহ অন্যান্য ধর্ম বলছে, মিথ্যা বলা মহাপাপ। ইসলামের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ইসলামের জন্মলগ্ন থেকে সত্যবাদিতাকে এমনভাবে পরিগণিত করা হয়েছে যে অত্যন্ত কঠিন অবস্থায়ও পয়গম্বর এবং ধর্মগুরুগণ সত্য কথায় স্থির থেকেছেন কঠিন ফলাফলের কথা জেনেও। মামুনুল ধর্ম অবমননা করে শুধু মহা পাপই করেনি, দেশি আইনেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছে। তাদের যুক্তি খণ্ডনের কোনো অবকাশ নেই। তারা বলেছেন, মামুনুল হক প্রকাশ্যে ইসলামের বিধানের অপব্যাখ্যা করেছে তার নিজের সুবিধার জন্য। ইসলামি চিন্তকরা মনে করছেন, মামুনুল হকের ইমামতিতে নামাজ পড়া বা তার ধর্মীয় কথা শুনলে কচিমনা ছেলেমেয়েরা শুধু এহেন কর্মকাণ্ডই শিখবে, ধর্মপ্রাণ হবে না। মামুনুলের স্বীকারোক্তির ফলে প্রমাণিত হয়েছে যে, জান্নাত আরা স্বর্ণা শহিদুল নামক এক ব্যক্তির স্ত্রী। সেটা প্রমাণিত হলেও মামুনুল সে বিষয়ে কোনো বক্তব্য বা ব্যাখ্যা দেয়নি। সে শুধু বলেছে, সে মহিলা তার দ্বিতীয় স্ত্রী এবং সে শহিদ নামক মামুনুলের এক ঘনিষ্ঠ জনের প্রাক্তন স্ত্রী। শহিদুল নামক সে ব্যক্তির স্ত্রীর নাম যে আমেনা তৈয়বা নয় বরং ঝর্ণা তাও প্রমাণিত, আরো যেটি প্রমাণিত, তা হলো আমেনা তৈয়বা হচ্ছে মামুনুলের প্রথম স্ত্রীর নাম। সে ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই। মামুনুলও অন্য কথা বলছে না।

এখানে মুখ্য প্রশ্ন হচ্ছে, স্বর্ণাকে শহিদুল বৈধভাবে তালাক দিয়েছে কি না। আমাদের দেশে মুসলিম তালাকের আইন ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং সেই অধ্যাদেশের বিধান লঙ্ঘন করে কোনো বৈধ তালাক হতে পারে না। অর্থাত্ শুধু তিন তালাক বলেই কোনো কার্যকর তালাক হয় না বিধায় শুধু তিন তালাক ঘোষণার পর সেই নারীকে কোনো পুরুষ বিয়ে করলে তার সাজা সাত বছর কারাদণ্ড। এছাড়াও মামুনুল যদি স্বর্ণার সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক করে থাকে, স্বর্ণাকে এই মর্মে মিথ্যা কথা বলে যে মামুনুল তার বৈধভাবে বিবাহিত স্বামী, তবে মামুনুলের সাজা হবে ১০ বছর। স্বীকৃত ফোন-আলাপ কিন্তু এমনটাই প্রমাণ করছে যে স্বর্ণার সঙ্গে মামুনুলের বৈধ বিয়ে হয়নি এবং সে স্বর্ণাকে এ মর্মে বুঝিয়েছে যে সে স্বর্ণার বৈধ স্বামী।

মামুনুল বলেছে, আমাদের আইনে নাকি পুরুষের বহুবিবাহ বৈধ। এখানেও মামুনুল মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে। কেননা, একজন ধর্মব্যবসায়ী হিসাবে সে নিশ্চয়ই জানে, কথাটা ঠিক নয়। আইয়ুব খান বহু অন্যায়-অপরাধ করলেও ধর্মব্যবসায়ী কাঠমোল্লাদের প্রবল প্রতিবাদ উপেক্ষা করে ১৯৬১ সালে মুসলিম পরিবার আইন অধ্যাদেশ জারি করে সমাজের যে উপকার করেছেন, তার জন্য তিনি প্রশংসিত থাকবেন। যেসব কারণে তিনি অধ্যাদেশটি করেছিলেন, তার অন্যতম ছিল মুসলিম পুরুষদের বহুবিবাহ বন্ধ করা। এই অধ্যাদেশের শুরুতেই বলা হয়েছে—অন্য কোনো আইন, রীতিনীতি বা প্রথায় অন্য কিছু থাকলেও এই অধ্যাদেশের বিধানসমূহ প্রাধান্য পাবে এবং প্রযোজ্য হবে। অধ্যাদেশের ৬ ধারায় বলা আছে, তার পূর্ববর্তী বিয়ে স্থায়িত্ব কালে কোনো পুরুষ আর্বিট্রেশন কাউন্সিলের লিখিত অনুমতি ব্যতিরেকে আর কোনো বিয়ে করতে পারবে না এবং এই বিধান ভঙ্গ করে কেউ অধিক বিয়ে করলে তা নিবন্ধনযোগ্য হবে না।

৬(২) ধারায় বলা হয়েছে, ছাপানো ফরম পূরণ করে অধিক বিয়ের অনুমতি চাইতে হবে, যার সঙ্গে উল্লেখ করতে হবে বর্তমান স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না। ৬(গ) ধারায় বলা আছে, দরখাস্ত প্রাপ্তির পর আর্বিট্রেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান স্বামী এবং তার বর্তমান স্ত্রীকে নির্দেশ দেবে নিজ নিজ প্রতিনিধি কাউন্সিলে প্রেরণ করতে। সব দেখার এবং শ্রবণের পর আর্বিট্রেশন কাউন্সিল যদি এই মর্মে সিদ্ধান্তে পৌঁছে যে প্রস্তাবিত অতিরিক্ত বিয়ের প্রয়োজন রয়েছে এবং এটি প্রার্থনা যৌক্তিক, শুধু তবেই কাউন্সিল অনুমতি দেবে। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, কিছু অর্ধশিক্ষিত ধর্মব্যবসায়ী বলে বেড়াচ্ছে, বর্তমানে স্ত্রী অনুমতি দিলেই অধিক বিয়ে করা যায়, এটা মোটেও ঠিক নয়। অনুমতি দেওয়ার এক্তিয়ার একান্তই আর্বিট্রেশন কাউন্সিলের, বর্তমান স্ত্রীর নয়। তবে কাউন্সিল বর্তমান স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া অনুমতি দিতে পারে না। তদুপরি কাউন্সিলকে এ মর্মে নিশ্চিত হতে হবে যে, অতিরিক্ত বিয়ের প্রয়োজন রয়েছে। সেই অর্থে মামুনুল মানবিক কারণে বিয়ে বলে যে কথা বলেছে, সে কারণে কাউন্সিল অনুমতি দিতে পারে না। কাউন্সিলকে লিখিতভাবে অনুমতি দেওয়ার পক্ষে যুক্তির উল্লেখ করতে হবে। কোনো পুরুষ এই বিধান ভঙ্গ করে অধিক বিয়ে করলে তার এক বছর পর্যন্ত সাজা এবং একই সঙ্গে জরিমানা হতে হবে। সুতরাং দ্বিতীয় বিয়ের দাবির বিষয়েও মামুনুল যা বলেছে, তাও মিথ্যাচার।

১৯৭৪ সালে আইন করে বিয়ে এবং তালাক নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বিয়ে নিবন্ধন না করলে, অর্থাত্ কাবিন না করলে তাকে তিন মাস পর্যন্ত সাজা ভোগ করতে হতে পারে।

তালাকের ব্যাপারে ৭ ধারায় যা বলা আছে যে, ৭ ধারার নিয়ম ভঙ্গ করলে কোনো তালাকই বৈধ নয়, অর্থাত্ শুধু মুখে তিন তালাক বলে বৈধ তালাকের দিন ১৯৬১ সালেই শেষ হয়েছে। এ বিধান ভঙ্গ করে কোনো নারী বা পুরুষ তালাক হয়ে গেছে ভেবে পুনরায় বিয়ে করলে উভয়কেই ১০ বছর কারাভোগ করতে হতে পারে। মামুনুল ও ঝর্ণার ব্যাপারেও এটি প্রযোজ্য কি না, তা তদন্তের বিষয়। তবে ঝর্ণার ছেলের বক্তব্য অনুযায়ী মামুনুল নিশ্চিতভাবে পরকীয়ার দায়ে দোষী বইকি।

কয়েকটি প্রমাণিত ঘটনার একটি হলো এই যে, মিথ্যাচারী মামুনুল রিসোর্টের কাগজে তার মহিলা সঙ্গীর নাম লিখতে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে তার আসল স্ত্রী আমেনা তৈয়বার নাম দিয়েছে। এ কাজের জন্য সে দণ্ডবিধির ৪১৭, ৪১৯ এবং ৪২০ ধারায় অপরাধ করেছে কি না, তাও বিবেচনার বিষয়। কেননা রিসোর্টের যে কাগজে মামুনুল প্রতারণামূলক কথা লিখেছে, তা না লিখলে হয়তো তাদের রিসোর্টে রুম দেওয়া হতো না। মামুনুল ও ঝর্ণা আলাদা বাড়িতে থাকার কথাও স্বীকৃত। তারা যদি সত্যিই বৈধ স্বামী-স্ত্রী হয়, তাহলে একত্রে থাকাই স্বাভাবিক। এর মধ্যে ঝর্ণার স্বীকৃত বড় ছেলে এমন এক ডায়েরি নিয়ে টেলিভিশনের পর্দায় উপস্থিত হয়েছে সেটিকে সে তার মতো ঝর্ণার ডায়েরি বলে দাবি করেছে। তার দাবি সত্য হলে যা প্রমাণিত হবে তা হলো এই যে, মামুনুল ঝর্ণাকে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে তার সঙ্গে দৈহিক সম্পর্কে বাধ্য করেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের বিধান অনুযায়ী এহেন প্রতারণার মাধ্যমে কোনো নারীকে দৈহিক সম্পর্কে প্ররোচিত করা ধর্ষণের সংজ্ঞাভুক্ত। যার সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড। ঝর্ণা যে পার্লারে কর্মরত সেটিও স্বীকৃত। অথচ মুমিনুলরা প্রতিনিয়ত পার্লারের চাকরির বিরুদ্ধে কথা বলছে!

বহু পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের এই ভেবে মাদ্রাসায় পাঠান, সন্তানরা আদর্শ মানুষ হবে। কিন্তু মামুনুল হকের মতো অপরাধীদের হাতে তারা কি আদর্শ মানুষ হবে, না অপরাধপ্রবণ হবে—সেটি অবশ্যই ভাবতে হবে।

লেখক: আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x