কঠোর লকডাউন ও কয়েকটি চ্যালেঞ্জ

কঠোর লকডাউন ও কয়েকটি চ্যালেঞ্জ
[প্রতীকী ছবি]

দ্বিতীয়বারের মতো দেশে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নেই। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে প্রতিদিনই আক্রান্তের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। আক্রান্তের সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ছয় লাখে। মৃতের সংখ্যা ১০ হাজারের কাছাকাছি। আক্রান্তের হার এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে হাসপাতালগুলো পেশেন্ট ভর্তি করাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে।

করোনার এই দ্বিতীয় বিস্ফোরণ ঠেকাতে গত ৫ এপ্রিল সরকার এক সপ্তাহের জন্য লকডাউন ঘোষণা করেছিল। যদিও বিভিন্ন মহলের কাছে সেই লকডাউনের ধরন ও পরিস্থিতি প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। বইমেলা, মার্কেট, গার্মেন্টস, অফিসসহ বড় বড় সেক্টরগুলো সব খোলাই ছিল। আন্তঃ জেলাগুলোতে বাস চলাচলের সুযোগ ও করে দেওয়া হয়েছিল। প্রকৃত অর্থে এমন সিদ্ধান্ত ও পরিস্থিতি লকডাউনের সংজ্ঞায় বাইরে। মোদ্দাকথা, এটি মৌখিক ভাষায় লকডাউন হলেও বাস্তবে ছিল অন্তঃসার শূন্য। তার ওপর যতগুলো সেক্টরে সরকার বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল জনগণের খামখেয়ালিপনায় তা ছিল আরো অকার্যকর।

এমন পরিস্থিতি দেশের জন্য মোটেও সুখকর নয়। লকডাউনের প্রকৃত প্রয়োগ না হলে করোনার এই ভয়ানক বিস্ফোরণ যে গণমৃত্যুর জন্ম দেবে তা অতি সহজেই অনুমান করা যায়। কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির ৭ এপ্রিলের সভায় দুই সপ্তাহের জন্য পূর্ণ লকডাউন দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন ও মিউনিসিপ্যালিটি এলাকায় পূর্ণ লকডাউন দেওয়ার পরামর্শ দেয় এই কমিটি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর লকডাউন আরোপ করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত জানায় সরকার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই লকডাউন ১৪ দিন থেকে ৩০ দিনের মধ্যে রাখা গেলে করোনাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তাই সরকারকে শতভাগ প্রস্তুতি নিয়েই মাঠে নামতে হবে। যত রকম প্রচার-প্রচারণা ও জনসচেতনতা কার্যক্রম আছে সবকিছু চলমান রাখতে হবে। প্রশাসনের ভূমিকা এই পরিস্থিতিতে অত্যাবশকীয়। অসচেতন জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বাধ্য করার জন্য প্রয়োজন প্রশাসনের দৃঢ় ভূমিকা। মানুষকে বোঝাতে হবে লকডাউন আমাদের বেঁচে থাকার জন্যই। বেঁচে থাকার লড়াইয়ে কিছুদিন ঘরে আবদ্ধ থাকতে হবে। লকডাউন অমান্যকারীদের ঘরে পাঠানোর দায়িত্ব প্রশাসনকেই সামলাতে হবে। মোদ্দাকথা, এই পরিস্থিতিতে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করতে হবে।

লকডাউন প্রসঙ্গে প্রথম চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে, জনগণকে ঘরে আবদ্ধ থাকতে বাধ্য করানো। লকডাউনের দ্বিতীয় ও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে দিনমজুর ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা করা। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে লকডাউন আরোপ করার ক্ষেত্রে এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। লকডাউন দেওয়া হয় মানুষকে বাঁচানোর জন্য, যদি সেই লকডাউনে মানুষ ক্ষুধায় মারা যায় তবে তা হবে অমানবিক এবং লজ্জার! লকডাউন চলাকালে হতদরিদ্র শ্রেণির প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে। গত বছরের লকডাউনে এদের বেদনার্ত আহাজারি আমরা লক্ষ্য করেছিলাম। যেহেতু তারা দিন এনে দিন খায় তাই কাজ ছাড়া অন্ন জোগাড় করা তাদের পক্ষে সম্ভবপর হয় না। ক্ষুধার যন্ত্রণা সইতে না পেরে অধিকাংশই লকডাউন ভেঙে বাইরে আসতে বাধ্য হয়।

হতদরিদ্র শ্রেণির মানুষদের আর্থিক সহায়তা অথবা খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করে অন্নসংস্থানের সুযোগ করে দিতে হবে। গত বছরের লকডাউনে সরকার বিষয়টি একেবারেই যে মাথায় নেয়নি তা কিন্তু নয়। সরকার সহায়তা দিয়েছে, কিন্তু গিয়ে পৌঁছায়নি। রাঘব বোয়াল থেকে শুরু করে চুনোপুঁটি সবাই মিলে সরকারের পাঠানো ত্রাণ-সাহায্য ভাগাভাগি করে সাবাড় করেছে। এমনটি হয়েছে মূলত সংশ্লিষ্টদের অদূরদর্শী পরিকল্পনায়। এবার একটি নির্ভরযোগ্য কমিটি গঠন করে সরকারের সহায়তাসমূহ হতদরিদ্র শ্রেণির কাছে পৌঁছাতে হবে। করোনায় বেঁচে থেকে কেউ যেন ক্ষুধার যন্ত্রণায় না মরে সেদিকে খেয়াল রাখা সরকারের মানবিক দায়িত্ব। সরকারের পাশাপাশি ধনীদেরও এই মানবিক কাজে এগিয়ে আসতে হবে। মানবতার কল্যাণে কাজ করার উপযুক্ত সময় এখনই।

তৃতীয় চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে, পবিত্র রমজান মাসে দ্রব্যমূল্যের গতি যথাসম্ভব স্থিতিশীল রেখে লকডাউনকে মানুষের অনুকূল উপযোগী করে তোলা। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি ফ্যাক্টর। প্রতি বছর রমজান আসার আগে দ্রব্যমূল্য হঠাত্ বেড়ে যায়। এই রীতিসিদ্ধ নিয়ম এবার ভাঙতে হবে। লকডাউনের আগে হোক বা লকডাউন চলাকালে হোক ব্যবসায়ীদের উচিত মানবিক হওয়া। বাজার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রকদের এখন থেকেই দ্রব্যমূল্যের গতি মনিটরিং করতে হবে। মানুষের খাওয়া-পরা নিশ্চিত হলে এমনিতেই তারা লকডাউনকে সাদরে গ্রহণ করবে।

প্রসঙ্গত বলে রাখি, শুধু লকডাউনই সমাধান নয়। সরকারের উচিত লকডাউন চলাকালে টিকার নতুন উত্সসমূহ মনিটরিং করা ও জনগণের জন্য তা নিশ্চিত করা, হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ানো, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ করা। আপাত পরিস্থিতিতে প্রতিরোধ গড়ে তুলে প্রতিকার খুঁজতে হবে। না হলে জাতির জন্য সামনে অপেক্ষা করছে সমূহ বিপদ!

লেখক: শিক্ষার্থী, রামগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজ, রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর।

ইত্তেফাক/এমআর

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x