তারেক ভাই, বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়া হলো না!

তারেক ভাই, বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়া হলো না!
ড. তারেক শামসুর রেহমান। ছবি: সংগৃহীত

সত্যি, আমি বাকরুদ্ধ! তারেক ভাই মানে ড. তারেক শামসুর রেহমানের সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয়েছে ১১ এপ্রিল মেসেঞ্জারে। জানালেন, তার প্রচণ্ড গলাব্যথা। লকডাউনে পরীক্ষা করাতে পারছেন না। কিন্তু ব্যক্তিজীবনে নিঃসঙ্গ মানুষটি চলেই গেলেন। বেশ কিছুদিন ধরেই নিকট বন্ধুদের করোনায় হারিয়ে তিনি হতাশ হয়ে পড়েছিলেন।

বইমেলায় শোভা প্রকাশের স্টলে আসবেন। বলেছিলেন, তখন যেন কলকাতা থেকে তার জন্য আনা ডায়াবেটিস ওষুধ ভায়াবিকনের দুটি কৌটা নিয়ে যাই। সাপ্তাহিক বিচিত্রায় আন্তর্জাতিক কলামের নিয়মিত লেখক হিসেবে ১৯৮৯ সাল থেকে ড. তারেক শামসুর রেহমানের সঙ্গে সম্পর্ক। টকশোতেও সহ-আলোচক হিসেবে কথা হয়েছে। জ্যেষ্ঠ বন্ধু হিসেবে তার সঙ্গে তার মোহাম্মদপুরের মোহাম্মদিয়া হাউজিংয়ের ৩ নম্বর সড়কের বাসা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, বইমেলায় ও টেলিফোন আড্ডার কত স্মৃতি! তার নিকটতম বন্ধু বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক চৌধুরী মহিদুল হক করোনায় মারা গেছেন, তা নিয়ে তিনি অনেক দুঃখ প্রকাশ করলেন সর্বশেষ মেসেঞ্জার আলাপে।

সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও রাজনীতি নিয়ে তিনি বেশ হতাশ ছিলেন। মার্কিন মুল্লুকে স্ত্রী ও একমাত্র কন্যার বসবাস এবং তাদের ছেড়ে দেশে তার একাকিত্ব তাকে বেশ যন্ত্রণা দিত। এ ব্যাপারে তিনি ছিলেন বেশ অন্তর্মুখী! আমি অনুভব করতাম, তার নিকট প্রিয়জনের মমতাহীন কষ্টের সেই দীর্ঘ নিঃশ্বাসের ব্যথা। বলতেন, আপনি কীভাবে সেটা বোঝেন প্রণব? একবার বলেছিলাম, আসছি একা যাব একা! এ পৃথিবীতে স্ত্রী, সন্তান, মা-বাবা, ভাইবোন কেউ কারো নয়। নিজের চিন্তা ও ভবিষ্যত্ নিজেকেই করতে হয়! চলেন দুই জনে মিলে বৃদ্ধাশ্রমে বাকি জীবনের জন্য বুকিং দিই! তিনি আমার কথা শুনে রাজি হয়ে গেলেন! আমার রসিকতাও তিনি বুঝলেন না। সাহিত্যের পাশাপাশি যুগান্তর, ইত্তেফাক, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, বণিক বার্তা ও জাগরণে কলাম লিখি। নিয়মিত কলাম লেখক হিসেবে তিনি আমার লেখা নিবন্ধগুলো বেশ মনোযোগসহকারে পাঠ করতেন। মাঝে মাঝে ভুলে গেলে ফোন করে বলতেন, আপনি তো লেখাটা ট্যাগ করেননি। আমাকে তিনি লেখার বিষয়েও বলতেন।

তার দীর্ঘায়ু কামনা করে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছিলাম মেসেঞ্জারে। তিনি তা দেখেছেন, কিন্তু উত্তর দেননি। আজ মনে হলো, এমন দায়িত্বশীল অধ্যাপক তা করতে পারেন না, বিশেষ করে তারেক শামসুর রেহমান। এখন মনে হচ্ছে হয়তো করোনা বিষাক্ত জীবাণু এতটাই নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে যে, তিনি সেলফোনের যান্ত্রিক বোতামে হাত রাখতে পারননি।

আজ (১৭ এপ্রিল, ২০২১) বেলা পৌনে ৩টায় ছিলাম ল্যাপটপে লেখা তৈরির কাজে। মেসেঞ্জারে ফোন তরুণ কবি রফিকুজ্জামান রনির। ভাবছিলাম, লেখাটা শেষ করে ওকে ফোন দেব। কিন্তু অনুজের ফোনকল কেন যেন ফেরাতে পারলাম না!

রনি বলল, টিভিতে দেখাচ্ছে আপনার বন্ধু অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের মরদেহ বাসা থেকে বের করা হচ্ছে। ওর এমন সংবাদে ফোনের এ প্রান্ত থেকে আমি বাকরুদ্ধ! বললাম, পরে কথা বলব রনি। রাখি।

তারেক ভাইকে মেসেঞ্জারে কদিন আগে লেখা বার্তাগুলো পড়তে থাকলাম। ফেবুর মেসেঞ্জারে গোল সবুজ বাতি দেখে ভাবলাম রনির সংবাদ মিথ্যা। তারেক ভাই বেঁচে আছেন। না হলে ওনার সবুজ বাতি জ্বলবে কেন? মেসেঞ্জারে ফোন করলাম দুবার, কিন্তু সাড়া নেই। পরে দেখি সবুজ বাতি আর নেই। উত্কণ্ঠা আমার কমছে না। গুগলে তারেক শামসুর রেহমান সার্চ দিতেই কালের কণ্ঠ অনলাইনে ওনার মৃত্যুসংবাদটি নিশ্চিত হলাম। তারপর করোনায় অন্যান্য বিশিষ্টজনের মৃত্যুর খবরের মতো ড. তারেক শামসুর রেহমানের শোকসংবাদে পোস্ট একটির পর একটি আসছে।

দুটি কারণে তারেক ভাইয়ের আকস্মিক মৃত্যুসংবাদ মেনে নিতে পারছি না। ১. বৃদ্ধাশ্রমের ঠিকানার সন্ধানে দুই জনের বের হতে না পারা এবং ২. ওষুধ নিয়ে শোভা প্রকাশের স্টলে না যেতে পারা।

আমায় ক্ষমা করে দেবেন তারেক ভাই। সময় বেশি নেই হে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক। আমিও হয়তো শিগিগরই করোনা অতিমারির মৃত্যুযাত্রায় যুক্ত হব। কে জানে!

লেখক: গল্পকার, কবি ও সাংবাদিক

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x