মমতার জয় কী প্রত্যাশা জাগায়?

মমতার জয় কী প্রত্যাশা জাগায়?
মমতা ব্যানার্জি। ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেস বিরাটভাবে জয়ী হয়েছে। এই খবরে আনন্দিত হব, না দুঃখিত হব তা ভেবে পাচ্ছি না। তৃণমূলের জয়ে বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে আমার আনন্দিত হওয়া উচিত এই কারণে যে, আমাদের নিকট প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সাম্প্রদায়িকতা ও হিন্দুত্ববাদকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এটা বাংলাদেশের বাঙালির আনন্দের কারণ হওয়া অবশ্যই উচিত। অন্যদিকে মমতার জয়ে বাংলাদেশের মানুষ পুরোপুরি সুখী হতে পারবে না এই কারণে যে, তিস্তাসহ কোনো কোনো নদীর পানিসম্পদের ন্যায্য হিস্যালাভে মমতা এখনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলে এই বাধাটি থাকত না।

তবে কিছুটা বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, যে নন্দীগ্রাম থেকে মমতা ব্যানার্জির রাজনৈতিক উত্থান, সেই নন্দীগ্রামে এই নির্বাচনে তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে খুব অল্প ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। শুভেন্দু অধিকারী একসময় মমতার খুব কাছের মানুষ ছিলেন, এখন সেই শুভেন্দু তৃণমূল ত্যাগ করে নির্বাচনে বিজেপির মনোনীত প্রার্থী এবং মমতার প্রতিদ্বন্দ্বী। নিজের দল জয়ী হয়েছে, কিন্তু নিজে জয়ী হননি—এমনটা মমতার জন্য বিরাট সম্মানহানির ব্যাপার, কিন্তু তা রাজ্যের তৃতীয় দফায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার ব্যাপারে কোনো বাধার সৃষ্টি করবে না। মমতা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে পারবেন। তবে তাকে ছয় মাসের মধ্যে কোনো একটি শূন্য আসন থেকে রাজ্যসভায় নির্বাচিত হতে হবে। ভারতের সংবিধানে এই বিধান রয়েছে।

মমতা ব্যানার্জি তৃতীয় দফা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হলে সেটা হবে দিল্লি এবং বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ জুটির গালে একটা চপেটাঘাতের মতো। কারণ, মোদি-ঝড়ে ভারতের একটার পর একটা রাজ্য যখন বিজেপির পায়ের তলায় লুটিয়ে পড়ছে, এমনকি ত্রিপুরায় সিপিএমের এত শক্ত ঘাঁটিও ভেঙে পড়েছে, তখন মোদি ও অমিত শাহের এত জোর প্রচারণা এবং ‘দিদি, দিদি’ বলে মমতাকে এত ব্যঙ্গ করা সত্ত্বেও তাকে নির্বাচনে হারানো গেল না। এটা বিজেপি হাইকমান্ডের জন্য এক বিশাল পরাজয়। এই পরাজয়ের ফলে মোদি-ঝড় উলটো দিকে বইতে শুরু করতে পারে। মোদি যেভাবে ঝড় তুলে দিল্লির সিংহাসনে বসেছিলেন, তেমনি ঝড় তুলেই সেই সিংহাসন থেকে বিদায় নিতে পারেন। মমতার সঙ্গে করোনা মহামারিও নরেন্দ্র মোদির সরকারের বড় বৈরী হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনায় তৃণমূলের এক প্রার্থীও মারা গেছেন।

নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে মমতার জয় দিল্লির গালে চপেটাঘাততুল্য এজন্য যে, আজ ৪৪ বছরের বেশি হয় পশ্চিমবঙ্গ দিল্লির হাতছাড়া। দিল্লিতে কংগ্রেস অথবা বিজেপি যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, গত ৪০ বছরে তারা আর পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বামফ্রন্ট একাই পশ্চিমবঙ্গে রাজত্ব করেছে একটানা ৩৪ বছর। তারপর তৃণমূল দুই মেয়াদের শাসন শেষ করে তৃতীয় মেয়াদের শাসন শুরু করতে যাচ্ছে। এই অবস্থায় দিল্লি চড় খেয়ে গাল লাল করতে যাচ্ছে, কিন্তু কিছুই করতে পারছে না, এটা তাদের জন্য কম অপমান নয়।

এটা আজ প্রমাণিত হয়েছে, বাংলা—তা সুবে বাংলা হোক, অবিভক্ত বেঙ্গল প্রভিন্স হোক, চিরকাল বাইরের শাসন বরদাস্ত করতে চায়নি। এই সত্যটা বুঝেছিলেন দিল্লির মোগল সম্রাট আকবরও। যখন তার সেনাপতি মানসিংহ বাংলার বারোভুঁইয়ার এক ভুঁইয়া ইশা খাঁর কাছে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে দিল্লিতে ফিরে এসেছিলেন। এজন্য মোগল সম্রাটেরা বাংলার নবাবের কাছ থেকে নামেমাত্র বার্ষিক একটা কর নিয়ে তার স্বাধীনতা মেনে নিয়েছিলেন। এই স্বাধীনতাও পূর্ণ স্বাধীনতা হয়ে দাঁড়ায়, যখন নবাব আলিবর্দি দিল্লিকে বার্ষিক কর প্রদান বন্ধ করে পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন জহরলাল নেহেরু। তার নিজের ভাষ্যমতে, কলকাতা ছিল দুঃস্বপ্নের নগরী। ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের সামাজ্যের ভাগীদার বাংলাদেশ বিভক্ত হয়ে এক ভাগ ইসলামাবাদের আরেক ভাগ দিল্লির শাসন সিকি শতাব্দীর জন্য মেনে নিয়েছিল। প্রথম বিদ্রোহী হয় ইসলামাবাদের শাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ (তখন পূর্ব পাকিস্তান)। তারপর বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে উদ্দীপ্ত হয়ে পশ্চিমবঙ্গ কয়েক বছর পরেই দিল্লির শাসনমুক্ত হয়। তবে কেন্দ্রীয় শাসন থেকে তারা সম্পূর্ণ মুক্ত হয়নি। দিল্লির সঙ্গে সাংবিধানিক সূত্র অক্ষুণ্ন রেখে পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্ট শাসন প্রবর্তিত হয়। জ্যোতি বসু মুকুটহীন সম্রাট হয়ে ওঠেন পশ্চিমবঙ্গে।

পশ্চিমবঙ্গে জ্যোতি বসু বিদ্রোহী বাংলা কংগ্রেসের অজয় মুখার্জির সঙ্গে হাত মিলিয়ে প্রথম দফা ক্ষমতায় বসার পর কলকাতার তখনকার বিখ্যাত বামপন্থি সাপ্তাহিক ‘কম্পাস’ লিখেছিল, “বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে হেড কোয়ার্টার ছিল কলকাতায়। পশ্চিবঙ্গের সাধারণ মানুষের উত্সাহ-উদ্দীপনা দেখে মনে হতো এই মুক্তিযুদ্ধ তাদেরও। কলকাতায় শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মনে এতটাই উদ্দীপনা সৃষ্টি করে যে, ওই সত্তরের দশকেই তারা দিল্লির ক্ষমতাসীন দলকে নির্বাচনে ভোট না দিয়ে সেই দলের বিপরীত আদর্শের দলকে ক্ষমতায় বসায়। এই বিপরীত আদর্শের দলের নির্বাচনী শ্লোগান ছিল বাংলাদেশে ’৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শ্লোগানের সম্পূর্ণ অনুকরণ। আওয়ামী লীগের মতো পশ্চিমবঙ্গের বাম যুক্তফ্রন্ট শ্লোগান তুলেছিল, ভারতের সেনাবাহিনীতে বাঙালিরা একেবারে সংখ্যালঘু। দেশরক্ষা খাতে বাজেটের ব্যয় বরাদ্দে পশ্চিমবঙ্গ কিছুই পায় না ইত্যাদি ইত্যাদি।”

বামফ্রন্ট পশ্চিমবঙ্গে রাজত্ব করেছে ৩৪ বছর। তার পরও দিল্লির ক্ষমতাসীন দলকে ভোট দেয়নি পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। তারা ভোট দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসকে। যে দলটি মূলত পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক দল। দুই দফা ক্ষমতায় থাকাকালে মমতার বিরুদ্ধে দুর্নীতি থেকে শুরু করে ক্ষমতার অপব্যবহারের বহু অভিযোগ উঠেছে। তার দল থেকে বহু প্রভাবশালী নেতা বিজেপি ভাগিয়ে নিয়েছে। তবু পশ্চিমবঙ্গের মানুষ মমতাকেই এবারেও ভোট দিয়েছে। প্রণব মুখার্জি বেঁচে থাকতে তাকে দিয়ে কংগ্রেস বহু চেষ্টা করেছে পশ্চিমবঙ্গ ফিরে পাওয়ার। বারবার চেষ্টা করেছে এবং ব্যর্থ হয়েছে। একজন বাঙালিকে (প্রণব বাবুকে) দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি পদে প্রথমবারের মতো বসিয়েও কংগ্রেস সফল হয়নি।

মমতা ব্যানার্জির দল এবারের পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন হতে যাচ্ছে—এই ঘটনায় বুঝতে হবে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ মমতার শাসনে নানাভাবে নির্যাতিত হওয়া সত্ত্বেও করোনার এই মহাবিপর্যয়ের মধ্যেও তৃণমূলকে ভোট দিয়েছে প্রধানত সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তাদের মনোভাব সম্মিলিতভাবে ব্যক্ত করার জন্য। সাম্প্রদায়িকতাকে তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। আবার মমতা তাদের মধ্যে কিছুটা আঞ্চলিকতাবাদও সৃষ্টি করতে চেয়েছেন। দিল্লির কংগ্রেস ও বিজেপি উভয় সরকার যখন তিস্তা সমস্যায় বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনে প্রস্তুত, তখন মমতা ব্যানার্জি বারবার পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ রক্ষার মতো অজুহাতে সেই চুক্তি সম্পাদনে বাধা দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মনে এই ধারণা সৃষ্টি করতে চেয়েছেন, দিল্লি যখন পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষা করতে চাইছে না, তখন মমতাই একমাত্র দিল্লির এই কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন।

আঞ্চলিকতাবাদকে প্রশ্রয় দেওয়া ছাড়াও মমতা পশ্চিমবঙ্গের নতুন গড়ে ওঠা ‘ইসলামি মৌলবাদকেও’ তোল্লা দিয়েছেন। ১৯৪৬ সালে বিহার দাঙ্গার পর কয়েক লাখ বিহারি মুসলমান বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। তারা মোহাজের নামে পরিচিত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাদের যে বিত্তবান শ্রেণি পাকিস্তানিদের গণহত্যায় সাহায্য জুগিয়েছিল, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাদের একটা বিরাট অংশ পালিয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে যায়। গত ৫০ বছরে তারা একটি বিত্তবান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছে। এরা বাঙালি পরিচয়ে পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায়-বাণিজ্য ও শাসনযন্ত্রের প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছে।

বামফ্রন্ট মন্ত্রিসভার মতো মমতার মন্ত্রিসভায়ও বাঙালি মুসলমান পরিচয়ে এরা ঢুকে পড়েছে। এরা বাংলাদেশের হাসিনা সরকারের ঘোর বিরোধী এবং বিএনপি-জামায়াতের মিত্র। এই ভোটের বাক্সটিও মমতার রাজত্ব রক্ষার একটি চাবিকাঠি। এদের প্রভাবেই তিস্তা সমস্যায়ও বাংলাদেশের সঙ্গে মৈত্রী সম্পর্ক স্থাপনে মমতা এগোতেই পারেননি। এবারের নির্বাচনেও এই মুসলিম ভোট বাক্স মমতাকে সহায়তা ও সমর্থন দিয়েছে। এ কথা স্বীকার করছে পশ্চিমবঙ্গের মিডিয়াও। এখন দেখার রইল পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির ক্ষমতায় থাকা অব্যাহত থাকলে তিনি এই কোটারির প্রভাবমুক্ত হয়ে বাংলাদেশের হাসিনা সরকারের সঙ্গে মিত্রতার সম্পর্ক স্থাপনে এগিয়ে আসেন কি না এবং তিস্তার পানি সমস্যার একটা সন্তোষজনক সমাধানে সাহায্য দেন কি না। মমতার সাম্প্রতিক কথাবার্তা ও কার্যক্রমে মনে হচ্ছিল, তার মন ও মনোভাবের পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে। শেখ হাসিনাকে তিনি দিদি ডেকেছিলেন। সেই দিদিকে সম্মান জানাতে আর দ্বিধা করবেন না। কথায় বলে, ‘বাংলা আজ যা ভাবে ভারত তা ভাবে আগামীকাল।’ পশ্চিমবঙ্গ সাম্প্রদায়িকতাকে প্রত্যাখ্যান করায় ভারতের অন্যান্য রাজ্যে এর প্রভাব বিস্তৃত হতে পারে। পতন ঘটতে পারে কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে হিন্দুত্ববাদের। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফল সেই শুভদিনেরই প্রত্যাশা জাগাচ্ছে। ইঙ্গিত দিচ্ছে মনে হয়।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x