মূল্যবোধের দীনতা এবং নৈতিক বিচ্যুতি

মূল্যবোধের দীনতা এবং নৈতিক বিচ্যুতি
ছবি: সংগৃহীত

মানুষের স্বভাবজাত প্রবৃত্তি হলো যূথবদ্ধভাবে পারস্পরিক মিলেমিশে সুখে-দুখের সঙ্গী হয়ে সহযোগিতা সহানুভূতি ভালোবাসা প্রীতি আবেগকে পুঁজি করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখা। সামাজিক জীবের তকমায় ভূষিত মানব জাতি। যারা কিনা সমাজের বিবর্তনের নানা পথ বেয়ে বিজ্ঞানের অভাবনীয় সাফল্যের সুফল ভোগ করে সময়ের ধারাবাহিকতায় গ্লোবাল ভিলেজের বাসিন্দার পরিচয়ে অজান্তেই তৃপ্তির ঢেকুর তুলছে।

প্রত্যেক সমাজ পরিবার এবং সম্প্রদায়ই তার পথ চলায় বেশকিছু অলিখিত আচার-আচরণ নৈতিক মানদণ্ড প্রথা বিধি মূল্যবোধে আভিষ্ট হয়ে সামাজিক বন্ধন নির্ভরশীলতা বিশ্বাস নিরাপত্তা এবং অকৃত্রিম তৃপ্তি ও সন্তুষ্টি পাওয়ার মানসে নিয়ত নিযুক্ত। এসব বিধি-বিধান মূল্যবোধ ও নৈতিকতার অনুশীলন চর্চা এবং আমরা মনোভাবে সম্পৃক্ত হয়ে সমাজ-সংসারে বেঁচে থাকার অক্সিজেন এবং রসদ যুগিয়ে মানব মনে স্বস্তি ও আস্থার আভায় সম্পৃক্ত থেকে সামনে আগাতে শক্তি ও সাহস যুগিয়েছে।

এ যেন এক অকৃত্রিম বন্ধন। যেখানটায় আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্তের বাঁধন গোষ্ঠীগত সংযুক্তি সব সময় না থাকা সত্ত্বেও সবার মাঝেই আন্তরিকতা ও ভালবাসার প্রতিধ্বনিত অনুরণিত হয়। শিল্প ব্যবসা-বাণিজ্য ভোগবাদী মানসিকতা এবং ব্যক্তি স্বাতন্ত্রীকরনের লাগামহীন প্রসারে আমাদের মনন মেধায় অস্তিত্বে যান্ত্রিকতা ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় সামাজিক সম্পর্ক রীতিনীতি বন্ধন ভালোবাসায় কোথায় যেন ছেদ পড়েছে। কেন জানি মনে হয় সমাজ কি পারছে তার নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতি অলিখিত বিধি আঁকড়ে ধরে সম্মুখ পানে নিজেদের নিয়ে যেতে? কোথায় যেন অসামঞ্জস্যতা? এ কিসের আলামত?

মূল্যবোধের দীনতা এবং নৈতিকতার বিচ্যুতি সমাজে ঘটে যাওয়া বিচ্ছিন্ন ঘটনায় প্রায়শই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় পরিবার ও সমাজের দায় এবং আমাদের বিপরীতমুখী যাত্রার প্রবণতা ও বাসনা। মুরারিচাঁদ কলেজের ধর্ষণকাণ্ড, ফেনীর নুসরাত হত্যা, সাব-রেজিস্ট্রারের ছেলে দিহানের লাগামহীন জীবন এবং সম্প্রতি ঘটে যাওয়া গুলশান ট্রাজেডি কিসের ইঙ্গিত বহন করছে? এ সমাজের সবাই উচ্চাভিলাষী এবং চাকচিক্যময় জীবন উপভোগ করতে চায়। যুগের পরিবর্তনে এ চাওয়াটা অমূলকও নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো এসব চাওয়া কিভাবে পূরণ করবে? বিপত্তিটা সেখানটায়?

সমাজের মূল্যবোধ চর্চার নিম্নগামীতার সুযোগেই নানামুখী নেতিবাচক প্রপঞ্চগুলো যাপিত জীবনের অনুষঙ্গ হয়ে সমাজ-সংসারে বিধঁছে। একসময় এ সমাজে সামাজিক অসঙ্গতি অস্থিরতা ও অসামাজিক ক্রিয়া-কলাপ সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চোখ লজ্জার অস্তিত্ব থাকলেও বিশ্বায়ন এবং প্রযুক্তির প্রসারে আজ এসব অতীত। এবং কারো কাছে গেঁয়ো এবং সেকেলের মানসিকতা বলে বিবেচিত হয়। আমরা যদি শৈশবের স্মৃতি হাতড়াই তাহলে কি দেখতে পাই?

এ সমাজে সুদ ঘুষ কে ঘৃণার চোখে দেখা হতো। যেসব লোক এসবের সাথে সম্পৃক্ত ছিল সমাজের অন্যরা তাদের সাথে মেলামেশায় দূরত্ব বজায় রাখত। গ্রামে অনেকটা এক ঘরে বসবাস করত। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় আজ কি দেখছি? এসবের উৎস না খুঁজে অবলীলায় তাদের সাথে অভিযোজন ঘটিয়ে অজান্তেই সুদ ঘুষকে বৈধতা দিয়ে এসবের চর্চায় মগ্ন থাকছি। এ মানুষেরাই কিনা নামে-বেনামে দান-খয়রাত উপঢৌকন এবং সামাজিক কাজে নিজেদের জড়িয়ে হাতেম তাঈয়ের লকব গায়ে মাখছে। সমাজ কি পারছে তার কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে? ইগো দ্বন্দ্ব এ সমাজে নানাভাবে জেঁকে বসেছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার মতামতকে পায়ে পিষে নিজের দৈন্যতা এবং দাম্ভিকতার প্রভাবে অনেক সময় কর্তাব্যক্তিদের মিথ্যার আশ্রয় নিতে হচ্ছে। কেননা যে করেই হোক নিজের বাসনা চরিতার্থ করতেই হবে। সমাজ-সংসার কি এভাবে চলতে পারে?

সমাজ পরিবার সংসারে অবাধ যৌনতাকে কখনো সমর্থন দেয়নি। সব সমাজেই নানা কানুন ও অলিখিত প্রথা মূল্যবোধ ও নৈতিকতার দ্বারা এসব নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছিল। কিন্তু হালে আমরা কি দেখছি? পাশের বাড়ির বিবাহিত যুগল যার স্বামী কিনা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সুন্দরের প্রত্যাশায় মধ্যপ্রাচ্যে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে নানা স্বপ্ন বুনছে। তার প্রেয়সীই কিনা সমাজ সংসারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অবলীলায় পরকীয়ায় মত্ত থেকে সংসারে অশান্তি ও অনিশ্চয়তা আমদানি করছে। সমাজ কি পারছে তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে? আজকাল দেখা যায় অনেকেই লিভ টুগেদার করছে। এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের তকমায় যে কেউ ইহা করতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো আমাদের সমাজ সংস্কৃতি বিশ্বাস লোকাচার কি এসবকে অনুমোদন দেয়? তাহলে এসব কিভাবে হচ্ছে? ভাবার সময় এসেছে।

ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তির আশীর্বাদের সুফল সব বয়সের শ্রেণী-পেশার মানুষেরই ভোগ করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু একবার কি ভেবেছি টিনএজারদের হাতে এসব ডিভাইস তুলে দিয়ে আগামী প্রজন্মকে বিপথগামী করছি না তো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অবাধ ব্যবহারের সুযোগে অসম সম্পর্ক অপরাধের বিস্তৃতি বলগাহীন চলাফেরা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। প্রজন্মের হাতে এসব তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবার কি একবারও ভেবেছে এসবের পরিণতি কী হতে পারে?

পরিবারের প্রয়োজনীয়তা এবং অস্তিত্বের কারণেই মানবসমাজের এক বিশেষ স্থান রয়েছে। মানুষ সারা জীবন ব্যাপী শিক্ষা লাভ করে। এমন কি মৃত্যু অবধি সে ভুল করে এবং শিখে। পারিবারিক আবহে এবং পরিমণ্ডলে শিশুরা যে মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সবক পায় তা পরবর্তী জীবনে চলার বাতিঘর হিসেবে কাজ করে। পরিবার কি পারছে তার কাঙ্ক্ষিত দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে? ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বপ্ন বাসনা এবং ব্যস্ততার সুযোগে আমরা পারস্পরিক ভালোবাসা ও আন্তরিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি। এসব ভালো লক্ষণ নয়।

মুনাফেকি আচরণ চাটুকারিতা কারসাজি এবং দালালি প্রবণতা যেন আমাদের অস্তিত্ব এবং মজ্জায় বাসা বেঁধে ফেলেছে। যার প্রভাবে সাদাকে সাদা বলার পরিবর্তে নানা রঙ্গে ভূষিত করছি। এবং অন্যরা অবলীলায় দেখেও না দেখার ভান করে প্রকারান্তরে নিজেদের বিপদ ডেকে আনছে। যার কারণে শিক্ষক চিকিৎসক বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক স্ব স্ব অবস্থানে থেকে সত্য বলতে পারছে না বা চায় না। এবং অনেক ক্ষেত্রে সাহস পায় না। অনেকেই একে ঝামেলা ভেবে এড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতা দেখায়। এমন কি হওয়ার কথা ছিল?

যে সমাজে তরমুজ কাণ্ডের মতো ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকে, যে দেশের সিংহভাগ মানুষ মুসলমান হওয়া সত্ত্বে ও রমজান মাসে বাজারে কৃত্রিম সংকট মূল্য কারসাজীর মতো ঘটনা ঘটতে পারে, যেখানটায় মানবতার ফেরিওয়ালা চিকিৎসক সমাজের একাংশ ব্যবস্থাপত্রের সাথে নির্দিষ্ট ল্যাব থেকে পরীক্ষা করানোর শর্ত জুড়ে দিয়ে কমিশন বাণিজ্যে ব্যস্ত। সে দেশে আর যাই হোক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার বিপর্যয় যে ঘটেছে তা অনায়াসেই বলা যায়।

মূল্যবোধ ও নৈতিকতার গুণেই মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। এ তকমা এবং লকবটুকু আজ প্রশ্নবিদ্ধ। হেন কোনো অনিয়ম স্বার্থপরতা এবং পাপাচার নেই যার সাথে মানবকুলের সম্পর্ক নেই। নৈতিকতার বিচ্যুতি সামাজিক বন্ধনের শিথিলতা রীতি নীতি নিয়ম প্রথার যথার্থ অনুশীলনের ঘাটতির সুবাধেই এসব হচ্ছে। সময় এসেছে ভেবে দেখার এবং এক্ষেত্রে পরিবারই পারে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে। যার হাত ধরেই সমাজ-সংসারে সুদিন ফিরতে পারে। পারিবারিক বন্ধন ভালোবাসা শাসন পরিচর্যা মূল্যবোধ এবং নৈতিকতার মাঝেই এ দৈন্যতার অবসানের স্বপ্ন দেখা যেতে পারে।

লেখক: শিক্ষক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

ইত্তেফাক/এসজেড

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x