মোস্তফা হত্যা মামলা: জোসেফ, হারিস, আনিস কি সুবিচার পেয়েছিলেন?

মোস্তফা হত্যা মামলা: জোসেফ, হারিস, আনিস কি সুবিচার পেয়েছিলেন?
প্রতীকী ছবি

এই লেখা লেখার আগ্রহ যে ঘটনার দ্বারা শুরু, সেই ঘটনায় সাম্প্রতিক সময়ের রাজনীতিতে ব্যাপক জল ঘোলা হয়েছে। গত ১ ফেব্রুয়ারিতে কাতারভিত্তিক টিভি চ্যানেল আলজাজিরা তাদের এক কল্পিত তথ্যচিত্র ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার্স ম্যান’ শুরুই করেছিল ঢাকার মোহাম্মদপুরে মোস্তফা নামের এক ব্যক্তি খুন হওয়ার এক কল্পিত গ্রাফিকস দৃশ্যের মাধ্যমে।

পুরো ডকুমেন্টারিতে এই নিহত হয়ে যাওয়া মোস্তফাকে কেন্দ্র করে তার ভাইয়ের ছেলে মুন্নাকে এনে সেখানে তার বক্তব্য গ্রহণ, নিহতের ‘ডেথ বেড’ জবানবন্দি এবং সেটিকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের তৎকালীন নেতা তোফায়েল আহমেদ জোসেফ, হাসান আহমেদ হারিস, আনিস আহমেদসহ আরো অনেক ব্যক্তিকে জড়িয়ে যে বক্তব্য, সেটি আমার জন্য ছিল কৌতূহলের। বিশেষ করে নিহতের ‘ডাইং ডিক্লারেশন’ ছিল আমার জন্য প্রথম সূত্র এবং একই সঙ্গে আমার প্রথম সন্দেহের বিষয়।

আমি নিজেও যেহেতু একজন আইনজীবী, ফলে বোধকরি এই পুরো হত্যা মামলা আমার জন্য ছিল বিশেষ একধরনের আগ্রহের স্থান। একটি কথা বলে রাখা ভালো যে, এই মামলায় নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে অ্যাপিলেট ডিভিশনের রায় পর্যন্ত হয়ে গেছে এবং এটি একটি সেটেল্ড বিষয়। কিন্তু একজন আইনজীবী হিসেবেই শুধু নয়, একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেও আমার বোধকরি অধিকার রয়েছে মামলার বিভিন্ন দিক বুঝতে চাওয়ার এবং পর্যালোচনা করার। এই পুরো ঘটনা বুঝতে এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত, মামলার নথিপত্র ইত্যাদি সংগ্রহ করার পর এই মামলার ভেতর আমি যেসব বিষয়াদি দেখতে পেয়েছি, আমার মনে হয়েছে পুরো দেশবাসীকে বিষয়গুলো জানানো অত্যন্ত প্রয়োজন।

আমরা কি নির্মোহভাবে ভাবতে পারি, একজন মানুষকে যখন শীর্ষ সন্ত্রাসী আখ্যা দেওয়া হয়, তখন তার ক্ষেত্রে আসা যে কোনো অভিযোগ, মামলা ইত্যাদির ক্ষেত্রে সহজাতভাবেই আমাদের বিবেচনার মাপকাঠি সামান্য হলেও বিপক্ষে ঝুলে থাকে এবং আমরা সেই ব্যক্তিকে একজন ‘মন্দ-লোক’ হিসেবে বিবেচনা করেই তার ব্যাপারে মন্তব্য করি। ফলে অপরাধের অভিযোগের ক্ষেত্রে আমরা যেই নির্মোহ থাকার এবং এই নির্মোহ অবস্থান থেকে সেটিকে বিশ্লে­ষণ করার কথা, সেটি কখনোই করি না। আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি একটি কথাই বারবার আমাদের জানিয়ে দিতে থাকে যে, যেহেতু এই মানুষটির পাশে ‘সন্ত্রাসী’ তকমাটি রয়েছে, ফলে ‘কেষ্টা বেটাই চোর’ পদ্ধতিতেই তাকে বিবেচনা করতে হবে। এটাই খুব সম্ভবত এই সমাজের নিয়ম কিংবা কানুন। আমরা ‘প্রি-ডিসাইসিভ’ পদ্ধতিতে চালিত হই, নির্মোহ থাকার কথা বলে পক্ষপাতদুষ্ট হই।

মোস্তফা হত্যাকাণ্ডের ‘ডাইং ডিক্লারেশন’ তথা মৃত্যুর ঠিক আগে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যে কথা মোস্তফা বলে গিয়েছিলেন, এই মামলা নিয়ে আমার সন্দেহের শুরু সেখান থেকেই। একজন মানুষ ৯টি গুলি খাওয়ার পর যেভাবে ঘটনার বিভিন্ন চিত্রের বর্ণনা করছেন, সেটি সন্দেহ করার মতোই বৈকি। ফলে এই মামলা নিয়ে আমি কাজ শুরু করি এবং এই মামলা, এই মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য মামলা, ইতিহাস নানাবিধ বিষয়ের খোঁজে নামি। আমার এই মামলা ভ্রমণে আমি কী পেয়েছি এবং একজন আইনজীবী হিসেবে আমি এই মামলার ক্ষেত্রে ঠিক কী ভাবছি, সেটি জানানোর একধরনের দায় আমি অনুভব করি আর সেই সূত্রেই এই লেখার সূচনা।

ব্যবসায়ী না সন্ত্রাসী? কে এই নিহত মোস্তফা?

যেই মোস্তফার কথা আমরা বলছি এবং যার হত্যাকাণ্ডের ফলে অভিযুক্ত হয়ে শাস্তি পেলেন ওপরে উল্লি­খিত ব্যক্তিরা, সেই মোস্তফা সম্পর্কে প্রথমে জানা জরুরি। যদিও আলজাজিরার কল্পিত তথ্যচিত্রে মোস্তফাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় একজন ব্যবসায়ী হিসেবে। একটি আন্তর্জাতিক টিভি মিডিয়ার ক্ষমতা এখানে লক্ষণীয়। একজন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী, যিনি পুরো ঢাকা শহরে একের পর এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন, তাকে কী সূক্ষ্ম কায়দায় একেবারে মনের মাধুরী মিশিয়ে সারা বিশ্বের কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হোলো একজন ব্যবসায়ী হিসেবে। কিন্তু আলজাজিরার মিথ্যাচার ছাপিয়ে এ দেশের সাধারণ মানুষের সত্য জানার অধিকার রয়েছে।

৮০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে ৯০-এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা ছিলেন ঢাকা শহরের এক শীর্ষ সন্ত্রাসী, তথা ত্রাসের রাজা। বিশেষ করে যারা মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, আদাবরের স্থানীয় বাসিন্দা, তারা এই মোস্তফার কথা অবশ্যই শুনে থাকবেন। মোস্তফার ব্যাপারে জানতে আমি সর্বমোট ৯ জন স্থানীয় ব্যক্তির দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিই।

মূলত আমার জানার ছিল এই এলাকার রাজনীতি, মোস্তফার উত্থান, এই এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে। সাক্ষাত্কারের মাধ্যমে বিশেষ করে মোস্তফার ক্ষেত্রে আমার সামনে যা উঠে এসেছে, সেটি হচ্ছে সন্ত্রাসী জীবনের আগে টোকাই ছিলেন মোস্তফা। রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়াতেন। তারপর মোহাম্মদপুর এলাকায় রাস্তার ম্যানহোলের ঢাকনা, বিভিন্ন বাসা থেকে ছোটখাটো চুরি ইত্যাদি দিয়ে অপরাধের সূচনা এবং পরে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে আটকে পরা পাকিস্তানি কিশোর-যুবকদের নিয়ে ছিনতাই গ্যাং গঠন। এবং একটা সময় ফ্রিডম পার্টির ধানমন্ডি-মোহাম্মদপুর-মিরপুর থানার কো-অর্ডিনেটর নির্বাচিত হন।

১৯৮৬ সালের পরপরই তত্কালীন সামরিক শাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অনুভব করলেন তার নিজের গৃহপালিত একটা বিরোধী দলের প্রয়োজন। সেই সময়ে এরশাদের জন্য সবচাইতে বড় আতঙ্কই ছিল ভেতরে ভেতরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সংগঠিত হওয়া এবং পুনরুত্থান।

আওয়ামী লীগের সভানেত্রী, আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তখন আওয়ামী লীগ আবার জেগে উঠছে এবং সংগঠিত হচ্ছে। এরশাদ এই উত্থানকে ভয় পাওয়া শুরু করলেন এবং পুরো ব্যাপারটিকে দমন করার জন্য এরশাদ খুব চতুরতার সঙ্গে এমন কিছু ব্যক্তিকে দিয়ে একটি রাজনৈতিক দলের সূচনা করাতে চাইলেন, যারা এই বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির জনককে সপরিবারে খুন করেছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট। সেই কর্নেল ফারুক-রশিদ-বজলুল হুদা গংদের দিয়েই গঠন করালেন ‘ফ্রিডম পার্টি’ নামের এক খুনে সংগঠন, যাদের নির্বাচনি প্রতীক ছিলো ‘কুড়াল’। ফ্রিডম পার্টি তৈরিতে তত্কালীন লিবিয়ার প্রচুর অর্থসাহায্যও এসেছিল এবং এই দলের পেছনে লিবিয়ার প্রয়াত একনায়ক জেনারেল গাদ্দাফির সরাসরি হস্তক্ষেপ ছিল। আগেই বলেছি, ফ্রিডম পার্টি তৈরির মূল উদ্দেশ্যই ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে রাজনীতির মাঠ থেকে নস্যাত্ করা এবং এদের মূল লক্ষ্যই ছিল জাতির পিতার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে খুন করা। আর সে লক্ষ্যেই তারা এগোচ্ছিল।

যারা ৮০-র দশকের শেষ দিক বা ৯০-এর দশকের শুরুর দিকের রাজনীতির কথা মনে করতে পারেন, তাদের নিশ্চই মনে আছে, সেই সময় ফ্রিডম পার্টির তাণ্ডবে এই ঢাকা শহরে টিকে থাকাটাই দায় ছিল একজন রাজনৈতিক কর্মীর জন্য। বিশেষ করে সেই কর্মী আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলে তো কথাই নেই। সারা নগরবাসীর মুখে মুখে তখন ফ্রিডম পার্টির ফ্রিডম রাশু, ফ্রিডম সোহেল প্রমুখ সন্ত্রাসীর নাম। একটা পর্যায়ে মোহাম্মদপুর অঞ্চলে ফ্রিডম পার্টির ধানমন্ডি-মোহাম্মদপুর-মিরপুর থানার কো-অর্ডিনেটর হিসেবে নিয়োগ পায় এই মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা। মোস্তফার ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে দেখা যায় যে, সে একসময় বরিশালের নলছিটিতে সর্বহারা দলের সঙ্গে জড়িত ছিল। সর্বহারা দল ততদিনে তাদের শুরুর চরিত্র হারিয়ে এলাকায় ডাকাতি-চুরি ইত্যাদির অভয়ারণ্য তৈরি করে ফেলেছিল।

আগেই বলেছি, ঢাকায় ফিরে এলাকাভিত্তিক ছোটখাটো চুরি থেকে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের নিয়ে গ্যাং তৈরি এবং পরবর্তী সময়ে ফ্রিডম পার্টিতে যোগদান। ফ্রিডম পার্টিতে যোগ দেওয়ার পর এলাকাবাসীর অনেকের মতে মোস্তফা ও তার ভাই পাগলা মিজান লিবিয়ায় গেরিলা প্রশিক্ষণ নিতে যান। ফ্রিডম পার্টির ছত্রছায়ায় আর সবার ওপরে এরশাদের আশীর্বাদ—সব মিলিয়ে এই মোস্তফা ওরফে ফ্রিডম মোস্তফা হয়ে ওঠে এক দুর্ধর্ষ ব্যক্তির নাম। (পর্ব-১)

লেখক: আইনজীবি

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x